
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বিজ্ঞান অনুষদের পাঁচটি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে দেড় শতাধিক শিক্ষক থাকলেও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চার মাস পরও ডিনের দায়িত্ব পালন করছেন ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। শুধু তা-ই নয়, তিনি একই ইনস্টিটিউটের চলমান পঞ্চম সেমিস্টারের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি এবং চবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামেরও সভাপতি।
একসঙ্গে দুটি প্রশাসনিক, একটি একাডেমিক ও একটি দলীয় প্রধানের দায়িত্বে থাকায় একদিকে ইনস্টিটিউটের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে অনুষদ ও উপ-উপাচার্য কার্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ এবং নতুন চালু হওয়া আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলামের অগ্রগতিও স্থবির হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীনকে বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্বর্তীকালীন ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের ৯ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদে নিয়োগ পান। কিন্তু উপ-উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার পরও তিনি ডিনের দায়িত্ব পালন করছেন।
বিজ্ঞান অনুষদ সূত্র জানায়, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ড. আল-আমীন অধিকাংশ সময় প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করেন। গুরুত্বপূর্ণ সভা বা বিশেষ কোনো কাজ ছাড়া তাকে ডিন কার্যালয়ে দেখা যায় না।
ফলে ডিন কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক ভবনে উপ-উপাচার্যের কার্যালয়ে যেতে হয়। ডিন হিসেবে বিভিন্ন প্রয়োজনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও তার সঙ্গে দেখা করতে বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ৪০০ মিটার দূরে প্রশাসনিক ভবনে যেতে হচ্ছে।
এতে অনুষদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং কিছু মৌলিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি তিনি তার দলীয় সভাও করেন উপ-উপাচার্যের কার্যালয়ে বসেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজ্ঞান অনুষদের এক অধ্যাপক বলেন, “বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে পাঁচটি বিভাগ, একটি ইনস্টিটিউট ও একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদটির দায়িত্বও ব্যাপক। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবিই পদ্ধতি চালু হওয়ায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিয়মিত হিমশিম খাচ্ছেন, বিভিন্ন বিভাগ নানা সমস্যায় পড়ছে। এ অবস্থায় একজন বহু পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনুষদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিজ্ঞান অনুষদে গবেষণা, গবেষণায় অর্থায়ন এবং শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করে তোলা, অলিম্পিয়াড, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালা আয়োজনের বিষয়ও রয়েছে। এসব কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান করার সুযোগ সীমিত হয়েছে।”
অনুষদের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের একাডেমিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপ-উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার মাসেই ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ডিসিপ্লিনের’ পঞ্চম সেমিস্টারের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন।
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, কোন কোর্স কোন শিক্ষক পড়াবেন তা ঠিক করা, ক্লাস-টিউটোরিয়াল নিয়মিত হচ্ছে কি না তদারকি করা, সেমিস্টারের অগ্রগতি ও পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র মডারেশন, ভাইভা গ্রহণ এবং সবশেষে ফলাফল প্রকাশ, সবই তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অথচ উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), অনুষদের ডিন এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতির দায়িত্বের পাশাপাশি এসব একাডেমিক কাজ তিনি কতটা সামলাতে পারছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ছয় মাসব্যাপী এই সেমিস্টার গত জুনে শুরু হয়। সেমিস্টারের ক্লাস-টিউটোরিয়াল, পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র মডারেশন, ভাইভা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশসহ বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় পরীক্ষা কমিটির সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একসঙ্গে একাধিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে একাডেমিক ডেপুটেশনে থাকায় ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন কাজের জন্য তিনি বেতনের বাইরেও আলাদা পারিতোষিক পান বলে জানা গেছে। ডিন হিসেবে বিভিন্ন সভা ও কার্যক্রমের জন্যও পারিতোষিক পান, আবার উপ-উপাচার্য হিসেবেও সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য পারিতোষিক পান। অর্থাৎ বেতনের অতিরিক্ত হিসেবে ইনস্টিটিউট, ডিন অফিস ও উপ-উপাচার্য অফিস—তিন জায়গা থেকেই তিনি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, ইনস্টিটিউটে ৩১ জন যোগ্য শিক্ষক থাকার পরও কেন তিনি পরীক্ষা কমিটির সভাপতির পদে রয়েছেন? আর অনুষদের পাঁচটি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে দেড় শতাধিক শিক্ষক থাকতেও কেনই বা তিনি এখনো ডিনের দায়িত্ব পালন করছেন?
অভিযোগ উঠেছে, তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে পারছেন না। ফলে ইনস্টিটিউট ও অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনাগ্রহী।
কলা অনুষদের এক অধ্যাপক বলেন, যে একসাথে অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করে, সে কোনো দায়িত্বই ঠিকমতো পালন করতে পারেন না।
আবার একসাথে এত পদে থাকাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ঠকানোর সামিল বলে উল্লেখ করেছেন জীববিজ্ঞান অনুষদের আরেক অধ্যাপক।
তিনি বলেন, সাধারণভাবে কিছু দায়িত্ব একসাথে পালন করা যায়। অনেক দায়িত্বে প্রতিদিন সময় দিতে হয় না। কিন্তু উপাচার্য-উপ-উপাচার্যরা একসাথে অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করা মানে হলো ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত ঠকানো।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, “যেদিন আমি প্রো-ভিসি হিসেবে এই দায়িত্ব নিই, সেদিন আমি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ছিলাম। ওটাতে আমি রেজিগনেশন দিই। তারপরে বিশ্ববিদ্যালয় আবার আমাকে ওইটা (বিজ্ঞান অনুষদের ডিন পদ) এডিশনাল চার্জ হিসেবে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বিশ্ববিদ্যালয় যে ডিন অফিসটা, ওইটা সংস্কার করা হচ্ছে হচ্ছে। তাই আমি ওখানে বসতে পারতেছি না এখন। সংস্কার কাজ শেষ হয়ে যাবে দুই-একদিনের মধ্যে। আমার এখানে তো রিচ করার কোনো সমস্যাই নাই। আমার এখানে আসতে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে না। সরাসরি এসে দেখা যায়। আর এটার জন্য কারো আমার এখানে একটি ফাইলও একদিনের জন্য কোনো দিন আটকায়নি। আমি এখানে আসি সকালে, যাই রাত ১০টায়। আমার এখানে আমাকে রিচ করতে না পারার কোনো ঘটনা এই পর্যন্ত কোনোদিন কারো ঘটে নাই। এটা নিশ্চিত থাকেন আপনি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, “ওনি অনুষদের কিছু উন্নয়ন কাজ ধরেছিলেন, সেগুলো শেষ করার জন্য সময় চেয়েছেন। তা-ও যদি ওনার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, এ বিষয়ে আমি ওনার সাথে আলাপ করবো।”
আরটিভি/ এসকেডি



