ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

শেখ হাসিনার আমলে কেমন আছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা?

বিপ্লব কুমার পাল

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৩ পিএম
লেখক : বিপ্লব কুমার পাল

আবারও কী মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি? গত কয়েক দিনে মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনার কারণে এই প্রশ্ন জোরালো হয়েছে। বাঙালি সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে আগামী অক্টোবরে। আর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে অপশক্তিগুলো বরাবরই ষড়যন্ত্র করে। নিশ্চয় এবারও তারা থেমে নেই। সম্প্রতি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা সেই ইঙ্গিতই দেয়। অথচ গত বছর দুর্গাপূজার সময় কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার পর, দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ হয়ে যা।

বাংলাদেশে একটি কথা প্রচলিত- ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। বাংলাদেশের ইতিহাসও তাই বলছে। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকেন, নির্বিঘ্নে ও উৎসবের সাথে ধর্মীয় আচার পালন করেন। তবে বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় ঘটেছে। গণমাধ্যমকর্মী হওয়ায় সেসব ঘটনার আদ্যপ্রান্ত খুঁজেছি ঘটনাস্থলে গিয়ে। কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, পাবনার সাঁথিয়া, রংপুরের পীরগঞ্জ, খুলনায় রূপসায় ঘটনার মূলে গেলে দেখা যায়, জামায়াত-বিএনপির একটি গোষ্ঠী এসব গুজব ছড়ায়। তারা ইসলাম ধর্ম রক্ষার দোহায় দিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে। অন্য গ্রাম থেকে ট্রাকে-বাসে করে লোকজন আনা হয়। সেখানে সবচেয়ে বেশি থাকে মাদ্রাসার তরুণ শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, মুসলমান প্রতিবেশি কখনই হিন্দু বাড়িতে হামলা করেনি। হামলাকারীরা অন্য গ্রামের বাসিন্দা, যাদের উত্তেজিত করে ট্রাকে-বাসে করে ঘটনাস্থলে আনা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন ঘটনাস্থলে আসে, তখন বিক্ষুব্ধ মানুষের জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার দলের নেতারাও বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে ব্যর্থ হয়।

তবে গেল বছর দুর্গাপূজার সময় সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার পর আওয়ামী লীগ সরকার বেশ কিছু ব্যবস্থা নেয়। যার কারণে গেল ৯ মাসে প্রতিমা ভাংচুর কিংবা মন্দিরে হামলার ঘটনা প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে যায়। কিন্তু সামনে তো নির্বাচন, তাই বরাবরের মতো ফের অশুভ শক্তির নজর পড়েছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর। কারণ এই ভোটাররা অনেক আসনের জয়-পরাজয় পাল্টে দিতে পারেন। কারণ চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬.৬৫ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ১৩.৫ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ১২.৯৮ শতাংশ ও খুলনা বিভাগে ১১.৫ শতাংশ সনাতম ধর্মালম্বীর বসবাস। আর ঢাকা বিভাগে ৪.৯৭ শতাংশ ও রাজশাহী বিভাগে ৫.৮৫ শতাংশ। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভয় বা নির্যাতন করে এলাকা ছাড়া করতে পারলে সবচেয়ে লাভবান হবে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তি।

দেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্থান ভাবধারায় বিশ্বাসীরা এখনও সক্রিয়। তাদের হাতেই বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। যার শুরুটা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। বাংলাদেশ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমূলে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছে বিএনপি আর তার সবচেয়ে বড় জোট সঙ্গী জামায়েতে ইসলাম। তাই প্রতিবার নির্বাচনে তারা হারলে বা জিতলেও সবচেয়ে বড় আক্রোশ মিটিয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন, ধর্ষণ এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করে।

২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর সহিংসতার দগদগে ঘা এখনো দৃশ্যমান। ওই সময় ১৪ হাজার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন ৫ হাজার ৫৭১টি অভিযোগের তথ্য প্রমাণ খুঁজে পান। এর মধ্যে খুনের ঘটনা ৩৫৫টি। ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ গুরুতর অপরাধের ৩ হাজার ২৭০টি ঘটনা চিহ্নিত করা হয়।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও থেমে নেই সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। রামু, নাসিরনগর, অভয়নগর বা রামু’র মতো ঘটনাগুলোর নমুনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সাময়িক ভুল বুঝাবুঝি বা উগ্রবাদীদের ইন্ধনে মানুষ উত্তেজিত হয়ে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। এরপর তা ছড়াতে ছড়াতে ব্যাপক আকার ধারণ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা, লেখালেখি ও সংসদে কথা হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারাও সচেতন হয়েছে। একারণে কমতে শুরু করেছে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও বুঝতে পারছেন নিজ এলাকায় এমন একটা সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হওয়া কতোটা লজ্জাকর। তাই তো এমন কোন ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় রাজনীতবীদরা এলাকায় যাচ্ছেন, মানুষের সাথে কথা বলে আস্বস্ত করছেন। একইসাথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও যথেষ্ট সচেতন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য রাজনীতিবীদ এবং প্রসাশনকে দায়বদ্ধ করা, জবাবদিহিতার আওতায় আনাসহ নানামুখী উদ্যোগের কারণেই বর্তমানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা কমে যাওয়ায় প্রধান ভূমিকা রাখছে। এখনও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনার মূল কারণ স্থানীয় রাজনীতি, পূর্বশত্রুতা বা জমি বিরোধের জেরে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন নিপীড়ন বাড়লেও ২০২২ সালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতন কমেছে। প্রতিমা ভাংচুর, জমি দখল সহ কিছু ক্ষত্রে নির্যাতন কমেছে। কমেছে ধর্ষণ আর হত্যার সংখ্যাও।

