ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ

আব্দুর রহিম

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
লেখক আব্দুর রহিম। সৌজন্য ছবি

একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই। কোনো এলাকায় মামলা, হয়রানি কিংবা গণগ্রেফতারের খবরও নেই। একটি বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি যখন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ পায়, তখন সেটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও জড়িয়ে থাকে।

বিগত আমলে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে যে ভয়, আতঙ্ক, মামলা-হামলা, হয়রানি ও দমন-পীড়নের চিত্র আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট। তখন রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই অনেকের কাছে ছিল আতঙ্কের বিষয়। বিরোধী মত প্রকাশ করলে কী হবে, মিছিল করলে মামলা হবে কি না, রাজনৈতিক সভায় গেলে হয়রানির শিকার হতে হবে কি না! এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।

সেই বাস্তবতার বিপরীতে আজ যদি একটি রাজনৈতিক দল বড় পরিসরে কর্মসূচি পালন করতে পারে, হাজার হাজার মানুষ রাজপথে অংশ নিতে পারে, বিরোধী মত প্রকাশ করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের রাজনৈতিক অধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবেই দেখতে হবে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। গণতন্ত্র মানে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার এবং রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব হলো সেই অধিকারকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা।

এই জায়গা থেকেই ১১ দলের লং মার্চকে দেখা যেতে পারে। এটি নিছক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে, তারও একটি পরীক্ষার জায়গা। একটি কর্মসূচি কত বড়, কত মানুষ সেখানে অংশ নিলেন কিংবা কতটা রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হলো। এসবের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, কর্মসূচিটি কীভাবে পরিচালিত হলো এবং রাষ্ট্র সেটিকে কীভাবে মোকাবিলা করল।

এটাই বহুদলীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক বিএনপির রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠে থাকার সুযোগ দেওয়া এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। ফ্যাসিজমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি নতুন, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের সম্ভাবনার জায়গাটিও এখানেই।

তবে কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা কোনো একটি সরকারের ভালো উদ্যোগ দিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা।

এই রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানানো যায়। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের কর্মসূচি পালন করার সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক মত প্রকাশের জায়গাটি সংকুচিত না করে বরং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়।

একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য বিরোধী দলও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক শক্তি শুধু রাজপথে কত মানুষ নামাতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে না; তারা কতটা দায়িত্বশীলভাবে সেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানেই শেষ নয়। গণতন্ত্র কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। সরকারের দায়িত্ব বিরোধী মত ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে কর্মসূচি পালন করা। আর আমাদের সবার দায়িত্ব উসকানি, গুজব, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা।

মতভিন্নতা থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সহিংসতার দিকে না যায়। একইভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগকে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জনদুর্ভোগ কিংবা সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে না পারে সেদিকেও রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্ক থাকতে হবে।

কারণ গণতন্ত্রের অধিকার যেমন আছে, তেমনি সেই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বও আছে।

একটি লং মার্চে মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে, রাস্তা ব্যস্ত হবে, সাধারণ মানুষের কিছুটা ভোগান্তিও হতে পারে। কিন্তু সেই ভোগান্তি যেন সহিংসতায় পরিণত না হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা যেন হুমকির মুখে না পড়ে এ দায়িত্বও রাজনৈতিক দলগুলোর।

একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্র যেন অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে, অকারণে মামলা না দেয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি না করে কিংবা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে দমন করার চেষ্টা না করে এটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু বিরোধী দলেরও নয় এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।

আজ আমরা যে রাজনৈতিক সহনশীলতার চর্চা দেখতে চাই, তা আগামী দিনেও ধরে রাখতে হলে প্রত্যেক পক্ষকেই নিজের দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

উসকানিদাতাদের রুখে দেওয়া, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া কোনো পক্ষের প্রতি অনুগ্রহ নয়; এগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে গুজব ও উসকানি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, একটি সম্পাদিত ভিডিও কিংবা একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই রাজনৈতিক দল, নেতাকর্মী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মতের বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তথ্যের ক্ষেত্রে সততা এবং আচরণের ক্ষেত্রে সংযম থাকা জরুরি।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার বদলাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়; বিরোধী দল কথা বলবে নির্ভয়ে; জনগণ তাদের মত প্রকাশ করবে স্বাধীনভাবে; সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে পারবেন; রাজনৈতিক কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারবেন এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই সহিংসতা, মামলা, হয়রানি কিংবা নিপীড়নের কারণ হবে না।

একটি নতুন বাংলাদেশ শুধু নতুন সরকারের মাধ্যমে তৈরি হবে না। নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা, দমন-পীড়নের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দম্ভের বদলে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই পরিবর্তনই হতে পারে সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।

১১ দলের লং মার্চ সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পরীক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে। এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট দলগুলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা হবে।
গণতন্ত্র কোনো দলের একার সম্পদ নয়। এটি জনগণের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষা করা সরকার, বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত থাকুক। রাজনৈতিক সহনশীলতা আরও শক্তিশালী হোক। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ুক। উসকানি ও সহিংসতার রাজনীতি পরাজিত হোক। সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠুক আমাদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বাংলাদেশ।

