
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) এক বছর পূর্ণ হলেও সংস্কার করা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাঙা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও নামফলক। দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো। কোথাও ভেঙে পড়ে রয়েছে স্মৃতিফলক, কোথাও জমেছে শ্যাওলা, লতাপাতা ও ময়লা-আবর্জনা। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে পেঁচিয়ে রয়েছে বৈদ্যুতিক তার, অকেজো হয়ে পড়েছে আলোকসজ্জা। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে সাত শহীদের স্মরণে নির্মিত স্মরণ চত্বর বারবার ঢেকে যাচ্ছে খোদ চাকসুর ব্যানার-ফেস্টুনে। এক বছরেও এসব স্থাপনার সংস্কার ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে চাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদকের ভূমিকা নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর অন্যতম ‘বিজয় ৭১ চত্বর’, যার পূর্বনাম ছিল ‘জয় বাংলা চত্বর’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চত্বরটি ‘বিজয় ৭১’ নামে পরিচিতি পেলেও পুরোনো নামফলক ভেঙে ফেলার পর সেখানে এখনো নতুন কোনো নামফলক স্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে দেয়ালে রং দিয়ে ‘বিজয় ৭১’ লেখা থাকলেও ভাঙা ফলকটি পুনঃস্থাপন কিংবা নতুন নামফলক নির্মাণের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিজয় ৭১ চত্বরের স্মৃতিস্তম্ভজুড়ে জমে রয়েছে শ্যাওলা। দীর্ঘদিন রং না করায় স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে জন্মেছে লতাপাতা, জমেছে ময়লা-আবর্জনা। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে পেঁচিয়ে রয়েছে বৈদ্যুতিক তার। এমনকি সেখানে স্থাপিত লাইটগুলোও দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছে না। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের অভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট অফিসসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের ভাঙা অংশও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অযত্ন-অবহেলার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব স্থাপনার সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কিংবা যথাযথভাবে সংরক্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এ বিষয়ে চাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মোনায়েম শরীফের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। জবাবে তিনি বলেন, আমার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তুমি তো বলছো। পোস্ট অফিসসংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের ভাঙা অংশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ও ভাঙা পড়ে আছে না? এটা ঠিক করা দরকার ছিল।
তবে স্মৃতিস্তম্ভ সংস্কারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মোনায়েম শরীফ বলেন, বুদ্ধিজীবী চত্বর সংস্কার ও শহীদ মিনারের আশপাশের এলাকা সংস্কারের জন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম। বিষয়গুলো সিরিয়ালে রয়েছে। ধাপে ধাপে এগুলো করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। প্রায় দেড় মাস আগে এ বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে বসেছিলাম। এরপর আর বসা হয়নি।
চাকসুর মেয়াদ শেষ হলেও নিজের অবস্থান থেকে এসব স্থাপনা সংস্কারের জন্য আবারও চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশমুখ জিরো পয়েন্টে অবস্থিত ‘স্মরণ চত্বর’ নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন বীর সন্তানের স্মরণে। এখানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নাম ও প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে চত্বরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তবে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী এসব বীর সন্তানের স্মরণে নির্মিত চত্বরটি প্রায়ই ঢেকে যায় খোদ চাকসুর ব্যানার ও ফেস্টুনে। বিশেষ করে ছাত্রসংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের প্রচারণামূলক ব্যানারের কারণে শহীদদের নাম ও প্রতিকৃতি আড়াল হয়ে যায়। এ নিয়ে একাধিকবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্মরণ চত্বর চাকসুর ব্যানারে ঢেকে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মোনায়েম শরীফ বলেন, স্মরণ চত্বর তো গোল। এক সাইডে ঢেকে থাকলে আরেক সাইডে দেখা যায়। সমস্যা নাই তো। এরপর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পাদক হিসেবে এটা আমার ব্যর্থতা নাকি?
তিনি আরও বলেন, চাকসুর বিভিন্ন প্রোগ্রামের জন্য জিরো পয়েন্টে ব্যানারগুলো দেওয়া হয়। সবাই আসে, দেখে, এ জন্য আরকি। এর আগে একটা খেলাধুলার প্রোগ্রামের কারণে সেখানে ব্যানার দেওয়া হয়েছে। এখন বিতর্ক উৎসবের জন্য ব্যানার দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ব্যানারগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক সংগঠন ভয়েস অব স্টুডেন্টসের সভাপতি আশিকুর রহমান আশিক বলেন, কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত স্মরণ চত্বর ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে ঢেকে যায়। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম এবং ব্যানার অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন করেছিলাম। এর পরপরই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ব্যানার সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও চাকসুর ব্যানারও দেখা যায়। বর্তমানে চাকসুর ব্যানারগুলো এখনো ঝুলে আছে, অথচ সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে এবং চাকসুর মেয়াদও উত্তীর্ণ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “স্মরণ চত্বরটি দ্রুত ব্যানারমুক্ত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যাতে দূর থেকেই চত্বরটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাটির পরিবেশ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে।”
বিজয় ৭১ চত্বরের ভাঙা নামফলক নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে আশিকুর রহমান আশিক বলেন, জয় বাংলা চত্বরকে অনেকেই বিজয় ৭১ চত্বর হিসেবে নামকরণ করেছেন। কিন্তু সেখানে এখনো আগের ভাঙা ফলকটি পড়ে আছে। বিজয় ৭১ নামটি শুধু দেয়ালে রং দিয়ে লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ সেখানে নতুনভাবে একটি ফলক স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল।
চাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এসব স্মৃতিফলক সংস্কার ও পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, ঠিক একইভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা সেই উদ্যোগের প্রতিফলন দেখতে পাইনি। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু গ্রাফিতি আঁকা হলেও তা করা হয়েছে একেবারে শেষ মুহূর্তে। আমাদের মনে হয়েছে, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগের পরিবর্তে সমালোচনার কারণেই এসব গ্রাফিতি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাশে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা স্তম্ভটির বর্তমান অবস্থাও অত্যন্ত দুঃখজনক। স্তম্ভটির চারপাশ ঝোপঝাড়ে ঘেরা, বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। অথচ এটি সংস্কার ও যথাযথভাবে সংরক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এমন একটি স্থাপনার প্রতি অবহেলা সত্যিই হতাশাজনক।
তিনি আরও বলেন, একজন দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে তার উচিত ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। কিন্তু তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অগ্রাধিকার দিলেও মহান মুক্তিযুদ্ধ ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেননি বলে আমরা মনে করি। যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, সেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবমূল্যায়নেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে।
আরটিভি/টিআর