গবেষণা বলছে, বর্তমানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পুর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো আছে। গত ১৩ জুলাই ঢাকায় ‘বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি: সমস্যা এবং উত্তরণ’ বিষয়ে এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ল অব দ্য কমন পিপলের (এলকপ) পক্ষ থেকে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয় ‘সংখ্যালঘুরা তুলনামূলক শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অনেক ভালো অবস্থানে আছেন।’

শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। এরমাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিশু ও বয়স্করা মন্দির ভিত্তিক লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তীর্থযাত্রা ও ধর্মীয় পন্ডিতদের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মন্দির, উপাসনালয় নির্মাণ ও সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য বর্তমান সরকার যা করেছে

২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর দীর্ঘ ৬০ বছরের পুরানো সমস্যা মিটিয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকে দেড় বিঘা জমি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি মালিকানা দেওয়ার ক্ষেত্রে হেবা আইনের নিয়মমাফিক নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে সম্পত্তি হস্তান্তর করার সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে। হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রি আইন; শত্রু সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন করা হয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের স্থায়ী আমানত ২১ কোটি টাকা হতে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের জন্য হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ হতে অনুদান সহায়তা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে সারা দেশে ৭ হাজার ৪০০টি মন্দিরভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতি বছর ২ লাখ ২ হাজার জনকে প্রাক-প্রাথমিক, বয়স্ক ও ধর্মীয় গ্রন্থ গীতা শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৮০৮টি মন্দিরের সংস্কার আর উন্নয়ন করা হয়েছে। এত ব্যয় হয়েছে ২১৮ কোটি টাকা। ৮৮৯টি হিন্দু শ্মশানের অনুকূলে ৩৩ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ৪ হাজার ২০৩ জন অসচ্ছল ও দুস্থ হিন্দু ব্যক্তির অনুকূলে ৬৬ কোটি টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে।

২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় মোট ১৫৮টি মন্দির ও শ্মশান সংস্কারের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের উন্নয়নে আরও ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য বর্তমান সরকারের অবদান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত প্যাগোডাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করেন। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ১০০টি শিক্ষাকেন্দ্রে ৬ হাজার বৌদ্ধ শিশুকে শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২টি জেলার ৬২ উপজেলায় ৩০০টি শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে ২০ হাজার বৌদ্ধ শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক ধর্মীয় ও নৈতিকতা শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে।

রাজধানীর পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক মানের বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভবন কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২১ কাঠা জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জাতীয় উন্নয়নে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্তকরণ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ২৬০ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ধর্মীয় নেতাকে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

১৯৮৪ সালের বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট গঠিতহওয়ার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত ট্রাস্টের স্থায়ী আমানত ছিল ৩ কোটি টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তা ৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সংস্কার ,মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১ হাজার ৫৩৯টি বৌদ্ধ ধর্মীয় প্যাগোডা বা বেগুরা বা বিহারের অনুকূলে ৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ৩০১টি বৌদ্ধ শ্মশানের অনুকূলে ৭৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের ২৭ জুলাই নেপালের লুম্বিনীতে একটি বৌদ্ধবিহার নির্মাণের লক্ষ্যে নেপালের লুম্বিনীর ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়া অনুমোদন দিয়েছেন। বিদেশের মাটিতে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সম্মানে বৌদ্ধবিহার নির্মাণে অর্থায়ন বিশ্বের সকল দেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বের জন্য রোল মডেল।

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য শেখ হাসিনা সরকারের অবদান

খ্রিস্টান ধর্মীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও শেখ হাসিনা সরকার সমানভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংস্কার মেরামত উন্নয়নের জন্য সারা দশে ৩১৫টি গির্জার অনুকূলে ১ কোটি ১৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা ও ৩৪টি সেমেট্রির অনুকূলে ১৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে।

১৯৮৩ সালে খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বিষয়ক অধ্যাদেশ জারির ২৬ বছর পর ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর বহু প্রত্যাশিত খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ২০১৮ সালে খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট আইন প্রবর্তন করা হয়। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর বিগত ১০ বছরে ট্রাস্টের এনডাওমেন্ড তহবিলের আয় থেকে ৫৩২টি চার্চ বা উপাসনালয় সংস্কার মেরামত ও উন্নয়নের জন্য ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। ট্রাস্টের এনডাওমেন্ট তহবিলের আয় থেকে গত চার বছরে ১৮টি সানডে স্কুলের জন্য ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।

শুভ বড়দিন উদযাপন উপলক্ষে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল হতে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেশের ১ হাজার ৩৯টি চার্চের অনুকূলে বিতরণ করা হয়েছে। গত সাত বছরে ট্রাস্টের আওতায় পালক-পুরোহিতদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সাতটি কর্মশালা ও ছাত্র-যুবকদের নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক ১৮টি যুব কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এতে ৬০৬ জন পালক-পুরোহিত এবং ১ হাজার ৬২৭ জন ছাত্র-যুবকসহ মোট ২ হাজার ২২৩ জন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টিদের ব্যক্তিগত অনুদানে খুলনা জেলায় ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে গৃহহিণীদের জন্য গৃহনির্মাণ কর্মসূচির আওতায় দুটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

১৯৭১-এর ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তাঁরা আমাদের ভাই। তাঁদের রক্ষার ভার আমার আপনার উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়।’বঙ্গবন্ধুর এই অমৃত বাণী বুকে ধারণ করে রাষ্ট্রপরিচালনা করছেন জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি সভায় স্মরণ করিয়ে দেন, এই দেশে কেউ সংখ্যালঘু নয়। তিনি বলেছেন, ‘কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খ্রিষ্টান - তা দেখে সেবা করি না আমরা। সব রক্তের রং লাল। মুক্তিযুদ্ধে সবার রক্ত মিশে গেছে এক স্রোতে। তাই এ দেশ সবার। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিয়ে বাঁচবে ‘। তাই তো মনে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরই আস্থা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ইশতেহারে কৃষি উন্নয়নে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার
কৃষিবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন ও অঙ্গীকারের জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের খ্যাতি যেমন সুবিদিত, তেমনিভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের দক্ষতা ও প্রতিপালনের আন্তরিকতা সন্দেহাতীত। বঙ্গবন্ধুর কৃষি ভাবনা প্রসূত নীতি ও দর্শন কৃষিতে আজকের পরিকল্পনা ও রূপরেখার অন্যতম মাপকাঠি।  বঙ্গবন্ধু কৃষির যে ভিত তৈরি করেছিলেন তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের পুরো কৃষি খাত।  সে কারণেই গত দেড় দশকে বাংলাদেশের কৃষি খাত অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে দেশের প্রধান খাদ্য শস্য ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে। চাল উৎপাদনে দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ-এ কথা কারো অজানা নয়।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্রে, টানা ষষ্ঠ বছরে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ক্রমাগত বেড়েছে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে চালের উৎপাদন সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে।  মোট চাল উৎপাদন বছরে ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩.৯১ কোটি টন হয়েছে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ।  বর্তমানে অন্যান্য কৃষি পণ্য উৎপাদনেও বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর। সবজি ও পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এ ছাড়া পাট উৎপাদনে ২য়, চা উৎপাদনে ৪র্থ এবং আলু উৎপাদনে ৭ম অবস্থানে আমাদের দেশ।  দেশি-বিদেশি ফল চাষেও অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে বেশ। স্ট্রবেরি, মাল্টা, ড্রাগন, রাম্বুটান, কফি, কাজুবাদাম, গোলমরিচসহ অপ্রচলিত কিন্তু লাভজনক বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে কৃষকদের।  ২০০৬ সালে মাথাপিছু ফল গ্রহণের হার যেখানে ছিল ৫৫ গ্রাম, ১৫ বছরে তা বেড়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ৮৫ গ্রাম।  মাছ চাষ দেশে মৎস্য খাতের চেহারা আমূল বদলে দিয়েছে।  মাংস ও ডিম সরবরাহকারী পোল্ট্রি খামার এবং দুধ ও মাংসের জন্য পশুপালন আজ সর্বব্যাপী।  মৎস্য ও পশুপালনে বাংলাদেশের অসাধারণ সাফল্যের ফলে জনসংখ্যার মাথাপিছু প্রোটিন এবং দুধ গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।  বাংলাদেশ আজ অল্প সংখ্যক দেশের অন্তর্ভুক্ত যারা মাছের উৎস থেকে অর্ধেকেরও বেশি খাদ্য প্রোটিন গ্রহণ করে। সুতরাং এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বঙ্গবন্ধুর নীতি অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশ এখন অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে।   এই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রবর্তনে ব্যাপক অগ্রগতি দেখিয়েছে। গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে, নতুন কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, বড় বড় কৃষি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।  ফলস্বরূপ ১৫ বছরে দেশে উদ্ভাবিত হয়েছে ৬৯৯টি বৈরী পরিবেশে সহনশীল জাত, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল এবং প্রায় ৭০৮টি প্রযুক্তি। এ ছাড়া যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়ন করার কাজ চলছে।  ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, সিডার, পাওয়ার টিলারসহ প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে কৃষকদের মাঝে। তিন হাজার কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলমান আছে।  সব মিলিয়ে দেশের কৃষিব্যবস্থা ‘জীবন নির্বাহী’ কৃষি থেকে ‘বাণিজ্যিক কৃষি’তে রূপান্তরিত হচ্ছে।  সর্বোপরি, বাংলাদেশের অভূতপূর্ব কৃষি উন্নয়ন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কৃষিখাতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবার ইশতেহারে কী প্রতিশ্রুতি ও টেকসই কৌশল অনুসরণের অঙ্গীকার করছে তা নিয়ে কৃষক সমাজ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আগ্রহ ছিল।  গত ২৭ ডিসেম্বর বুধবার, বাংলাদেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আগামী ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তার নির্বাচনী ইশতেহার উন্মোচন করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’। এবারের ইশতেহারে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদের অর্জন এবং আগামী মেয়াদে ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়নে তাদের কর্মকৌশল ও লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।  যখন বিশ্বব্যাপী খাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য, জ্বালানি সংকট, করোনা মহামারি দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের চলমান অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে এমন বেশিরভাগ প্রতিবন্ধকতার সমাধানকল্পে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।  ইশতেহারে মোট ১১টি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে আওয়ামী লীগ।  এই ১১টি অগ্রাধিকার বিষয়ের মধ্যে ৪র্থটি হলো কৃষিসংক্রান্ত, যার শিরোনাম- সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। সবার জন্য খাদ্য এই অঙ্গীকারকে সামনে রেখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ইশতেহারে কৃষির উন্নয়নে জোর দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।  ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের জন্য কৃষি উন্নয়ন  ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হবে কৃষি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টি চাহিদা পূরণ, সবার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্মত খাদ্য সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্যিক কৃষির বিকাশ, কৃষিনির্ভর শিল্পের প্রসার, গ্রামীণ ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, কৃষি ও অকৃষিজ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এই কৌশলের লক্ষ্য।  কৃষি, কৃষক-কৃষাণি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য প্রণীত প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন কৌশল অনুসরণের ধারা অব্যাহত থাকবে। বরাবরের মতো বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে এবারো।  কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গৃহীত কর্মসূচি আগামী দিনে আরও সম্প্রসারিত হবে বলে অঙ্গীকার বঙ্গবন্ধু কন্যার। কৃষিঋণ সহজলভ্য ও সহজগম্য করার লক্ষ্যে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে কৃষিঋণ দেওয়া অব্যাহত থাকবে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক ০.৫ শতাংশ হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে পুনঃঅর্থায়ন করবে।  ফলে কৃষিঋণ বিতরণে আরও উৎসাহিত হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।  এছাড়া কৃষির জন্য সহায়তা ও ভর্তুকি তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ সহায়তা অব্যাহত রাখবে আওয়ামী লীগ।  সেই সঙ্গে কৃষিতে শ্রমিক সংকট লাঘব এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সহজে ব্যবহারযোগ্য কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য করা হবে। ভর্তুকি দেওয়া অব্যাহত থাকবে কৃষি যন্ত্রপাতিতে।  আওয়ামী লীগ সরকার ইতোমধ্যেই কৃষি উৎপাদন আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব জমি আবাদের আওতায় আনার নীতি বাস্তবায়ন করছে। শেখ হাসিনার অঙ্গীকার, কোনো জমিই অনাবাদি থাকবে না। সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলায় গুরুত্বারোপ করা হবে। বাণিজ্যিক কৃষিকে উৎসাহিত করা হবে। শুধু তাই নয়, আধুনিক জ্ঞান নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জৈবপ্রযুক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ন্যানো-টেকনোলজিসহ গ্রামীণ অকৃষিজ খাতের উন্নয়ন ও বিশ্বায়ন মোকাবিলায় উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষি গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ অব্যাহত থাকবে।  সেইসঙ্গে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।  এ ছাড়া বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, রফতানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সর্বোপরি আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বও অপরিসীম।  ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ চাহিদা পূরণে উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান তৈরি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার লক্ষ্যে তাই মৎস্য ও গবাদি পশুখাতেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।   কৃষির উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগের বিশেষ অঙ্গীকার  ইতোমধ্যে অর্জিত সাফল্য ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে কৃষির উন্নয়নের জন্য নিম্নলিখিত ১৩টি অঙ্গীকার করা হয়েছে-  ১. ২০২৮ সালের মধ্যে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা দেড় গুণ বৃদ্ধি করা হবে।  ২. বাণিজ্যিক দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামার প্রতিষ্ঠা, আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নীতিগত সহায়তা দেয়া হবে।  ৩. গুণগত মানসম্পন্ন পশুখাদ্য উপকরণের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির প্রসার ও যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করা হবে।  ৪. উৎপাদিত প্রাণিজাত পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানিমুখী শিল্পের প্রসার করা হবে।  ৫. ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে বাণিজ্যিক খামার ম্যাকানাইজেশন ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।  ৬. সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারপূর্বক খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে টেকসই মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন ৪৯ লাখ ১৫ হাজার টন থেকে ৫৮ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে জনপ্রতি মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম/দিন থেকে বৃদ্ধি করে ৭৫ গ্রাম/দিনে উন্নীত করা হবে।  ৭. সুনীল অর্থনীতির বিকাশ সাধনে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ ও দায়িত্বশীল মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করা হবে।  ৮. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ডেল্টা হটস্পটভিত্তিক প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। ৯. ভ্যালু চেইন উন্নয়নের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, বৈচিত্র্যময় ভ্যালু অ্যাডেড মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মৎস্য অপচয় ১০ শতাংশ হ্রাস করা হবে এবং এ খাতে আগামী ৫ বছরে প্রায় ৬ লাখ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।  ১০. মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রফতানি বৃদ্ধিতে রফতানিমুখী মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করা হবে; দেশের বাইরে নতুন নতুন বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আমদানিকারক উদ্বুদ্ধকরণে ফিশ এক্সপো আয়োজন এবং মৎস্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রফতানি আয় ৪ হাজার ৭৯০ কোটি থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে।  ১১. প্রাণিসম্পদ-গবাদিপশুর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলমান কর্মসূচিকে বিস্তৃত করা হবে। এসব পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।  ১২. পুকুরে মাছ চাষ এবং যেখানে সম্ভব ধানক্ষেতে মাছ চাষের আরও প্রসারের জন্য উন্নত জাতের পোনা, খাবার, রোগব্যাধির চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হবে।   ১৩. খামারিদের জন্য সুলভে পুঁজি সংস্থান ও বিদ্যুৎ-সংযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া অব্যাহত রাখা হবে।  পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার পর খাদ্য নিরাপত্তা ও দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু দেশে সবুজ বিপ্লবের সূচনা করেন।  কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক চাষাবাদ ব্যবস্থা, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে ।  বঙ্গবন্ধু বিদেশ থেকে ট্রাক্টর, সেচ যন্ত্র এনে কৃষি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।  একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, কৃষিবিদদের দিয়েছিলেন প্রথম শ্রেণির মর্যাদা।  তাই কৃষি খাতের উন্নয়নে, বঙ্গবন্ধুর নীতি অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যুগোপযোগী লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করেছে।  আবারও দলটি ক্ষমতায় এলে, কৃষিতে এসব অঙ্গীকার ও পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তায় এবং গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করবে- এই বিশ্বাস কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের।   লেখক : পরিচালক, আইকিউএসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।  
ইশতেহারে কৃষি উন্নয়নে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার
নির্বাচনী ইশতেহার : দুর্নীতি ও টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’ স্লোগানে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা, গণতান্ত্রিক চর্চার প্রসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আর্থিকখাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনে রাষ্ট্রীয় লুটপাট, সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। এসময় রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে দুর্নীতি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ সকল সেক্টর বিএনপি-জামায়াতের দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।  তথ্যসূত্র বলছে, ২০০১-০৬ শাসনামলে বিএনপির অনেক প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে মেতে উঠেছিল। জনসেবার নামে নিজেদের পকেট ভরতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে তারা। দুর্নীতির কারণে সে সময় বাংলাদেশ পরপর ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ বদলে গেছে। আজকের বাংলাদেশ কোনোভাবেই দারিদ্র্যপীড়িত বা অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর নয়। আজকের বাংলাদেশ পরিবর্তিত বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন একটি দ্রুতগতির দেশ যা তার সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আর ছোটখাটো ব্যর্থতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করলেও আওয়ামীলীগ সরকার তা কাটিয়ে উঠতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণায় বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাহক আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।’ অতীতের ধারাবাহিকতায় এবার আওয়ামী লীগ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করেছে। ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিকতা দ্বাদশ নির্বাচনী ইশতেহারেও বজায় রাখা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে মূল্যস্ফীতি এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।  আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে আর ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়িত হলে শিগগিরই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে হয়। নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত বাজারমূল্য ও আয়ের মধ্যে সঙ্গতি প্রতিষ্ঠা করার কথাও বলা হয়েছে যা কার্যকর হলে আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়।  দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত আছে। পুঁজি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশাসনে দুর্নীতি নিরোধের লক্ষ্যে সকল ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে।  এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে দুর্নীতির কুফল এবং দুর্নীতি রোধে করণীয় বিষয়ে অধ্যায় সংযোজন করা হবে। এ লক্ষ্যে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ, উদ্যোগী, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলমান থাকবে।  দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ সর্বপ্রকার হয়রানির অবসান ঘটানোর কাজ চলমান থাকবে। এছাড়া দ্রব্যমূল্যেরে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে কাজ করে যাচ্ছে।  শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে দুর্নীতির কুফল ও দুর্নীতি রোধে করণীয় বিষয়ে অধ্যায় সংযোজন করা হবে।’ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৪-এ রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা আরও সুদৃঢ় করার কথা বলা হয়েছে। আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমন করা হবে। এক্ষেত্রে পুঁজি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতায় পাচার করা অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঋণ-কর-বিল খেলাপি এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তি প্রদান এবং তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।  খেলাপি ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া ব্যবস্থাপনা ও ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন যাতে বস্তুনিষ্ঠ হয়, সেজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রভাবমুক্ত রাখা হবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হতে যাচ্ছে দেশ। এই উত্তরণ যেমন একদিকে সম্মানের, অন্যদিকে বিশাল চ্যালেঞ্জেরও। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সক্ষমতা থাকতে হবে।  পরবর্তী সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়, মাতৃভূমির স্বাধীনতা থেকে শুরু করে এ দেশের যা কিছু মহৎ অর্জন, তা এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই।  বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে সেই আশা আমরা করতেই পারি।   লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
নির্বাচনী ইশতেহার : দুর্নীতি ও টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি
ভোট দেওয়া সামাজিক দায়িত্ব, সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বিশ্বে প্রথম ‘গণতন্ত্র’ সৃষ্টি হয় গ্রিসের ছোট একটি শহর-রাষ্ট্র এথেন্সে, যেখানে প্রতিটি মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে শহর-রাষ্ট্রের সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ হিসেবে গণ্য করা হয়, যাকে পরে ‘ডেমক্রেশিয়া’ বা ‘জনগণের শক্তি’ থেকে ‘ডেমোক্রেসি’ বা ‘জনগণের শাসন’ বা ‘গণতন্ত্র’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। ১৮৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন তার এক ভাষণে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘Government of the people, by the people, for the people’। সুতরাং, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। একজন নাগরিক হিসেবে সরকারের গৃহীত কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি গণতন্ত্র সুসংহত রাখতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যকে আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্ম ভূমি বলা হয়। যুক্তরাজ্য ও ভারতের শাসন ব্যবস্থার অনুরূপ বাংলাদেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। এ শাসন ব্যবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে শাসনকার্য পরিচালনা করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে একই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাই, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে সকল সচেতন ভোটারগণের উচিৎ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নাগরিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা। সঠিক ভোটাধিকার প্রয়োগ একটি জাতি বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত বাংলার জনগণ প্রথম ভোটাধিকারের সুযোগ পায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যখন এদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি (সংরক্ষিত ১৩টিসহ) আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি (সংরক্ষিত ১০টিসহ) আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের ষড়যন্ত্রের কারণে সে নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে সমগ্র পাকিস্তানকে শাসন করতে না পারলেও একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ উপহার দিয়েছিলেন। গণতন্ত্র তথা স্বাধীনতার জন্য জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্যই তা সম্ভব হয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করে সোনার বাংলা গড়তে নিরলসভাবে কাজ করছিলেন ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রে