
ডিসেম্বরের ভোর মানেই কুয়াশা। আর ১৬ ডিসেম্বরের ভোর মানেই সেই কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাতির স্মৃতি। জাতীয় স্মৃতিসৌধের চূড়ায় সকালের পুরো আলো পৌঁছানোর আগেই শীতল হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসে ফুলের গন্ধ, মানুষের কণ্ঠস্বর, পায়ের শব্দ। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে, কেউ সন্তানকে শহীদদের গল্প বলছেন। বিজয় দিবসের এই দৃশ্য প্রতিবছরই পরিচিত, তবু কখনো পুরোনো হয় না।
এই ভোরেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে হাজির হন গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি—গবিসাসের সদস্যরা। তাদের জন্য দিনটি রাষ্ট্রীয় উৎসব তো বটেই একই সাথে দায়িত্ব সমাপ্তির, স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়ার এবং নতুন দিনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয় প্রস্তুতি। একের পর এক ফোনকল, বার্তা—সবাই ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পেরেছেন কি না, সেটিই যেন প্রধান ভাবনা। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে গড়ে ওঠা এই তৎপরতা গবিসাসের সাংগঠনিক সংস্কৃতির অংশ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের উন্মুক্ত মঞ্চের পাশে জড়ো হন বর্তমান ও সাবেক সদস্যরা। কারও চোখে রাতজাগার ক্লান্তি, কারও কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা। সবাই জানেন, আজকের দিনটি আলাদা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। আনুষ্ঠানিকতা সংক্ষিপ্ত, সংযত। ফুল দেওয়া শেষে কিছুক্ষণ নীরবতা। চারপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে তখন এক ধরনের স্থিরতা। বিজয় দিবসের আনন্দ এখানে এসে থমকে যায় না, বরং ভেতরের দিকে মোড় নেয়।
এরপর সবাই হাঁটতে শুরু করেন স্মৃতিসৌধের ডান পাশের সবুজ প্রান্তরের দিকে। এই পথচলা গবিসাসের কাছে নতুন নয়। এই সবুজ ঘাসের ওপর বসেই একসময় জন্ম নিয়েছিল সংগঠনটি। প্রায় ১২ বছর আগে, ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে, কয়েকজন তরুণ এখানে বসে ভাবছিলেন—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতার জন্য একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম দরকার। সেদিনের সেই ভাবনাই আজকের গবিসাস।

সবুজ প্রান্তরে বসে শুরু হয় বছরের শেষ মজলিশ। কোনো মাইক নেই, নেই বড় কোনো ব্যানার। তবু আলোচনার ওজন কম নয়। কারণ, আজকের দিনটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে গবিসাসের দ্বাদশ কার্যনির্বাহী কমিটির দায়িত্বকাল। প্রথা অনুযায়ী, বিজয় দিবসেই চলমান কমিটির বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।
আলাপে ফিরে আসে গত এক বছরের নানা ঘটনা। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা, চাপের মুখে কাজ করার অভিজ্ঞতা। কেউ বলেন মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহের কথা, কেউ বলেন প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতির কথা। আলোচনায় আত্মপ্রশংসার চেয়ে আত্মসমালোচনাই বেশি। কী করা গেছে, কী করা যায়নি—এই হিসাবই হয়ে ওঠে মুখ্য।
কেউ কেউ লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আফসোস করেন। কেউ আবার সংগঠন কি শিখিয়েছে তা বলেন। এই আলোচনার মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় দ্বাদশ কার্যনির্বাহী কমিটি। কোনো করতালি নেই, নেই উচ্চস্বরে ঘোষণা। বিষয়টি ঘটে স্বাভাবিকভাবেই, যেমনটি হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে।
গবিসাসের জন্য ১৬ ডিসেম্বর মানেই এমন বিদায়ের দিন। প্রতি বছরই এই দিনে কেউ না কেউ সংগঠন থেকে বিদায় নেন। কেউ পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন, কেউ দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুনদের জন্য জায়গা করে দেন। তাই বিজয়ের এই দিনে আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে কিছুটা বিষণ্নতাও।
তবে এই বিদায় মানেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। আলোচনায় বারবার উঠে আসে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে লাগবে। কেউ বলেন, এখান থেকেই সংবাদ লেখার হাতেখড়ি পাওয়ার গল্প। কেউ বলেন, গবিসাস তাকে শিখিয়েছে দলগতভাবে কাজ করতে, মতভিন্নতা সামলাতে।
গবিসাসের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি একটি ধারাবাহিকতা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর নতুন কমিটি, নতুন মুখ, নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে সংগঠনটি। বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া এবং সবুজ প্রান্তরে বছরের শেষ মজলিশ বসানো—এই রীতিই সেই ধারাবাহিকতার প্রতীক।

আলোচনা শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যায়। কুয়াশা অনেক আগেই সরে গেছে। আলো ঝলমল চারপাশ। কেউ কেউ নীরবে বসে থাকেন, কেউ পুরোনো স্মৃতির কথা বলেন। বিদায়ের মুহূর্তে আবেগ থাকলেও সেটি প্রকাশ পায় সংযত ভঙ্গিতে। চোখে চোখে তাকানো, কাঁধে হাত রাখা—এই ভাষাই যথেষ্ট।
জাতির বিজয়ের দিনে স্মৃতিসৌধের সবুজ প্রান্তরে গবিসাসের এই আয়োজন আলাদা করে চোখে পড়ে না হয়তো। তবু এটি একটি প্রতীকী গল্প। যেখানে রাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি সংগঠনের প্রজন্মান্তরের যাত্রা। বিজয় এখানে শুধু যুদ্ধজয়ের স্মৃতি নয়, দায়িত্ব শেষ করারও এক ধরনের বিজয়।
এই বিদায়ের মধ্যে কোনো শেষ নেই। বরং আছে নতুন দিনের অপেক্ষা। নতুন কমিটি আসবে, নতুন সদস্য যুক্ত হবে, আবারও ডিসেম্বরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে স্মৃতিসৌধে হাজির হবে গবিসাস। বিজয়ের উল্লাসের পাশে তখনও নীরবে বাজবে বিচ্ছেদের সুর—যা স্মরণ করিয়ে দেবে, পথচলা থামে না, শুধু মুখ বদলায়।
আরটিভি/আইএম




