
ঢাকাই সিনেমায় অশ্লীলতার বিরুদ্ধে বরাবরই সরব ছিলেন চিত্রনায়ক মান্না। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ে অশ্লীল দৃশ্যের বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি এ ধরনের সিনেমা নির্মাণের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। তবে তার অভিনীত ‘ফায়ার’ সিনেমা ঘিরেই একসময় উঠেছিল অশ্লীলতার অভিযোগ। সেই অভিযোগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে সিনেমাটি থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণও জানিয়েছিলেন এই অভিনেতা।
২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ফায়ার’ সিনেমাটি নিয়ে ২৪ বছর পর আবারও শুরু হয়েছে আলোচনা। সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে মান্নার একটি পুরোনো ভিডিও। সেখানে সিনেমাটিতে কাজ করা, মাঝপথে সরে দাঁড়ানো এবং ডাবিংয়ে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে দেখা যায় তাকে। ভিডিওটি মান্নার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কৃতাঞ্জলির সূত্রে পাওয়া গেছে।
ভিডিওতে মান্নাকে বলতে শোনা যায়, ফায়ার নামে যে ছবিটি আমি করেছিলাম, সেই ছবিতে অর্ধেক কাজ করার পরে আমি আর কাজ করিনি। এমনকি আমি সিনেমায় ভয়েসও দিই নাই। আমি ডাবিংয়েও যাই নাই।
মান্নার স্ত্রী শেলী মান্নার ভাষ্য, সিনেমাটি মুক্তির আগে এর পুরো কাজ শেষ করেননি মান্না। পরবর্তী সময়ে তার পরিবর্তে ডামি ব্যবহার করে কিছু দৃশ্যের শুটিং সম্পন্ন করা হয়। মুক্তির পর সিনেমার কিছু দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা হলে বিষয়টি নিয়ে মান্নাও বিরক্ত ছিলেন।
শেলী মান্না বলেন, মুক্তির পরে দর্শক ও সমালোচকেরা যেসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন, সেসব নিয়ে মান্নার সঙ্গে প্রযোজকের দ্বন্দ্ব হয়েছিল। মান্না জেনেশুনে কখনোই কোনো অশ্লীল সিনেমায় অভিনয় করবে না। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সে নিজেই লড়েছে।
‘ফায়ার’-এ অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের অভিযোগও সরাসরি নাকচ করেছিলেন মান্না। তার বক্তব্য ছিল, একটি সিনেমায় অন্য শিল্পী, পরিচালক কিংবা প্রযোজক কী করছেন, তা সবসময় একজন অভিনয়শিল্পীর পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে নিজের অভিনয় নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলেও জানান তিনি।
মান্না বলেন, পুরো সিনেমায় আমার কো-আর্টিস্ট বা অন্য শিল্পীরা এবং ডিরেক্টর, প্রযোজক কে কী করছে, সেটা আমার যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, আমি কোনো অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয় করিনি।
পুরোনো ভিডিওতে সিনেমাটির প্রযোজকের সঙ্গে মনোমালিন্যের কথাও উঠে আসে। তবে ঠিক কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের বিরোধ তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি মান্না। শেলী মান্নার দাবি, সিনেমায় এমন কিছু ঘটছিল, যা মান্নার অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
তার ভাষায়, মান্না বুঝতে পেরেছিল, সিনেমায় অন্য রকম কিছু হচ্ছে, যা তার সঙ্গে যায় না। তার মনে হয়েছিল, তাকে ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক কিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছে। পাইরেসিসহ নানা বিষয় নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল।
এরপরই সিনেমাটি থেকে সরে দাঁড়ান মান্না। শেলী মান্নার দাবি, পরে প্রযোজক ও পরিচালক ডামি ব্যবহার করে সিনেমার কাজ শেষ করেন।
অশ্লীলতার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছিলেন মান্না। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমি সব সময় অশ্লীলতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছি।
শেলী মান্নাও জানিয়েছেন, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে মান্নার অবস্থান ছিল দীর্ঘদিনের। তিনি বলেন, সে অশ্লীল সিনেমায় কখনোই অভিনয় করেনি। কেউ যেন এমন সিনেমা না বানায়, সেটা নিয়েও কথা বলেছে। একসময় তার যুদ্ধটা একার ছিল।
তবে এই লড়াই করতে গিয়ে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন মান্না। ভিডিওতে নিজের ওপর চাপ ও নানা সমালোচনার কথাও জানান তিনি।
মান্না বলেন, অশ্লীলতা নিয়ে একার পক্ষে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আমি একা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। অশ্লীল সিনেমা সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ, আমাকে নিয়ে এসব কারণে চলচ্চিত্র অঙ্গনে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অনেক সময় বিপদের মুখোমুখিও হয়েছি।
তৎকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিস্থিতি সম্পর্কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির এক নেতা জানান, ওই সময়ে অনেক সিনেমাতেই অশ্লীল দৃশ্য যুক্ত করা হতো। এর বিরোধিতা করতেন মান্না। কয়েকজন পরিচালক, ফাইট ডিরেক্টর ও অন্যান্য কলাকুশলীকে সঙ্গে নিয়ে অশ্লীলতামুক্ত সামাজিক সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি।
ওই নেতার দাবি, শুধু অশ্লীলতা নিয়ে আপত্তিই নয়, ‘ফায়ার’ সিনেমার শিডিউল নিয়েও মান্নার জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সব মিলিয়ে সিনেমাটি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
‘ফায়ার’ সিনেমাটি পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন মোহাম্মদ হোসেন। এতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন পলি। মোহাম্মদ হোসেন বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় সিনেমাটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং মান্নার বক্তব্য প্রসঙ্গে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরটিভি/এসকে