একদল পথভ্রষ্ট সেনা কর্মকর্তা জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে, স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ বিনা ভোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে উন্নয়নে বিভিন্ন চমক দেখানোর চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা না থাকায় তাদের শাসনকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একইভাবে, ১৯৯১ ও ২০০৭ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নামে বিভিন্ন মিথ্যা ধর্মীয় অপ্রচার চালিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া যথাক্রমে ১৯৯১-১৯৯৫ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করলেও পর্যাপ্ত রাজনৈতিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও উন্নয়ন দর্শন না থাকায় দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬, ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন থেকে হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’-কে পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত করে রূপকল্প-২০২১ (ডিজিটাল ও উন্নয়নশীল দেশ) বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ‘রুল মডেল’ এ পরিণত করেছেন। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় কেউ কেউ শেখ হাসিনা-কে ইরাকের সাদ্দাম হুসেন কিংবা লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফির সাথে তুলনা করে। কিন্তু আপনারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে, সাদ্দাম হুসেন এর শাসন আমলে ইরাকের জনগণ এবং কর্নেল গাদ্দাফির শাসন আমলে লিবিয়ার জনগণ বর্তমানের তুলনায় কতটা সুখী-সমৃদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো তথাকথিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে স্বৈরশাসকের তকমা দিয়ে ইরাকের সাদ্দাম হুসেন এবং লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশ দুটিকে নরকে পরিণত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে ইরাক-লিবিয়ার মতো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চাই। তাই, একজন সচেতন ভোটার হিসেবে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আপনি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনকে অর্থবহ করবেন নাকি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়িত করে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেবেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ২০ বছরে দেশের অবকাঠামোগত ও আর্থ-সামাজিক ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন অথবা উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, কক্সবাজারে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম হতে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ, যমুনা নদীর ওপর দিয়ে রেল সেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলে রেল লাইন সম্প্রসারণ, ঢাকায় মেট্রোরেল স্থাপন, বিমান বন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ, জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অসংখ্য স্কুল-কলেজ রাষ্ট্রীয়করণ, দেশব্যাপী অসংখ্য ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, সামাজিক সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান, গৃহহীনদের জমিসহ ঘর প্রদান, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপ-বৃত্তি প্রদান, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনি যদি উল্লেখিত উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল ভোগ করে থাকেন তাহলে আপনার নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব হবে সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন যার শ্লোগান হলো- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা, করপোপযোগী শিক্ষা ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা-যান্ত্রিকীকরণ-প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পের প্রসার, আর্থিকখাতে আরও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি করা, নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রসার, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িকতা-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ রোধ করা, সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানো। ইশতেহারে উল্লেখিত অগ্রাধিকার খাতগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সময়োপযোগী ও মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। তাহলে, আসুন, আমরা দেশের অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখতে এবং পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারীদের যোগ্য জবাব দিতে আগামী ৭ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পছন্দের প্রার্থীদেরকে ভোট দিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত ও উন্নয়নকে টেকসই করে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করি। প্রফেসর ড. এম. এম. মাহবুব আলম মৎস্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট
ভোট দেওয়া সামাজিক দায়িত্ব, সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে
ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ, টিকবেও আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম যেমন জড়িয়ে আছে ঠিক তেমনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নামও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ মিশে আছে বাংলাদেশের মাটির সাথে, মানুষের সাথে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন, আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২ ও ’৬৪ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ৬৬ এর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৬ দফাভিত্তিক ’৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়।  একই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” খ্যাত কালজয়ী ভাষণ । পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহবানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। আওয়ামী লীগ শব্দের উৎপত্তি আওয়াম ও লীগ দুটো প্রতিশব্দ থেকে। আওয়াম শব্দের অর্থ সাধারণ মানুষ বা জনগণ আর লীগ অর্থ সঙ্ঘ বা দল। দুটো শব্দ এক করলে হয় জনগণের দল। আর এই জনগণকে সাথে নিয়েই পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি নবীন দেশকে পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র সাড়ে তিন বছরেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। প্রথমভাগে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন এবং দ্বিতীয় ভাগে আর্থ সামাজিক উন্নয়নের দিকে নজর দেন বঙ্গবন্ধু। এরই মধ্যে বাংলায় সোনার ফসল ফলতে শুরু করে। আর ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। যে ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। এরপর দিন যায় বছর যায়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে, দেশে ফিরলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ঘাতকেরা মনে করেছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তা ভুল প্রমাণিত করে দলকে নতুন জীবন দান করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।   শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসেবে দেশে ফিরে কয়েকভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁর ধী-শক্তি, দৃঢ়তা, লক্ষ্য স্থিরে বিচক্ষণতা, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা আওয়ামী লীগকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে জনগণের সংগঠনের মৃত্যু নেই। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি মাইলফলক। নানা সংকটের পর, ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আবারও আসে জনগণের প্রিয় আওয়ামী লীগ। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনেও বিপুল ভোটে জয়ী হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি।  জনমানুষের দল আওয়ামী লীগের হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেমন স্বাধীনতা এসেছে, ঠিক তেমনি জনগণকে সাথে নিয়েই তার যোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিয়েই বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন। তার উদ্যোগের ফলেই অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। ২০০৮ থেকে আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদ ধরে ক্ষমতায়। এরই মধ্যে ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ অবস্থান করছে বাংলাদেশ। সব দেশি—বিদেশি ষড়যন্ত্র, চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে দেশের বৃহত্তম সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এই সেতুর ফলে বদলে যাচ্ছে পুরো দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পাশাপাশি এই সেতু দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।  সারাদেশে রাস্তাঘাটের উন্নয়নসহ অবকাঠামো নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে যারমধ্যে বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার আশপাশে নদ—নদী রক্ষা করে পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষায়ও চলছে নানাবিধ কর্মকাণ্ড। নিজেদের টাকায় পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ সহজ ছিল না। কিন্তু তা করে বিশ্বকে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, বাংলাদেশ পারে, বাংলাদেশের মানুষ পারে। এরইমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। আমরা আজ এক নতুন বাংলাদেশকে দেখতে পাচ্ছি, নতুন স্বপ্ন বুনতে পারছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ আর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েছেন। দিয়েছেন শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্লান। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আওয়ামী লীগের হাত ধরে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নত দেশের অভিমুখে ধাবমান।   আসন্ন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে তার মূল উপজীব্য বিষয় হলো 'স্মার্ট বাংলাদেশ'। যেটি অর্জনের সময়সীমা ২০৪১ সাল। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এবং এতে ‘উন্নয়ন দৃশ্যমান’ হয়েছে দাবি করে সামনে কর্মসংস্থান বাড়ানোর স্লোগান তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় যে ইশতেহার দেয়া হয়েছিলো তাতে শ্লোগান ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’, যাতে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়টিকে বিশেষ অঙ্গীকারের তালিকায় রাখা হয়েছিলো যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এবার বিশেষ অগ্রাধিকারের শুরুতেই রাখা হয়েছে দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা, রাখা হয়েছে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করার মতো বিষয়টি। যা জনগণের চাওয়া পাওয়ার অন্যতম প্রধান একটি উপজীব্য বিষয়।  জনগণের দল আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়েই তাদের চাহিদা পূরণকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ করতেই অঙ্গীকারাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইশতেহার প্রকাশকালে দেশের ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, “সরকার পরিচালনার বিশাল কর্মযজ্ঞে আমাদের কিছু ত্রুটি—বিচ্যুতি হওয়া স্বাভাবিক। আপনাদের রায় নিয়ে তা সংশোধন করে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাই”। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আওয়ামী লীগকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথরেখায় ইতিবাচক ধারায় আরও বলিষ্ঠ ও বেগবান করার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর। এটাই তো হচ্ছে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নেত্রীর সহজ সরল স্বীকারোক্তি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ যুগে বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে মানুষ আর বিভিন্ন গুজবেও কান দেয় না। তারা নিজকে বুঝতে শিখেছে। এদেশের মানুষ এখন আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, দুর্নীতিবাজ, জঙ্গিবাদের মদদদাতাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখতে চায় না। মানুষ আগুন সন্ত্রাসীদের ঘৃণা করে, তাদের ডাকা হরতাল অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচী এখন আর কেউ মানে না। যে কারণে সবাই অবাধেই ঘরেবাইরে চলাফেরা করছে। এভাবেই তাদের আন্দোলনের নামে ডাকা নৈরাজ্যের প্রতিবাদ করছে।   মানুষ জানে দেশের চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে তা থেমে যাবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না আসলে। জনগণ তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই, জাতির বৃহৎ স্বার্থে ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে আবারও ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। আর জনগণ তাদের ভালোবাসার দলকে সমর্থন করে যাবে আগামীর দিনগুলোতে। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীদের দেশবিরোধী সব অপচেষ্টার জবাব দেবে সরকারের পাশে থেকে। তার প্রতিফলনও আমরা দেখতে পাচ্ছি। জনগণকে সাথে নিয়েই ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ, জনগণের ভালোবাসায় টিকে থাকবে জনগণের দল। লেখক :  সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  
ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ, টিকবেও আওয়ামী লীগ
আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাত এবং আধুনিক পরিষেবা প্রদানে জনগণের আস্থা
