
সমুদ্রের তলায় এমন এক প্রাণী রয়েছে, যার শরীরে আছে তিনটি হৃদপিণ্ড, রক্তের রং নীল। বিপদ বুঝলে মুহূর্তেই বদলে ফেলতে পারে শরীরের রং ও ত্বকের গঠন। শুধু তাই নয়, প্রজননের পর জীবনচক্রও বেশ অদ্ভুত। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস পুরুষ সঙ্গীকেই আক্রমণ করে খেয়ে ফেলতে পারে!
তবে এই আচরণ সব অক্টোপাসের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মধ্যে ‘সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম’ বা যৌন নরখাদকতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অক্টোপাসকে আধুনিক ও অদ্ভুত প্রাণী মনে হলেও তাদের পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব বহু কোটি বছর আগের। বিজ্ঞানীদের পাওয়া প্রাচীনতম পরিচিত অক্টোপাস-আত্মীয়ের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ ডাইনোসরের আবির্ভাবেরও বহু আগে এই প্রাণীগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল।
বর্তমান অক্টোপাস সেফালোপড শ্রেণির মোলাস্ক। স্কুইড ও কাটলফিশও একই শ্রেণির প্রাণী। নরম শরীর, আটটি বাহু এবং অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যে অক্টোপাস অন্যতম বিস্ময়কর।
অক্টোপাসের শরীরে রয়েছে তিনটি হৃদপিণ্ড। এর মধ্যে দুটি হৃদপিণ্ড ফুলকার দিকে রক্ত পাঠায় এবং অন্যটি শরীরের বাকি অংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে।

মানুষের রক্ত লাল হলেও অক্টোপাসের রক্ত নীলচে। এর কারণ, অক্সিজেন পরিবহনে তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিবর্তে হিমোসায়ানিন নামের তামা-সমৃদ্ধ প্রোটিন কাজ করে। ঠান্ডা ও কম অক্সিজেনযুক্ত পানিতে এটি অক্টোপাসের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর।
২০০৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় Octopus cyanea প্রজাতির একটি স্ত্রী অক্টোপাসের যৌন নরখাদকতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। পালাউ, মাইক্রোনেশিয়ায় পর্যবেক্ষণের সময় দেখা যায়, একটি ছোট পুরুষ অক্টোপাসের সঙ্গে একাধিকবার মিলনের পর স্ত্রীটি তাকে আক্রমণ করে। পরে পুরুষটিকে নিজের গুহায় নিয়ে গিয়ে প্রায় দুই দিন ধরে তার দেহ খাওয়ার ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় এটিকে ওই প্রজাতির যৌন নরখাদকতার প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে সব স্ত্রী অক্টোপাস মিলনের পর পুরুষ সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে এমনটি বলা ঠিক নয়। বিভিন্ন প্রজাতির আচরণে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বরং স্ত্রীটির কাছাকাছি গিয়ে মিলন করাই অনেক পুরুষ অক্টোপাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ কারণে কিছু প্রজাতির পুরুষ দূরত্ব বজায় রেখেও মিলনের চেষ্টা করে।
অক্টোপাসের প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ ব্যতিক্রমী। পুরুষের একটি বিশেষায়িত বাহু থাকে, যার নাম ‘হেক্টোকোটাইলাস’। এই বাহুর মাধ্যমে স্ত্রী অক্টোপাসের শরীরে শুক্রাণু পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রজাতিভেদে এই বাহুর গঠন ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
মিলনের পর পুরুষ অক্টোপাসের জীবনও সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অনেক প্রজাতির পুরুষ মিলনের কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যায়।
অন্যদিকে স্ত্রী অক্টোপাস ডিম পাড়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে সেগুলো পাহারা দেয়। এ সময় অনেক প্রজাতির স্ত্রী অক্টোপাস খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। ডিমের কাছে অক্সিজেন পৌঁছাতে বাহু দিয়ে পানি প্রবাহিত করে এবং শিকারিদের হাত থেকে ডিম রক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত অনাহার ও শারীরিক অবনতির কারণে তার মৃত্যু হয়।
কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে ডিম পাহারা দেওয়ার সময় অবিশ্বাস্য রকম দীর্ঘ। গভীর সমুদ্রের গ্র্যানেলেডোন বোরিওপ্যাসিফিকা প্রজাতির একটি স্ত্রী অক্টোপাসকে প্রায় ৫৩ মাস ডিম পাহারা দিতে দেখা গেছে। এটি কোনো প্রাণীর সবচেয়ে দীর্ঘ নথিভুক্ত ব্রুডিং বা ডিম পাহারা দেওয়ার সময়গুলোর একটি।
অক্টোপাসের অন্যতম বিস্ময়কর ক্ষমতা হলো ছদ্মবেশ ধারণ। ত্বকের বিশেষ কোষ ‘ক্রোমাটোফোর’-এর সাহায্যে তারা দ্রুত শরীরের রং পরিবর্তন করতে পারে। শুধু রং নয়, ত্বকের গঠন বা টেক্সচারও বদলে আশপাশের পাথর, প্রবাল কিংবা পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
বিপদে পড়লে অক্টোপাস কালি ছুড়ে শিকারিকে বিভ্রান্ত করে দ্রুত পালিয়েও যেতে পারে।
অক্টোপাসকে শুধু আট বাহুর সামুদ্রিক প্রাণী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাদের স্নায়ুতন্ত্র অত্যন্ত জটিল। শরীরের বিপুলসংখ্যক নিউরন বাহুগুলোতেও রয়েছে। ফলে বাহুগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবেও বিভিন্ন কাজ করতে পারে।
সমস্যা সমাধান, শেখা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে অক্টোপাসকে পৃথিবীর অন্যতম বুদ্ধিমান অমেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতি বছর ৮ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব অক্টোপাস দিবস। দিনটির লক্ষ্য শুধু এই অদ্ভুত প্রাণী সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ানো নয়; বরং তাদের বুদ্ধিমত্তা, জীববৈচিত্র্যে ভূমিকা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সচেতনতা তৈরি করা।
সামুদ্রিক দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং অক্টোপাস চাষকে ঘিরে প্রাণীকল্যাণ ও পরিবেশগত নানা প্রশ্নও রয়েছে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে তৈরি এই প্রাণীর তিন হৃদপিণ্ড, নীল রক্ত, অসাধারণ ছদ্মবেশ, বুদ্ধিমত্তা এবং বিস্ময়কর প্রজনন ও জীবনচক্র সব মিলিয়ে অক্টোপাস আজও সমুদ্রের অন্যতম রহস্যময় প্রাণী।
আরটিভি/এসকে


