
একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই। কোনো এলাকায় মামলা, হয়রানি কিংবা গণগ্রেফতারের খবরও নেই। একটি বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি যখন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ পায়, তখন সেটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও জড়িয়ে থাকে।
বিগত আমলে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে যে ভয়, আতঙ্ক, মামলা-হামলা, হয়রানি ও দমন-পীড়নের চিত্র আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট। তখন রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই অনেকের কাছে ছিল আতঙ্কের বিষয়। বিরোধী মত প্রকাশ করলে কী হবে, মিছিল করলে মামলা হবে কি না, রাজনৈতিক সভায় গেলে হয়রানির শিকার হতে হবে কি না! এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।
সেই বাস্তবতার বিপরীতে আজ যদি একটি রাজনৈতিক দল বড় পরিসরে কর্মসূচি পালন করতে পারে, হাজার হাজার মানুষ রাজপথে অংশ নিতে পারে, বিরোধী মত প্রকাশ করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের রাজনৈতিক অধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবেই দেখতে হবে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। গণতন্ত্র মানে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার এবং রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব হলো সেই অধিকারকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা।
এই জায়গা থেকেই ১১ দলের লং মার্চকে দেখা যেতে পারে। এটি নিছক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে, তারও একটি পরীক্ষার জায়গা। একটি কর্মসূচি কত বড়, কত মানুষ সেখানে অংশ নিলেন কিংবা কতটা রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হলো। এসবের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, কর্মসূচিটি কীভাবে পরিচালিত হলো এবং রাষ্ট্র সেটিকে কীভাবে মোকাবিলা করল।
এটাই বহুদলীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক বিএনপির রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠে থাকার সুযোগ দেওয়া এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। ফ্যাসিজমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি নতুন, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের সম্ভাবনার জায়গাটিও এখানেই।
তবে কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা কোনো একটি সরকারের ভালো উদ্যোগ দিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা।
এই রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানানো যায়। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের কর্মসূচি পালন করার সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক মত প্রকাশের জায়গাটি সংকুচিত না করে বরং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়।
একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য বিরোধী দলও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক শক্তি শুধু রাজপথে কত মানুষ নামাতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে না; তারা কতটা দায়িত্বশীলভাবে সেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানেই শেষ নয়। গণতন্ত্র কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। সরকারের দায়িত্ব বিরোধী মত ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে কর্মসূচি পালন করা। আর আমাদের সবার দায়িত্ব উসকানি, গুজব, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা।
মতভিন্নতা থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সহিংসতার দিকে না যায়। একইভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগকে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জনদুর্ভোগ কিংবা সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে না পারে সেদিকেও রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্ক থাকতে হবে।
কারণ গণতন্ত্রের অধিকার যেমন আছে, তেমনি সেই অধিকারের সঙ্গে দায়িত্বও আছে।
একটি লং মার্চে মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে, রাস্তা ব্যস্ত হবে, সাধারণ মানুষের কিছুটা ভোগান্তিও হতে পারে। কিন্তু সেই ভোগান্তি যেন সহিংসতায় পরিণত না হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা যেন হুমকির মুখে না পড়ে এ দায়িত্বও রাজনৈতিক দলগুলোর।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্র যেন অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে, অকারণে মামলা না দেয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি না করে কিংবা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে দমন করার চেষ্টা না করে এটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু বিরোধী দলেরও নয় এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।
আজ আমরা যে রাজনৈতিক সহনশীলতার চর্চা দেখতে চাই, তা আগামী দিনেও ধরে রাখতে হলে প্রত্যেক পক্ষকেই নিজের দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
উসকানিদাতাদের রুখে দেওয়া, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া কোনো পক্ষের প্রতি অনুগ্রহ নয়; এগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে গুজব ও উসকানি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, একটি সম্পাদিত ভিডিও কিংবা একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই রাজনৈতিক দল, নেতাকর্মী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মতের বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তথ্যের ক্ষেত্রে সততা এবং আচরণের ক্ষেত্রে সংযম থাকা জরুরি।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার বদলাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়; বিরোধী দল কথা বলবে নির্ভয়ে; জনগণ তাদের মত প্রকাশ করবে স্বাধীনভাবে; সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে পারবেন; রাজনৈতিক কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারবেন এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই সহিংসতা, মামলা, হয়রানি কিংবা নিপীড়নের কারণ হবে না।
একটি নতুন বাংলাদেশ শুধু নতুন সরকারের মাধ্যমে তৈরি হবে না। নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা, দমন-পীড়নের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দম্ভের বদলে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই পরিবর্তনই হতে পারে সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।
১১ দলের লং মার্চ সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পরীক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে। এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট দলগুলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা হবে।
গণতন্ত্র কোনো দলের একার সম্পদ নয়। এটি জনগণের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষা করা সরকার, বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত থাকুক। রাজনৈতিক সহনশীলতা আরও শক্তিশালী হোক। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ুক। উসকানি ও সহিংসতার রাজনীতি পরাজিত হোক। সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠুক আমাদের কাঙ্ক্ষিত নতুন বাংলাদেশ।
লেখক: আব্দুর রহিম, স্টাফ রিপোর্টার, আরটিভি
আরটিভি/ এসকেডি


