
ভালোবাসার সম্পর্ককে বিয়ের বন্ধনে বাঁধার অন্যতম প্রতীক আংটি। বাগদান কিংবা বিয়ের সময় প্রিয় মানুষটির আঙুলে আংটি পরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য এখন খুবই পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মুহূর্তের ছবি ও ভিডিওও বেশ জনপ্রিয়।
তবে জানেন কি, বিয়ের আংটি কেন সাধারণত বাঁ হাতের অনামিকাতেই পরানো হয়? এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও নানা ঐতিহাসিক ঘটনা। সময়ের সঙ্গে আংটির নকশা ও ব্যবহারে পরিবর্তন এলেও ভালোবাসা ও আজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতীক হিসেবে এর গুরুত্ব এখনো একই রকম।
অনামিকায় আংটি পরার পেছনে যে বিশ্বাস
প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো, বাঁ হাতের অনামিকা থেকে একটি শিরা সরাসরি হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত। এই শিরাকে বলা হতো ‘ভালোবাসার শিরা’। প্রাচীন মিসরীয়, গ্রিক ও রোমানদের মধ্যে এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।
তাদের ধারণা ছিল, ভালোবাসার অনুভূতি সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনামিকাই সবচেয়ে উপযুক্ত। আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য মানবদেহে এমন কোনো বিশেষ শিরার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়নি। তবুও এই রোমান্টিক বিশ্বাসটি আংটি পরার ঐতিহ্যের সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছে।
আংটির ইতিহাস প্রাচীন মিসর থেকে
বিয়ের আংটির ইতিহাসের শিকড় খুঁজলে প্রাচীন মিসরের কথা উঠে আসে। ফারাওদের সময়ে আংটির গোলাকার আকৃতিকে অনন্তকালের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কারণ এর কোনো শুরু বা শেষ নেই।
তখন নিজের লেজ নিজে গিলে খাওয়া সাপের প্রতীকের আংটিও ব্যবহার করা হতো। এই প্রতীক জন্ম ও মৃত্যুর চিরন্তন চক্রকে বোঝাত।
পরবর্তী সময়ে গ্রিক ও রোমানরা এই ঐতিহ্য গ্রহণ করে। প্রাচীন রোমে বাগদানের সময় লোহার আংটি দেওয়ার প্রচলন ছিল। এটি শুধু ভালোবাসার প্রতীক ছিল না, বরং দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিরও প্রতীক ছিল।
কিছু আংটিতে চাবির নকশা থাকত। এর মাধ্যমে বোঝানো হতো, স্ত্রী এখন থেকে ঘরের সম্পদের দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছেন। তৃতীয় শতকের দিকে রোমের অভিজাতদের মধ্যে সোনা ও রুপার আংটির ব্যবহারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মধ্যযুগে আংটিতে যুক্ত হয় রত্ন ও কবিতা
মধ্যযুগে বিয়ের আংটির নকশায় যুক্ত হয় হীরা, রুবি ও নীলকান্তমণির মতো মূল্যবান পাথর। আংটির সঙ্গে ভালোবাসা ও আবেগের নানা প্রতীকও যুক্ত হতে থাকে।
ষোলো শতকে ইউরোপে বিশেষ ধরনের একটি আংটি জনপ্রিয় হয়। এতে দুই বা তিনটি আলাদা আংটি একসঙ্গে যুক্ত থাকত। বাগদানের সময় পাত্র ও পাত্রী আলাদা অংশ পরতেন। পরে বিয়ের দিন সেগুলো একত্র করে কনের আঙুলে পরিয়ে দেওয়া হতো।
আয়ারল্যান্ডেও এমন এক ধরনের আংটির প্রচলন ছিল, যাতে দুটি হাত একটি হৃদয় ধরে আছে—এমন নকশা থাকত। আবার কিছু আংটির ভেতরের দিকে প্রেমের কবিতা বা ভালোবাসার কথা খোদাই করা হতো।
একসময় আংটির বদলে দেওয়া হতো সেলাইয়ের বস্তু
অলংকারকে অপচয় মনে করত আমেরিকার কট্টর ধর্মীয় সমাজের একটি অংশ। ফলে সেখানে বর হবু স্ত্রীকে আংটির বদলে সেলাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি ধাতব বস্তু উপহার দিতেন।
পরে সেই বস্তুটির ওপরের অংশ কেটে সেটিকে আংটির মতো করে আঙুলে পরতেন কনে। এভাবেও ভালোবাসা ও বিয়ের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে আংটির প্রচলন গড়ে ওঠে।
হীরার আংটি জনপ্রিয় হলো যেভাবে
হীরার ব্যবহার অবশ্য অনেক পুরোনো। তবে বিয়ের আংটিতে হীরার ব্যবহার জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৪৭৭ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ান তার হবু স্ত্রী মেরি অব বারগান্ডিকে হীরাখচিত বাগদানের আংটি উপহার দেন। এরপর অভিজাত সমাজে হীরার আংটির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে।
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে হীরার বিয়ের আংটি জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে হীরা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডি বিয়ার্স। ১৯৩০-এর দশকে হীরার বিক্রি কমে গেলে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের প্রচারণা শুরু করে।
১৯৪৭ সালে তারা ‘আ ডায়মন্ড ইজ ফরএভার’ স্লোগান চালু করে। হলিউডের তারকাদের সিনেমায় হীরার অলংকার ব্যবহার করে প্রচার করা হয় যে, হীরা ভালোবাসার স্থায়ী প্রতীক। এর ফলে হীরার বিয়ের আংটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৩৯ সালে আমেরিকায় মাত্র ১০ শতাংশ কনে হীরার আংটি পেলেও ১৯৯০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে।
পুরুষের হাতেও বিয়ের আংটি
একসময় বিয়ের আংটি মূলত নারীরাই পরতেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক সেনা পরিবার ও প্রিয় মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে আংটি পরতে শুরু করেন।
এরপর পুরুষদের মধ্যেও বিয়ের আংটি পরার প্রচলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে আংটি শুধু বিয়ের প্রতীক নয়, ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে তৈরি হীরা, পুরোনো ধাঁচের নকশা কিংবা নীল-সবুজ রত্নখচিত নিজের পছন্দমতো আংটিও এখন অনেকের পছন্দ।
ভালোবাসার প্রতীক হয়েই টিকে আছে আংটি
সময় বদলেছে, বদলেছে আংটির নকশা ও উপাদান। কিন্তু এর মূল অর্থ বদলায়নি। হাজার বছর ধরে ধাতুর তৈরি ছোট এই গোল বৃত্তটি দুজন মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে আছে।
অনামিকায় আংটি পরার পেছনের পুরোনো বিশ্বাস হয়তো বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য নয়, কিন্তু সেই বিশ্বাসকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঐতিহ্য আজও ভালোবাসার অন্যতম সুন্দর প্রকাশ হয়ে টিকে আছে।
আরটিভি/জেএমএ



