ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

অর্ধেকের নিচে নেমেছে ভিকারুননিসার জিপিএ-৫, কারণ জানালেন অধ্যক্ষ

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশকালে অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ধস নেমেছে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে; উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা। বিশেষ করে, গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

এমন খারাপ ফলাফলের পেছনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থাকা, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, বিজ্ঞান বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীর দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশকালে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় রেজিস্ট্রেশন করেছিল মোট ২ হাজার ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থী, যাদের মধ্যে ১৯ জন ছিল অনুপস্থিত। পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ হাজার ৩৭৭ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছে ২ হাজার ২৩৮ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ১৩৯ জন। পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৬ জন, যা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মাত্র ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২ হাজার ৫১৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল ২ হাজার ৪৩৪ জন। পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছিল ৮০ জন। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯৮৬ জন শিক্ষার্থী। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৭৩৭ শিক্ষার্থী।

গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৫৭০ জন বা প্রায় ৫৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা এক-চতুর্থাংশেরও কম।

এইচএসসির ফলাফলে ধসের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে আসার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সরাসরি পাঠদান, পারস্পরিক আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের যে গুরুত্ব রয়েছে, বাসায় বসে পড়াশোনার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।

শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোথাও আস্থার ঘাটতি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে অধ্যক্ষ বলেন, আমি অন্যের ওপর দায় চাপাতে চাই না। বরং নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে এই পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করতে চাই। আমাদের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়নের চেষ্টা করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ধরে রাখার নীতিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জিপিএ পাওয়ার শর্ত থাকে। কিন্তু ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিজেদের স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা রাখা হয়। জিপিএ ৩ দশমিক ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও তারা কলেজে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। জিপিএ ৪ দশমিক ৫ না পেলে ভর্তি হতে পারবে না– এমন কোনো শর্ত তারা আরোপ করেন না।

অধ্যক্ষের ভাষ্য, নিজেদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার এই নীতির কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাও কলেজে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীর ফলাফল প্রত্যাশিত পর্যায়ে নিয়ে আসা কঠিন হচ্ছে। বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দুর্বলতা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তবে এ কারণে নিজেদের শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে বাধ্য করতে চান না তারা।

শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে ব্যক্তিভেদে আলাদা কারণ রয়েছে উল্লেখ করে মাজেদা বেগম বলেন, কারও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি কম ছিল, কারও নির্দিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, আবার কারও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে। এমনকি কিছু শিক্ষার্থী অনিয়মিত ছিল, কেউ কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এসব বিষয়ও ফলাফল বিশ্লেষণের সময় বিবেচনায় নিতে হবে।

মাজেদা বেগম বলেন, যে শিক্ষার্থী খারাপ করেছে, তার পেছনে কোনো না কোনো দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক ঘাটতি এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে। আমরা চাই, তারা আবার নিজেদের জায়গায় ফিরে আসুক এবং ভালো ফল করুক।

প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার কথাও জানান অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে ভালো ফল করানোর পরিবর্তে বিষয়বস্তু ভালোভাবে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কোনো বিষয় যথাযথভাবে বুঝতে পারলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। এই সক্ষমতা তৈরির জন্য পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে মাজেদা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময় ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাদের মেধা ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য। এজন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সব শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ ও ছাত্রী ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন। সারাদেশে ২ হাজার ৬৯১টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা হয়। সার্বিকভাবেই এবার পরীক্ষার ফলে ধস নেমেছে। ১১ বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
এইচএসসিতে ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই পাস
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেশের ১৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থীই পাস করেছেন। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। অর্থাৎ শতভাগ পাশ করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ২০৬টি। এবার ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি।
এইচএসসিতে ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই পাস
এক দশকে মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার কত ছিল, জিপিএ-৫ পেয়েছেন কতজন?
গত এক দশকে আলিম পরীক্ষায় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২০২২ সালে। 
এক দশকে মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার কত ছিল, জিপিএ-৫ পেয়েছেন কতজন?
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীরা যে সুযোগ পাচ্ছেন
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীরা যে সুযোগ পাচ্ছেন
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের নিয়ে যা জানা গেল
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে কেবল ফেল করা বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এবারে এক ও দুই বিষয়ে ফেল করা পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন।
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের নিয়ে যা জানা গেল
যশোরে এইচএসসিতে পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২২৮ জন
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে যশোর শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ বছর বোর্ডটিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২২৮ জন শিক্ষার্থী।
যশোরে এইচএসসিতে পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২২৮ জন
আরও পড়ুন
এইচএসসিতে ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই পাস
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীরা যে সুযোগ পাচ্ছেন
১-২ বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের নিয়ে যা জানা গেল
যশোরে এইচএসসিতে পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২২৮ জন