
দুপুরের খাবার শেষ। কর্মব্যস্ততার মাঝেই মিলেছে খানিকটা অবসর। কাজের জায়গা থেকে দু’কদম এগোলেই চারপাশে সবুজের সমারোহ।
কেউ গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ হাঁটেন ফলের গাছের সারির মধ্য দিয়ে। কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও জমে ওঠে আড্ডা। সবুজে ঘেরা এই নির্মল পরিবেশেই কর্মঘণ্টার ক্লান্তি ভুলে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটান কর্ণফুলী ইপিজেডের একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার শ্রমিকরা।
এই দৃশ্যটি কোনো বিনোদন কেন্দ্র কিংবা শহরের কোনো পার্কের নয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডের একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ‘ক্যানপার্ক বাংলাদেশ অ্যাপারেল (প্রা.) লিমিটেড’-এর একপাশজুড়ে বিস্তৃত পরিসরে গড়ে তোলা হয়েছে ফলের বাগান ও পার্ক।
দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের গাছের পাশাপাশি কর্মীদের বসা, হাঁটা ও সময় কাটানোর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে নান্দনিক পরিবেশ। বাগানের দু’পাশে সারি করে বসানো হয়েছে বেঞ্চ। দুপুর কিংবা রাতের খাবারের পর নির্দিষ্ট বিরতিতে কারখানার কর্মীরা সেখানে বসে আয়েশ করেন, মেতে ওঠেন নির্মল আনন্দ-আড্ডায়।
প্রসঙ্গত, কর্ণফুলী ইপিজেড প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে বেপজার পক্ষ থেকে বিভিন্ন কারখানার পরিবেশ পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের। সে সময় ক্যানপার্ক অ্যাপারেলসের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের পরই সাংবাদিকদের চোখে পড়ে ভিন্ন এক পরিবেশ।
ক্যানপার্কের পরিচালক (মানবসম্পদ) মো. খলিলুর রহমান বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত একটি কারখানা। পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মীদের সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি লিড-প্লাটিনাম (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদ অর্জন করেছে। এ ধরনের পরিবেশই লিড সার্টিফিকেট অর্জনের পূর্বশর্ত।
তিনি জানান, কর্মীরা এত ভালো পরিবেশে কাজ করেন যে তাদের ক্লান্তির অবকাশ নেই। তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং বেপজার (বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কর্তৃপক্ষ) সমন্বয়ে নিশ্চিত করা হচ্ছে। কারখানার আঙিনায় বাগান এবং বিনোদনের জন্য পার্কের পরিবেশ রাখা হয়েছে। এতে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং তাদের কাজের মানও উন্নত হয়।
মো. খলিলুর রহমান আরও বলেন, ক্যানপার্কের মূল ইউনিটগুলো কর্ণফুলী ইপিজেডের সেক্টর-৩-এর ৬৯ থেকে ৮৫ নম্বর প্লট এবং সেক্টর-২-এর ১৪ থেকে ২৩ নম্বর প্লটজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে স্বীকৃত ‘ক্যানপার্ক ইউনিট-২’ প্রায় ১,৮০,১৩০ বর্গফুট আয়তনের ওপর নির্মিত। কারখানাটির চারপাশে ২০ শতাংশ জায়গা খালি রাখা হয়েছে। সেখানেই গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাগান ও পার্ক। পুরো কারখানাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী সেখানে কাজ করছেন, যার ৬০ শতাংশই নারী। শ্রমিকদের জন্য কারখানার ভেতরেই মেডিক্যাল সেন্টার রয়েছে। সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।
কারখানায় থাকা সবুজের পরিসর শুধু চোখই জুড়ায় না, কর্মীদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মাঝেও দুদণ্ড স্বস্তি এনে দেয়। দীর্ঘ সময় কারখানার ভেতরে কাজ করার পর কিছু সময়ের জন্য গাছের ছায়ায় বসা, সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প করা কিংবা বাগানের ভেতর হাঁটার সুযোগকে নিজেদের জন্য আলাদা এক প্রশান্তি হিসেবে দেখছেন কর্মীরা।
কারখানার সুইং অপারেটর রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের কারখানার পরিবেশ এত ভালো যে কখনও ক্লান্তি আসে না। ভেতরে সেন্ট্রাল এসিতে (কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) কাজ করি। আবার সেখান থেকে বেরিয়ে দু’কদম হাঁটলেই সবুজের রাজ্য খুঁজে পাই। বাগানের বিভিন্ন গাছ থেকে মৌসুমভেদে কখনও আম, কখনও বরই, পেয়ারা কিংবা সফেদা নিজের হাতে পেড়ে খাই। এটাকে খুবই অসাধারণ বলে মনে হয়।’

কারখানা কর্মকর্তারা জানান, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কর্মপরিবেশ তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কারখানাটিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবুজায়ন ও কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত সবুজ পরিসর তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই ব্যবস্থায় ভবনের জ্বালানি ও পানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। সেই বৃহত্তর সবুজ ভাবনারই দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে কারখানা প্রাঙ্গণের এই ফলের বাগান।
এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘সারাদিন কাজের মধ্যে থাকতে হয়। লাঞ্চের পর বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসতে পারলে শরীর-মন দুটোই হালকা লাগে। আগে কারখানা বলতে শুধু কাজের জায়গাই বুঝতাম। এখানে এসে মনে হয়, কাজের পাশাপাশি আমাদের জন্য বিশ্রাম ও আনন্দের কথাও ভাবা হয়েছে।’
কারখানার ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যে এ ধরনের ছোট আনন্দই কর্মীদের কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ কিছু। শহুরে কর্মপরিবেশে যেখানে কংক্রিট আর যন্ত্রপাতির ভিড়ই স্বাভাবিক দৃশ্য, সেখানে সুপরিসরে তৈরি এই সবুজ বাগান কর্মীদের জন্য প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, ক্যানপার্ক বাংলাদেশ অ্যাপারেল (প্রা.) লিমিটেড ২০০৭ সাল থেকে কর্ণফুলী ইপিজেডে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটি শ্রীলংকা ও আমেরিকার একটি যৌথ উদ্যোগ। বাংলাদেশে তাদের প্রথম বিনিয়োগ শুরু করে ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডে (সিইপিজেড)।
২০০৬ সালে কর্ণফুলী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বড় পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ২০০৭ সালে কর্ণফুলী ইপিজেডে চতুর্থ কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কারখানাটিতে মূলত বটম ওয়্যার (প্যান্ট) তৈরি হয়। প্রতিদিন ১ লাখ পিস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় এসব পণ্য রপ্তানি হয়। বিশ্বের সেরা অনেক ব্র্যান্ড কারখানাটির ক্রেতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কারখানাটির রপ্তানির পরিমাণ ৩৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সূত্র: বাসস
আরটিভি/আইএম



