শিক্ষার্থীদের ভাবনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

গবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ 

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ , ১২:০১ পিএম


শিক্ষার্থীদের ভাবনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
ছবি: সংগৃহীত

দুই বছর পেরিয়ে গেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের। তবুও রক্তাক্ত সেই জুলাই, প্রতিবাদমুখর রাজপথ, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন এখনো তরুণদের মনে জাগিয়ে রাখে নতুন প্রত্যাশা। তবে একই সঙ্গে অনেকের প্রশ্ন—দুই বছর পর সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে নিজেদের ভাবনা জানিয়েছেন সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

জুলাই আন্দোলন তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল প্রতিবাদ

চব্বিশের আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল প্রতিবাদ জাতীয় জীবনে নতুন অভিজ্ঞতার অধ্যায় রচনা করেছে। জুলাইয়ের স্মৃতি আমাকে বিশ্বাস করায়, ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সৃজনশীলতা ও যুক্তিনির্ভর মতপ্রকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই বছরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ, সংস্কৃতিচর্চা, মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক সহনশীলতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। এই পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, মুক্তচিন্তার বহিঃপ্রকাশ এবং দায়িত্বশীলতা। তরুণ প্রজন্মের এই জাগরণকে ধরে রাখতে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য। আইনের শাসন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা সম্ভব, যেখানে সব নাগরিকের স্বপ্ন পূরণ হবে, দেশ অর্জন করবে সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং দেশমাতৃকার প্রতিটি অংশ হবে গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত।

মোসা. মালিহা আক্তার
১ম বর্ষ, বাংলা বিভাগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান জনমনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ

কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান একপর্যায়ে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। তবে এই আন্দোলন প্রকৃত অর্থে সফল হবে তখনই, যখন বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বৈষম্যমুক্ত হবে। মানুষের স্বাধীনতা হরণ, মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা এবং একচেটিয়া শাসনের রাজনীতি জনগণের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই আন্দোলনে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নোংরা রাজনীতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ যদি নোংরা রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে, তাহলে একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখা নেহাতই বোকামি। জুলাই আমাদের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করতে পারলে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব নয়।

আশিক বিল্লাহ
২য় বর্ষ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

আরও পড়ুন

 

প্রাপ্তি-প্রত্যাশার বাস্তবতায় এখনো রয়েছে বিস্তর ঘাটতি

দুই বছর পেরিয়েও জুলাইয়ের কথা ভাবলেই বীভৎস স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাজপথে আবু সাঈদ, মুগ্ধদের ঝরে পড়া রক্ত, পুলিশের গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া লাশ, চলন্ত গাড়িতে পা কেটে যাওয়ার মতো অসংখ্য মর্মান্তিক ঘটনা আজও গভীর প্রভাব ফেলে। আন্দোলনের পর দেশ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে এগোয়নি; প্রত্যাশার জায়গায় রয়ে গেছে বিস্তর ঘাটতি। মববাজি, ধর্ষণ, খুন, চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি—কোনোটিই থামেনি। সংস্কার যদি হয়েও থাকে, তার দৃশ্যমান প্রভাব খুব বেশি চোখে পড়ে না। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগও আগের মতোই সীমিত। আর সংস্কারের উদ্দেশ্যে সে সময় রাজপথে নামা কিছু মানুষ জুলাইকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যার ফলে শহীদদের আত্মত্যাগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সমস্যারও কার্যকর সমাধান হয়নি। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি। তবে প্রত্যাশা রাখতে দোষের কিছু নেই, কারণ মানুষ আশাতেই বাঁচে। আমরা সবাই সুন্দর আগামীর, সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখি। আমাদের এখনো অনেক দূর পথ চলা বাকি।

শেখ রোহান
২য় বর্ষ, কৃষি অনুষদ

প্রত্যাশা: রাষ্ট্রে নারীর পরিচয় হবে তার যোগ্যতা, পোশাক নয়

জুলাইয়ের অনুপ্রেরণা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। আমি রাজপথে নেমেছিলাম কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে। একটি রাষ্ট্রে যখন মানুষের মৌলিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন নীরব থাকাও অন্যায়ের সঙ্গে আপসের নামান্তর। জুলাই-পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। আজও নারীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের যুক্তির জবাব না দিয়ে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী মতপ্রকাশের জন্য সম্মান পাবেন, অপমান নয়; যেখানে নারীর পরিচয় হবে তার যোগ্যতা, পোশাক নয়। নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র যদি নারীদের আত্মত্যাগের মূল্য দিতে চায়, তাহলে শুধু স্মৃতিচারণ নয়—নারীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নারীর অবদান শুধু বক্তৃতার শব্দ হয়েই থাকবে, বাস্তবে তার কোনো মূল্য থাকবে না।

জান্নাতুল ফেরদাউস
১ম বর্ষ, রসায়ন বিভাগ

 


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission