
জুলাই আন্দোলন চলাকালে একটি ছবি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, প্রিজনভ্যান থেকে নামানো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে এক কিশোর, তার দুই হাত সাদা রশিতে বাঁধা এবং এক হাতে কাপড়ের ব্যাগ। ছবির সেই কিশোরের নাম হাসনাতুল ইসলাম ফাইয়াজ। তার তখন বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। ঢাকা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
সেই ফাইয়াজের বড় ভাই মাজহারুল ইসলাম (ডাক নাম ফাহিম) এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ী বড় ভাইকে অভিনন্দন জানাতে তার ক্যাম্পাসে গিয়েছিল ফাইয়াজ।
সেই আনন্দঘন বিষয়টি শেয়ার করে রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে ১৮ বছরের এই তরুণ।
পোস্টে সে লিখেছে, ‘কালকে ভাইয়ার ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম, আনন্দমুখর এই সময়টাতে ভাইয়াকে কনগ্রেটস করতে। ভাইয়ার ক্যাম্পাসের প্রায় শতাধিক বড় ভাইয়া এবং আপুদের সাথে কথা হয়েছিল। ভাইয়ার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইয়ারা এবং ক্যাম্পাসের আপুরা আমাকে বলেছেন ভাইয়াকে আগে যেভাবে পেয়েছিল স্বচ্ছতা, আন্তরিকতা, বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসা, সবার হয়ে কাজ করা, নিরহংকার মনোভাব এই বৈশিষ্ট্যগুলো আগের মতোই বিদ্যমান থাকলে ভাইয়াকে আগামী এক বছরের এই যাত্রায় ভাইয়ার ক্যাম্পাসের ভাইয়া এবং আপুরাই ভাইয়ার সবচেয়ে বড় স্ট্রেংথ হয়ে থাকবে যেকোনো পরিস্থিতি কিংবা উদ্যাগে, নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রহণের ক্ষেত্রে।’
‘আমার মনে হয়েছে ভাইয়াসহ নির্বাচিত সবাইকে এই মেসেজটুকু পার্সোনালি না দিয়ে পাবলিকলি পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। দোয়া করি ভাইয়াসহ আরও যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়ার পথযাত্রী হিসেবে যেন অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।’
এর আগে দেওয়া এক পোস্টে বড় ভাইয়ের অমন অর্জনে উচ্ছ্বসিত ফাইয়াজ লিখেছে, একদিন আমি আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আম্মু, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? কোনো দ্বিধা না করে তিনি বলেছিলেন, ‘ফাহিম’। সেই আম্মুর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আজ জাকসুর জিএস নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
ফাইয়াজ বিশ্বাস করে, তার ভাই শিক্ষার্থীদের জন্য শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা, অধিকার রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা এবং মতামতের বৈচিত্র্যকে অগ্রাধিকার দেবেন।
ফাইয়াজ উল্লেখ করেছে, মাজহারুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিএনসিসি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি প্লাটুনের সিইউও ও ক্যাডেট ইনচার্জ, বিতর্ক সংগঠন জেইউডিওর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে ফাইয়াজ লিখেছে, ভাইয়া সেই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আমাকে টর্চার করে ভাইয়ার লোকেশন জানতে চেয়েছিল। আমার কাছ থেকে না পেয়ে তারা ভাইয়ার মোবাইল ট্র্যাক করেছিল, কিন্তু কৌশলী হওয়ায় ভাইয়াকে ধরতে পারেনি।
পোস্টে আরও লেখা ছিল, সবাই দোয়া করবেন, আমার আম্মুর সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে যেন জাকসুতেও শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ যেন ভাইয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কবুল করেন।
এর আগে, শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান জাকসুর ফলাফল ঘোষণা করেন।
জাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্যানেলের আব্দুর রশিদ জিতু। এ ছাড়া জিএস পদে নির্বাচিত হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মাজহারুল ইসলাম। আর এজিএস (ছাত্র) পদে ফেরদৌস আল হাসান ও এজিএস (ছাত্রী) পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা নির্বাচিত হয়েছেন। তারা দুজনই ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে শীর্ষ ৪টি পদের মধ্যে ৩টিসহ মোট ২৫টি মধ্যে ২১টি পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা।
অন্য পদগুলোতে নির্বাচিতরা হলেন- শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আবু ওবায়দা ওসামা (শিবির প্যানেল), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মো. শাফায়েত মীর (শিবির প্যানেল), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম (শিবির প্যানেল), সাংস্কৃতিক সম্পাদক মহিবুল্লাহ শেখ জিসান (স্বতন্ত্র), সহ সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. রায়হান উদ্দীন (শিবির প্যানেল), নাট্য সম্পাদক মো. রুহুল ইসলাম (শিবির প্যানেল), ক্রীড়া সম্পাদক-মাহমুদুল হাসান কিরন (স্বতন্ত্র), সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) ফারহানা আক্তার লুবনা (শিবির প্যানেল), সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) মো. মাহাদী হাসান (শিবির প্যানেল), তথ্য প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক মো. রাশেদুল ইসলাম লিখন (শিবির প্যানেল), সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আহসাব লাবিব (গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাস), সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী) নিগার সুলতানা (শিবির প্যানেল), সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) মো. তৌহিদ হাসান (শিবির প্যানেল), স্বাস্হ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক (শিবির প্যানেল) এবং পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক মো. তানভীর রহমান (শিবির প্যানেল)।
এছাড়া কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে ৩ জন- নাবিলা বিনতে হারুন, ফাবলিহা জাহান, নুসরাত জাহান ইমা এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে ৩ জন মো. তরিকুল ইসলাম, আবু তালহা, মো. আলী চিশতী নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী সদস্যদের মধ্যে মো. আলী চিশতী বাগছাস সমর্থিত প্যানেলের। বাকি ৫ জন শিবির সমর্থিত প্যানেলের।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ২১টি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরে হলের কেন্দ্রগুলো থেকে ব্যালট বাক্স সিনেট ভবনে আনা হয় এবং রাত ১০টার কিছু পর শুরু হয় ভোট গণনা। এরপর শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত টানা ভোট গণনার পরে নির্বাচন কমিশন গণনা বন্ধ করে জরুরি বৈঠক ডাকে।
এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পুনরায় ভোট গণনা শুরু করে। এ সময় নির্বাচন কমিশন থেকে শুক্রবার রাতে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়। তবে দুই দফায় আবার সময় বাড়িয়ে আজকে সন্ধ্যায় ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে।
জাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ৬ হাজার ১৫ জন এবং ছাত্রী ভোটার ৫ হাজার ৭২৮ জন। ভোট পড়েছে ৮ হাজার ৩টি। এটি মোট ভোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ।
জাকসুর ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১৭৭ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন লড়ছেন। এছাড়া হল সংসদের লড়ছেন ৪৪৫ প্রার্থী।
জাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে এবার ১৭৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের মধ্যে- সহ সভাপতি (ভিপি) পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট প্যানেল ছিল ৮টি। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে-বামপন্থি, শিবির, ছাত্রদল ও স্বতন্ত্রদের সমর্থিত। ছাত্রদের ১১টি ও ছাত্রীদের ১০টি হলে ভোটগ্রহণ হয়, সব মিলিয়ে ২১টি ভোট কেন্দ্র এবং ২২৪টি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল।
আরটিভি/এফএ