লেখক: আব্দুর রহিম, স্টাফ রিপোর্টার, আরটিভি

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
আদালতের একটি তারিখ মানে অনেকের জীবনে আরেকটি অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কখনো জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার, কখনো পাওনা টাকা আদায়ের, কখনো অপরাধের বিচার পাওয়ার, আবার কখনো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আদালতের নথিতে এসব কেবল মামলা নম্বর ও পক্ষের নাম কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবনের একটি করে গল্প। বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যখন ৪৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন এটিকে শুধু বিচার বিভাগের ওপর জমে থাকা কাজের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সব স্তরের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা অধস্তন আদালতেই। এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপা যায় না। মামলা বাড়ার পেছনে যেমন নতুন বিরোধের সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্য ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, মুলতবি এবং আপিলের মতো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘মামলা এত বেশি কেন’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগে কেন এবং সেই অপেক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেন? ৩১ মার্চ ২০২৬-এর হিসাবটি দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৮৮ শতাংশই অধস্তন আদালতে। অধস্তন আদালতের এই চাপের মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। এখানে বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ নিয়োগসহ আদালতের সহায়ক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলার জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে বিচারকের পাশাপাশি যুক্ত থাকে আদালতের প্রশাসন, সমন জারি, সাক্ষীর উপস্থিতি, তদন্ত, নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। এসব জায়গার কোনো একটিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর। তাই মামলার জটকে শুধু বিচারকের স্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে। বিচারের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব সংবিধানও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্বকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও নির্দিষ্ট মামলার বিচার শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার গ্রহণের পর ১৮০ দিনের মধ্যে এবং সেশনস জজ, অতিরিক্ত সেশনস জজ বা সহকারী সেশনস জজের আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে জামিনের সুযোগের কথাও একই ধারায় বলা হয়েছে। তবে আইনে সময়সীমা নির্ধারিত থাকা আর বাস্তবে প্রতিটি মামলা সেই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃতি, সাক্ষী, আসামির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে তাই আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার গুরুত্বও বাড়ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত বিরোধ যেন সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে না হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এসেছে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০২৫ সনের ৩৫ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ ২১খ, ২১গ, ২১ঘ ও ২১ঙ ধারা সংযোজন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১২টি জেলায় চালুর পর ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা আরও জেলায় সম্প্রসারিত হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে। মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হলে কিছু বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, সহজলভ্য ও কার্যকর হয় তার ওপর। বিশেষ করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন মধ্যস্থতার নামে আপস করতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সংকুচিত করা নয়; বরং উপযুক্ত ক্ষেত্রে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা। প্রযুক্তিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমন জারি, মামলার নথি ব্যবস্থাপনা, মামলার তারিখ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো এবং আদালতের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই মামলার জট কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যবস্থাপনা। কোন মামলা কত পুরোনো, কোন মামলায় কতবার সময় নেওয়া হয়েছে, কোন মামলায় সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, কোন মামলায় রায় অপেক্ষমাণ, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাও প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ১০ জুলাই ২০২৫ প্রধান বিচারপতি ২০০০ সালের আগে দায়ের করা ১০ হাজার ৩৮৫টি পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মামলার জট কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই, ন্যায্য শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারকে সময়োপযোগী করতে হবে। অন্যদিকে বছরের পর বছর একটি মামলাকে ঝুলিয়ে রাখাও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারব্যবস্থার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ তাই দ্রুততা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। মামলা কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মামলার সংখ্যা কমানো নিজে কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কোনো নাগরিকের বৈধ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় মামলা, অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো; আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করা নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কার্যকর আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা বিচারপ্রাপ্তির সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা তাই শুধু আদালতের ভেতরের একটি সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। নতুন বিচারক ও আদালত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ আদালত প্রশাসন, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রসার। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্কারের ফলও পরিমাপ করতে হবে। কত মামলা কমল, কত সময় সাশ্রয় হলো, বিচারপ্রার্থীর খরচ কতটা কমল এবং কত দ্রুত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো সংস্কারের সাফল্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আদালতের নথিতে একটি মামলা একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে সেটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ কখন হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব মূল্য কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যেতে পারবেন এবং অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই আইনসম্মত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ৪৬ লাখ মামলার পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নটিই সামনে এনে দেয়, আদালতের দরজা খোলা আছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে আর কতটা পথ পাড়ি দেবেন? লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি শিক্ষানবিশ আইনজীবী।  আরটিভি/এসকে
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও ভারসাম্যের প্রতিফলন। 
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের একই মঞ্চে ভাষণ দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
আরও পড়ুন
জামায়াতকে ইসলামাবাদ অভিমুখে 'লং মার্চ' স্থগিতের অনুরোধ শেহবাজের
বাধাহীন লংমার্চ, রাজনীতিতে সহনশীলতার বার্তা
ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ শুরু
লং মার্চে পুলিশের সহযোগিতা চায় জামায়াত, আইজিপির সঙ্গে বসছে ১১ দল