
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সিভিল জজ/জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের ফলাফল। সেই তালিকায় রয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোছা. ফারজানা ফেরদৌসী।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ ফলাফল প্রকাশিত হয়। তিনি চাকুরীর পাশাপাশি পড়াশোনা করে জয় করেছেন বিজেএস।
ফারজানার সফতার গল্প জানতে তার সঙ্গে কথা বলে আরটিভি। তিনি আরটিভিকে জানান, আমি এমন একটি গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠেছি যেখানে আলোকিত শিক্ষা নেই বললেই চলে। আমিই প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাই, যা একজন মেয়ে হিসেবে মোটেই সহজ ছিল না। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই নানা ধরনের বাঁধার মুখোমুখি হয়েছি, শুনতে হয়েছে অনেক কটু কথা। এমনকি অনেক সময় গ্রামের মানুষের কথায় আমার পরিবারও প্রভাবিত হয়েছে।
তবে এসব প্রতিকূলতা আমাকে দমিয়ে দেয়নি বরং ভালো কিছু করে দেখানোর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই পড়াশোনার প্রতি আমি মনোযোগী ও পরিশ্রমী ছিলাম এবং সবসময় ভালো ফলাফল করতাম। আমার এই ফলাফলগুলো ধীরে ধীরে আমাকে এবং আমার পরিবারকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর বিজেএস সম্পর্কে জানতে পারি এবং বিষয়টি আব্বার সঙ্গে শেয়ার করার পর আব্বার চোখে আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম সেটি আমার পথচলার অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠে।
চাকুরীর পাশাপাশি পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি ২০২৫ সালের ৯ মার্চ থেকে ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ- এর আইন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছি। চাকরির পাশাপাশি ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া আমার জন্য নিঃসন্দেহে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপই আমাকে চাকরিরত অবস্থায় সম্পন্ন করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমার পূর্বের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা, একটি সুসংগঠিত রোডম্যাপ এবং কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস আমাকে অনেকটা সহায়তা করেছে। অফিসে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হতো।
নিয়মিত দুটি ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার ডিউটি, খাতা মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্টেশন ও ভাইভা নেওয়া এবং ফলাফল প্রস্তুতের মতো বিভিন্ন একাডেমিক কাজেও সময় দিতে হয়েছে। ব্যস্ততার মধ্যেই অফিসে যতটুকু সময় পেয়েছি তা কাজে লাগিয়েছি। বিকেলে প্রায় দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে রাতের সময়টিকে মূলত পড়াশোনার জন্য নির্ধারণ করেছিলাম। আমি মূলত সারারাত পড়াশোনা করে ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়েছি। সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ছয় ঘণ্টার মতো ঘুমিয়ে বাকি সময়টুকু যথাসম্ভব পরিকল্পনা করে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। যেহেতু দিনের অধিকাংশ সময়ই চাকরির ব্যস্ততায় কেটে যেত, তাই রাতকে আমি আমার পড়াশোনার প্রধান সময় হিসেবে নির্ধারণ করেছিলাম। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা, নির্দিষ্ট লক্ষ্য, ধারাবাহিকতা এবং নিজের ওপর আস্থা রেখে প্রতিদিনের সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।
যারা বিজেএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদেরকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিজেএস প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শুরুতেই সিলেবাস ও পরীক্ষার কাঠামো ভালোভাবে বুঝে পরিকল্পনা করা উচিত। বার আইন, গুরুত্বপূর্ণ case law এবং বিগত বছরের প্রশ্নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু পড়লেই হবে না, নিয়মিত অনুশীলন ও লিখিত চর্চা করতে হবে। নিজের দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সেগুলোতে বেশি সময় দিতে হবে।
একসঙ্গে অনেক বই বা অন্যের প্রস্তুতি অনুসরণ না করে নিজের জন্য কার্যকর একটি পড়ার কৌশল তৈরি করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং নিরন্তর প্রচেষ্টা-এই তিনটি বিষয় মানুষকে এমন অনেক কিছু অর্জনের পথ দেখায় যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হয়।
আরটিভি/এমএম




