
সাধারণত মাছের বেঁচে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য। তবে প্রকৃতিতে এমন কিছু মাছ রয়েছে, যারা পানির বাইরে ডাঙায় উঠে চলাফেরা করতে পারে, বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে, এমনকি মাসের পর মাস কাদার নিচে টিকে থাকতে পারে। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে এসব মাছ বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
বাংলায় প্রচলিত একটি কথা হলো, ‘পানির মাছ ডাঙায় উঠলে যেমন হয়’। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার অর্থে কথাটি ব্যবহার করা হলেও প্রকৃতির কিছু মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও অভিযোজনক্ষমতার কারণে এসব মাছ পানির বাইরেও বেঁচে থাকতে পারে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফের গবেষক অ্যান্ডি টার্কো এ ধরনের মাছ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, কিছু মাছ পানি ও ডাঙা দুই পরিবেশেই টিকে থাকার মতো শারীরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।
এমনই একটি মাছ ম্যানগ্রোভ রিভুলাস। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাছটি লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে আসে। এর ত্বকের নিচে থাকা ঘন রক্তনালির মাধ্যমে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ সম্ভব হয়। পাশাপাশি ত্বক শরীরে লবণের ভারসাম্য বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ভূমিকা রাখে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওয়াকিং ক্যাটফিশও পানির বাইরে চলাফেরা করতে সক্ষম। এ মাছের বিশেষ শ্বাসযন্ত্র বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে সাহায্য করে। শরীর বাঁকিয়ে ডানে-বাঁয়ে দোলানোর পাশাপাশি শক্ত বুকের পাখনার সাহায্যে এটি ডাঙায় এগিয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মাছটি আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতি হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, মাডস্কিপার দিনের বড় একটি অংশ পানির বাইরে কাদামাটিতে কাটায়। কাদার ওপর চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মাছটি বেশ দক্ষ। এদের বিশেষ অভিযোজন পানির বাইরে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির মৎস্যবিজ্ঞানী জর্জ বার্গেসের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টির পর ক্যাটফিশ ও বাইনজাতীয় কিছু মাছকে রাস্তা পার হতে দেখা অস্বাভাবিক নয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এসব মাছ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে যাওয়ার জন্যও ডাঙা ব্যবহার করতে পারে।
ব্রাজিলের কিছু চার চোখা মাছ পানির ওপর ভেসে থাকার পাশাপাশি কাদামাটিতে উঠে পোকামাকড় শিকার করে। আবার ইলজাতীয় কিছু মাছ স্যাঁতসেঁতে কাদার ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারে। তাদের ত্বকও অক্সিজেন গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
কিলিফিশের কিছু প্রজাতিও পানির বাইরে লাফিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এদের লাফালাফি নিছক এলোমেলো চলাচল নয়; বরং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল।
মামিচগ নামে পরিচিত একধরনের কিলিফিশ পানির বাইরে এসে চোখ দিয়ে আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে। লাফ দেওয়ার সময় চারপাশের দৃশ্য দেখে পানির অবস্থান নির্ণয় করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পানির বাইরে টিকে থাকার সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণগুলোর একটি পশ্চিম আফ্রিকার লাংফিশ। এদের ফুলকার পাশাপাশি ফুসফুসের মতো বিশেষ শ্বাসযন্ত্র রয়েছে, যার সাহায্যে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।
শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে গেলে লাংফিশ শরীর থেকে শ্লেষ্মাজাতীয় পদার্থ নিঃসরণ করে কোকুন তৈরি করে। এরপর কাদার নিচে আশ্রয় নিয়ে বিপাকক্রিয়া কমিয়ে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কাটাতে পারে। অনুকূল পরিবেশ ফিরে এলে বৃষ্টির পানিতে কাদা ভিজে গেলে তারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, শিকারির হাত থেকে বাঁচা কিংবা খাবারের সন্ধান—বিভিন্ন কারণে মাছ পানি থেকে বাইরে আসে। কিছু প্রজাতি সঙ্গী খুঁজতে বা নতুন জলাশয়ে পৌঁছাতেও ডাঙা পাড়ি দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে গ্রুনিয়ন নামের ছোট মাছ প্রজননের জন্য বসন্তকালে দল বেঁধে বালুচরে উঠে আসে। সেখানে তারা ডিম পাড়ে। অন্যদিকে, চার চোখা মাছ কাদামাটিতে উঠে পোকামাকড় শিকার করে।
প্রকৃতির এসব মাছ প্রমাণ করে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে প্রাণীরা কত বিচিত্র উপায়ে নিজেদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। সাধারণভাবে মাছকে শুধু পানির প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কিছু প্রজাতির জীবনযাপন সেই ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
আরটিভি/এসকে


