
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ১০৩, এলিফ্যান্ট রোডে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারের স্থায়ী রেকর্ডসমূহ ও আরকাইভস সামগ্রী সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বা আনুষঙ্গিক বিষয়াদি পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস প্রতিষ্ঠাকল্পে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট The National Archives Ordinance, 1983 (Ordinance No. XXXIX of 1983) প্রণীত হয়। উক্ত অধ্যাদেশটি ১৩ অক্টোবর ২০১১ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় অনুবাদ আকারে প্রকাশিত হয়।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২৭ জুন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৯ আগস্ট ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ ১৪ বৎসরের প্রচেষ্টায় সরকার The National Archives Ordinance, 1983 রহিতক্রমে প্রয়োজনীয় সংশোধনপূর্বক পরিমার্জনরূপে ও যুগোপযোগী করে তা নতুনভাবে প্রণয়ন করা সমীচীন ও আবশ্যক বিবেচনায় ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২১ (২০২১ সনের ২১ নং আইন) প্রণয়ন করে।
আইনটি প্রণয়নের ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা-বৈঠক কর্তৃক ১৬ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২০-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদিত হয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দে উক্ত আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। এভাবে ইতোপূর্বে আইন প্রণয়নের সকল আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালনপূর্বক ০৬ জুন ২০২১ খ্রিস্টাব্দে আইনটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বা. জা. স. বিল নং ১৩/২০২১ আকারে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব কে এম খালিদ এমপি মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। বিলের উপর সংশোধনী প্রস্তাবসহ নাতিদীর্ঘ আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক শেষে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দে বিলটি মহান জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত বা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দে উক্ত বিলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেন এবং আইনটি সর্বসাধারণের অবগতির জন্য বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২১ পর্যালোচনায় দেখা যায়, আইনের প্রকৃতি হলো বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির মূল উপাত্ত, ঐতিহাসিক গুণসম্পন্ন নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, পাণ্ডুলিপি এবং জাতির মেধা-সম্পদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং গবেষণা ও তথ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখা। এককথায় দেশের সরকারি এবং ব্যক্তিগত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা। সরল পাঠে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২১ দেখা যায়, মূলত আইনটি তিনটি অংশে বিভক্ত: ক) প্রারম্ভিক অংশ : বলবৎকরণ ও প্রস্তাবনা; খ) মূল অংশ : ধারা-২৬টি ও উপধারা-৭৪টি; এবং গ) শেষ অংশ : তপশিল-১টি।
বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২১ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইনের মূলত আটটি প্রকৃতি লক্ষ্যণীয় : প্রথমত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী চিহ্নিতকরণ; দ্বিতীয়ত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী সংগ্রহ; তৃতীয়ত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রীর ব্যবস্থাপনা; চতুর্থত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী সংরক্ষণ; পঞ্চমত আরকাইভ প্রশাসন পরিচালনা; ষষ্ঠত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ; সপ্তমত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রীর ব্যবহার তথা তথ্য সরবরাহ বা সেবা প্রদান; অষ্টমত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রীর উন্মুক্ত প্রদর্শনী বা গণপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।
জাতীয় আরকাইভসের প্রধান কার্যাবলি তথা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক অথবা সাহিত্যিক মূল্যসম্পন্ন দলিল-দস্তাবেজ, পাণ্ডুলিপি এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও তথ্য সরবরাহ করা যা আইনে ফুটে উঠেছে। আইনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরের প্রশাসনিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন দলিল-দস্তাবেজ, পাণ্ডুলিপি, মানচিত্র, বই-পুস্তক, পত্রিকা, চিঠি, প্রতিবেদন, নিবন্ধনবহি, গেজেট, গেজেটিয়ার, নকশা, আলোকচিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়ালসামগ্রীসহ নথিপত্র ও আরকাইভ সামগ্রী সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং তথ্যসেবা প্রদান করা। আইনটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো, আইনে জাতীয় আরকাইভস অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর আলোকে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভসকে সরকারের ‘কেন্দ্রীয় রেকর্ড সংরক্ষণাগার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে (ধারা ৪)। আইনে সরকারি আরকাইভস, ব্যক্তিগত আরকাইভস, সরকারি রেকর্ড, ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং পাণ্ডুলিপিকে পৃথক পৃথকভাবে চিহ্নিত করে সরকারি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ২৫ বৎসর এবং ব্যক্তিগত রেকর্ডের ক্ষেত্রে ৩০ বৎসরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে (ধারা ২)। আইনে জাতীয় আরকাইভসের জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ সরকারি ও ব্যক্তিগত আরকাইভস চিহ্নিতকরণ, স্থানান্তর, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদান করবেন (৫,৬,৭)।
আইনে মহাপরিচালকের কার্যাবলি, দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে (ধারা ৮)। দেশের যেখানেই সরকারি রেকর্ড রয়েছে সেখানে মহাপরিচালকের প্রবেশের অধিকার ও উক্ত রেকর্ডের তালিকাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা এবং অন্যূন ২৫ (পঁচিশ) বৎসরের পুরাতন রেকর্ডপত্র স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য জাতীয় আরকাইভসে স্থানান্তর করার বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ১০)। আইনে Commissions of Inquiry Act, 1956 এর অধীন যেকোনো তদন্ত কমিশন, তদন্ত কমিটি, তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল রেকর্ড ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাতীয় আরকাইভসে জমা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ১৪)। আইনে নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে জনসাধারণের জন্য গবেষণা ও তথ্যসেবাসহ অন্যান্য সেবা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে (ধারা ১৩)। আইনে রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রী জাতীয় আরকাইভস হতে অন্য কোথাও স্থানান্তর করতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে (ধারা ১৮)। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে আইনে জাতীয় আরকাইভসের বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণে অনলাইন ডিজিটাল সেবাসহ অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে (ধারা ১৯)। আইনে আরকাইভ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরিতে আরকাইভস বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কোর্স বা ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালনার বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে (ধারা ২০)। আইনে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং সাহিত্যিক মূল্যসম্পন্ন পুরাতন পাণ্ডুলিপি, দলিল-দস্তাবেজ ও রেকর্ড বিদেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। (ধারা ১৫)। আইনে রেকর্ড ও আরকাইভ সামগ্রীর ক্ষতি সাধন ও অন্যান্য অপরাধের জন্য যুগোপযোগী শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো রেকর্ডকে বিকৃত, দাগান্বিত, ছিঁড়ে ফেললে, ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেললে বা হ্যাক করলে এককথায় কোনো রেকর্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে তিন বৎসরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার কোনো রেকর্ড আত্মসাৎ করলে বা দেশে অথবা বিদেশে পাচার করলে বা জাতীয় আরকাইভস ভবনের বাহিরে স্থানান্তর করলে পাঁচ বৎসরের কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ২২)। সর্বোপরি, আইনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে অধিদপ্তরসহ বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভসের ভিত্তিমূল শক্তিশালীকরণসহ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিশেষে, দেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন প্রণয়ন করা সরকারের একটি কার্যকরী পদক্ষেপ। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে আরকাইভিং কার্যক্রম বা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে। আইনটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। আইনটির সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক ইতিহাস বিনির্মাণে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি ইতিহাস বিকৃতি রোধ পাবে। ফলে জাতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করবে। এতে করে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় আরকাইভসের উপপরিচালক (আরকাইভস) জনাব তাহমিনা আক্তার বলেন “বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন, ২০২১ প্রণয়ন করতে আমরা কঠোর ও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। এখন এই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের সময় হয়েছে। আমরা চাই, এই আইনের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয় সংস্কৃতি উন্নতি লাভ করুক যার সুফল সাধারণ জনগণ পাবে।”
লেখক : মোখলেছুর রহমান, পিএইচ.ডি গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা-১৩৪২।




