
এক অন্যরকম মায়াবী সুরের রাতে বন্দি যেন দর্শক-শ্রোতা। রাজধানীর আবাহনী মাঠ রাতভর জেগে আছে শুদ্ধ-সুরের মূর্ছনায়। হাজারো মানুষ সঙ্গীতের সুরে ঢেউ তুলেছে সুর-দরিয়ায়। পরদিন শুক্রবার, ছুটির দিন বলেই হয়তো বৃহস্পতিবার রাতে দর্শকের ভিড় আগের দুই দিনের চাইতে একটু বেশি ছিল। আজ রাতেও দর্শকের ভিড় হবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
পাঁচ দিনব্যাপী বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের তৃতীয় দিনের আয়োজন শুরু হয় ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে, ২৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায়। তৃতীয় দিনের পরিবেশনার শুরুতেই দলগত সেতার বাদন পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ। সেতার দলে ছিলেন প্রসেনজিৎ মণ্ডল, টি এম সেলিম রেজা, রিংকু চন্দ্র দাস, মেহরিন আলম, জ্যোতি ব্যানার্জী, মোহাম্মদ কাউসার এবং জাহাঙ্গীর আলম শ্রাবণ। তাদের সঙ্গে তবলায় ছিলেন প্রশান্ত ভৌমিক ও সুপান্থ মজুমদার। পণ্ডিত কুশল কুমার দাসের কম্পোজিশনে তারা কিরওয়ানি রাগে সেতার অর্কেস্ট্রা পরিবেশন করেন। পরিবেশনা শেষে শিল্পীদের হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন বরেণ্য শিল্পী বিদ্বান ভিক্ষু বিনায়করাম।
এরপর ঘাটম ও কাঞ্জিরা পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন গ্র্যামি বিজয়ী পদ্মভূষণ বিদ্বান ভিক্ষু বিনায়করাম, তাঁর পুত্র সেলভাগনেশ বিনায়করাম ও পৌত্র স্বামীনাথন; অর্থাৎ এবারে এক মঞ্চে তিন প্রজন্মের পরিবেশনা একসঙ্গে উপভোগ করেন দর্শকরা। তাদের সঙ্গে মরসিংয়ে ছিলেন এ. গনেশন। নিজেদের পরিবেশনার শুরুতেই তারা ঘাটমে শিব তাণ্ডব, সেভেন অ্যান্ড হাফ বিট কম্পোজিশন বাজান। পরে তারা গুরুবন্দনা ও গণপতি তাল বাজিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। শিল্পীদের হাতে উৎসবের সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপার্সন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।
ঘাটম ও কাঞ্জিরার পর ড. ফকির শহীদুল ইসলাম ও জি এম সাইফুল ইসলামের পরিচালনায় খেয়াল পরিবেশন করে সরকারি সঙ্গীত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা পরিবেশন করেন রাগ মালকোষ। তাদের সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেছেন সৈয়দ সাজিদ হোসেন ও মো. রাশেদুল হাসান। হারমোনিয়ামে ছিলেন মো. মফিজুর রহমান, সারেঙ্গীতে মতিয়ার রহমান। পরিবেশনা শেষে তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খ্যাতিমান শিল্পী পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী।
এরপর সরোদ পরিবেশন করেন শিল্পী আবির হোসেন। তাঁর সঙ্গে তবলায় ছিলেন যোগেশ শামসি, তানপুরায় অভিজিৎ দাশ। পরিবেশন করেন রাগ আভোগী। পরিবেশনা শেষে আবির হোসেনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী।
সরোদ পরিবেশনার পর বাঁশি বাদন নিয়ে মঞ্চে আসেন গাজী আবদুল হাকিম। তিনি দেশ রাগ, পিলু ঠুমরী ও কয়েকটি ধুন পরিবেশন করেন শ্রোতাদের জন্য। তাঁর সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, তানপুরায় সঙ্গত করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী সামীন ইয়াসার ও এস এম আশিক আলভি। পরিবেশনা শেষে শিল্পীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন আবাহনী লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান।

বাঁশির পর ধ্রুপদ সঙ্গীতে দর্শকদের মোহিত করেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সনাতন ধারার বিশিষ্ট পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর। তিনি পরিবেশন করেন রাগ মাড়ু ও রাগ তিলং । তাঁর সঙ্গে পাখোয়াজে সঙ্গত করেন সুখাদ মুণ্ডে, এবং তানপুরায় সংগত করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ কুণ্ডু ও টিংকু কুমার শীল। পরিবেশনা শেষে পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকরের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।
ধ্রুপদ পরিবেশনাটি শেষে গায়কী অঙ্গের বেহালা বাদন নিয়ে মঞ্চে আসেন বিদূষী কলা রামনাথ। তিনি পরিবেশন করেন রাগ নট ভৈরব, রাগ বসন্ত। শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন যোগেশ শামসি, তানপুরাতে সঙ্গত করেন জ্যাতাশ্রী রায় চৌধুরী ও চন্দ্রা সাহা স্মৃতি। পরিবেশনা শেষে শিল্পীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি।
তৃতীয় দিনের শেষ পরিবেশনাটি ছিল পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর খেয়াল। প্রথমে তিনি পরিবেশন করেন রাগ গুনকেলি, যোগিয়া রাগে বাংলা গান। শেষে তিনি একটি ভজন পরিবেশন করেন। শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন পণ্ডিত যোগেশ শামসি, হারমোনিয়ামে গৌরব চ্যাটার্জি, তানপুরায় বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল কুমার মালাকার ও অভিজিৎ দাশ। পরিবেশনা শেষে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এম পি।
চতুর্থ দিনের আয়োজন
২৯ ডিসেম্বর শুক্রবার উৎসবের চতুর্থ দিন থাকবে মণিপুরি, ভরতনাট্যম ও কত্থক নৃত্য- সুইটি দাস, অমিত চৌধুরী, স্নাতা শাহরিন, সুদেষ্ণা স্বয়ংপ্রভা তাথৈ, মেহরাজ হক, জুয়াইরিয়াহ মৌলি। সরোদ-বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়, খেয়াল-ওস্তাদ রশিদ খান, সরোদ- পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, বেহালা- ড. মাইশুর মঞ্জুনাথ, খেয়াল-পণ্ডিত যশরাজ, চেলো- সাসকিয়া রাও, সেতার-পণ্ডিত বুদ্ধাদিত্য মুখার্জি।
পিআর/জেবি