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর যুদ্ধবিধস্ত দেশ পুনর্গঠনে হাত দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জাতীয়করণ করা হয় ব্যাংকিং খাত। স্টেট ব্যাংক অব ইস্ট পাকিস্তান রূপান্তরিত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়।  জাতীয়করণের মাধ্যমে ১২টি ব্যাংক একীভূত করে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, পূবালী ও উত্তরা- এ ছয়টি সরকারি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। এভাবে যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের ব্যাংকিং কার্যক্রমের। বর্তমানে দেশে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক, নয়টি বিদেশী ব্যাংক ও তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং ৩৪টি দেশী-বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ, বিগত দেড় দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এদেশে। এই উন্নয়নে অবদান রাখার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হল ব্যাংকিং খাত। দেশের জনগণ এবং ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক ও আর্থিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের যে আস্থা ও নির্ভরতা রয়েছে এটাই তার বড় প্রমাণ।  ব্যাংক সাধারণত আমানতকারীদের সম্পদ জমা রাখে এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করে এবং এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আস্থার সঙ্গে একটি দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে থাকে। তাই ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা থাকাটা দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি অটুট আস্থার একটি প্রাথমিক কারণ হল আর্থিক পরিষেবার সহজলভ্যতা।  অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক বা ব্যাংকিং সেবা প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সরকার মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, এটিএম, ডিজিটাল ওয়ালেট ইত্যাদি সেবা চালু করেছে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে স্বল্প বা বিনা খরচে আর্থিক তথা ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা।  এ সেবার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো কৃষকদের জন্য মাত্র ১০ টাকায়, তৈরি পোশাক শ্রমিক বা স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার বিধান। এই অন্তর্ভুক্তি লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীকে ক্ষমতায়ন করেছে, তাদের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত অর্থনৈতিক ওঠানামা এবং বৈশ্বিক আর্থিক সংকট সহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।  এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, সেক্টরটি উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। বিচক্ষণ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলির স্থিতিস্থাপকতা জনগণের মধ্যে আস্থা জাগিয়েছে, তাদের আশ্বস্ত করেছে যে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত।  ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির একীকরণ জনগণের আস্থাকে আরও দৃঢ় করেছে।  অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপস এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সলিউশনগুলি ব্যাংকিং পরিষেবাগুলিকে আরও সুবিধাজনক এবং দক্ষ করে তুলেছে। সর্বোচ্চ দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে  বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।  আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম অটোমেশনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিগত দশ বছরে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এবং প্রকল্পের সবচেয়ে বড় খাত অটোমেশন এর আওতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।  ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণ পেপারলেস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনলাইন ব্যাংকিং, বাংলাদেশ অটোমেটেড চেক প্রসেসিং সিস্টেম (BACPS), বাংলাদেশ ইলেক্ট্রনিক ফান্ডস্ ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (BEFTN),  RTGS (Real Time Gross Settlement), ই-কমার্স ও এম-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, অনলাইন পেমেন্ট, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং সেবা, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ, বাংলাদেশ (এনপিএসিবি) ও ইলেকট্রনিক ড্যাশবোর্ড চালুকরণ। স্বচ্ছতা এবং নৈতিক আচরণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ  বিষয়।  নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কঠোর প্রবিধান এবং তদারকি নিশ্চিত করে যে ব্যাংকগুলি সততার সাথে কাজ করে।  নৈতিক অনুশীলনের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।   তারা সিস্টেমের ন্যায্যতায় বিশ্বাস করে, যা তাদের বিনিয়োগ করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যে বিষয় গুলো উল্লেখযোগ্য তা হলো- ১. ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তিনির্ভর করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রূপান্তর করা;  ২. ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা;  ৩. যোগ্য ও পেশাদার ব্যাংকারদের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া  এবং ৪. খেলাপি ঋণের সন্তোষজনক সুরাহা করা। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ চারটি বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে দেশের মানুষের আস্থা ধরে রেখেছেন। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শুধু মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান নয়;  তারা সক্রিয়ভাবে সম্প্রদায়ের সাথে জড়িত এবং সামাজিক কারণগুলিতে অবদান রাখে।  বিভিন্ন কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্যোগের মাধ্যমে, ব্যাংকগুলি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশগত টেকসই প্রকল্পগুলিকে সমর্থন করে।   সম্প্রদায়ের উন্নয়নে এই সম্পৃক্ততা ব্যাংকিং সেক্টরের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে, আর্থিক লেনদেনের বাইরে তাদের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে। এছাড়াও আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করে থাকে। এখানে ব্যাংক বন্ধের ব্যাপারে সরকার সব সময়ই একটি সামাজিক চাপে থাকে। কোনো ব্যাংক বন্ধের উপক্রম হলে দেশের সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিধায় সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে সরকারকে এগিয়ে এসে সেই ব্যাংককে রক্ষা করতে হয়। এ কারণে শুধু আমাদের দেশেই নয়, উন্নয়নশীল অনেক দেশেই ব্যাংক সহসা বন্ধ হতে দেখা যায় না।  সরকারের এই সামাজিক একই সাথে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার কারণেও আমাদের দেশের ব্যাংক বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই এবং এই একই কারণে ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত না পাওয়ার কোনো শঙ্কাও থাকা ঠিক নয়।  ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিছক আর্থিক স্থিতিশীলতার ফলে নয়;  এটি অ্যাক্সেসযোগ্য পরিষেবা, উদ্ভাবনী সমাধান, নৈতিক অনুশীলন এবং সক্রিয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার চূড়ান্ত পরিণতি। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ যেখানে ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে এবং জনগণের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে চলেছে।  বর্তমান সরকারের নানাবিধ প্রচেষ্টা ব্যাংকিং খাতকে বিকশিত করতে সহযোগিতা  করছে, এবং  ব্যাংকিং স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রয়াসে ব্যাংকিং খাতের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।   মো. হাসানুর রহমান (হাসান)  প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি  জামালপুর সদর, বাংলাদেশ  
আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাত এবং আধুনিক পরিষেবা প্রদানে জনগণের আস্থা