
রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি শাখার ক্যাম্পাসে বাসচাপায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সায়ন (৮) নিহতের ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন তার বাবা সাজু আহমেদ সেলিম। এ ঘটনায় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় জড়াতে চান না বলে জানিয়েছেন নিহত শিশুটির বাবা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভোরে সায়নের মরদেহ নিয়ে ঢাকার খিলক্ষেত থেকে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে পৌঁছান স্বজনরা। পরে সকাল ৯টার দিকে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্কুল ক্যাম্পাসে বাসচাপায় প্রাণ হারায় শিশু সায়ন। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জলসিঁড়ি শাখার দ্বিতীয় শ্রেণির ‘সি’ শাখার শিক্ষার্থী ছিল।
সায়নের বাবা সাজু আহমেদ সেলিম ঢাকার খিলক্ষেতের বটতলা এলাকায় বসবাস করেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার স্ত্রী শারমিন খাতুন গৃহিণী। দুই সন্তানের মধ্যে সায়ন ছিল বড়। ছোট মেয়ে শাহরিনের বয়স চার বছর।
নিহত সায়নের চাচা সোহেল রানা জানান, আগামী ১২ নভেম্বর সায়নের নবম জন্মদিন উদ্যাপনের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শিশুটিকে হারিয়ে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবাই খুব ভেঙে পড়েছে। সায়নের বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। বাসচালকের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
ছেলের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বাবা সাজু আহমেদ সেলিম বলেন, প্রতিদিন বেলা ৩টায় সায়নের ক্লাস শেষ হতো। এরপর ৩টা ১৫ থেকে ৩টা ২০ মিনিটের মধ্যে স্কুলবাস ছাড়ত। দুর্ঘটনার সময় তিনি ধানমন্ডিতে নিজের কর্মস্থলে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘স্কুল থেকে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে আমাকে ফোন দিয়ে দ্রুত স্কুলে যেতে বলা হয়। মোটরসাইকেল নিয়ে ৪০ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বাসের নিচে আমার ছেলে সায়ন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্কুলড্রেস পরা, গলায় আইডি কার্ড ঝুলানো। আমার দুনিয়া যেন অন্ধকার হয়ে গেল।’
সাজু আহমেদ জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তিনি ছেলের মরদেহ বুঝে নেন। পরে স্কুলব্যাগ ও স্কুলড্রেসও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, পরে স্কুলের অধ্যক্ষের সহায়তায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেন। তার দাবি, ফুটেজে একটি বাসকে ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দেখা যায়। ওই বাসে কোনো সহকারী ছিলেন না। এ সময় তার ছেলে হয়তো খেলাধুলা করছিল। বাসটি বাম দিকে বাঁক নেওয়ার সময় সায়ন বাম পাশের চাকার নিচে চাপা পড়ে।
সাজু আহমেদ সেলিম বলেন, ‘এত বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ২০টি বাস এবং কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। সেখানে এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। ক্যাম্পাসের ভেতরে চালক বাস চালাচ্ছেন, অথচ তার সঙ্গে কোনো হেলপার বা সহকারী নেই। হাজারো শিশুর উপস্থিতিতে চালক কীভাবে সতর্কতা ছাড়া বাস চালান? এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বাসচালকের গাফিলতি রয়েছে।’
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য সন্তানের মরদেহ কাটাছেঁড়া করা, মামলা পরিচালনার ঝামেলা, চাকরির ব্যস্ততা ও সময়ের অভাব সব মিলিয়ে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় জড়াতে চান না। দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতিও তার আস্থা নেই বলে জানান তিনি।
সাজু আহমেদ বলেন, ‘তাই লিখিত দিয়ে সন্তানের মরদেহ নিয়ে এসেছি। তবে ওই লিখিতপত্রে দাবি জানিয়েছি, এ ঘটনা তদন্ত করে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যেন স্কুল কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেও সায়নের মৃত্যুর ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আরটিভি/এসকে




