
মহালয়া আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে বারবার ফিরে আসা এক সন্ধিক্ষণের নাম। যেখানে একটি সময় নিঃশেষ হওয়ার দিকে যায়, অথচ তার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে না। আর একটি অনাগত সময় অন্ধকারের অন্তরাল থেকে নিজের অস্তিত্বের আভাস দিতে থাকে। পেছনে থাকে বিস্মৃতির দীর্ঘ করিডর, সামনে থাকে অনিশ্চিত আলোর রেখা। মানুষ এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, এক পা মৃত সময়ের ওপর, অন্য পা এখনো জন্ম নেয়নি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে।
মানুষের জীবনকে যদি দূর থেকে দেখা যায়, তবে সেখানে আগমনের চেয়ে বিদায়ের সংখ্যাই বেশি। শৈশব বিদায় নেয়, যৌবন তার পরিত্যক্ত ঋতু রেখে চলে যায়, প্রিয় মুখগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতর নির্বাসিত হয়। একসময় যে ঘরকে পৃথিবীর কেন্দ্র মনে হয়েছিল, সেটিই অপরিচিত হয়ে ওঠে। যে কণ্ঠ একদিন প্রতিদিনের শব্দ ছিল, একদিন তার জন্য নীরবতার প্রয়োজন হয়। মানুষ তখন বুঝতে শেখে, হারিয়ে যাওয়া জিনিসের কোনো পূর্ণ অনুপস্থিতি নেই। তারা দৃশ্য থেকে সরে গিয়ে অস্তিত্বের অন্য কোনো গভীরে আশ্রয় নেয়।
এই কারণেই মহালয়ার ভোরে পূর্বপুরুষের স্মরণ কেবল একটি আচার হয়ে থাকে না। মানুষ মৃতদের স্মরণ করতে গিয়ে নিজেরই উৎসের দিকে ফিরে তাকায়। জন্মের পূর্বে যে দীর্ঘ অদৃশ্য পরম্পরা তাকে বহন করে এনেছে, তার কাছে সে নিজের অস্তিত্বের ঋণ আবিষ্কার করে। একটি মানুষ কখনও একক মানুষ নয়। তার শরীরে সময়ের বহু পুরোনো পদচিহ্ন, তার ভাষায় অদৃশ্য মানুষের উচ্চারণ, তার অভ্যাসে বিস্মৃত প্রজন্মের ছায়া। সে চলে যায়, কিন্তু তার ভেতর দিয়ে আরও বহু জীবন অতিক্রম করে।

অথচ মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায়। মৃত্যু সম্পর্কে জেনেও সে প্রতিদিন এমনভাবে জীবন সাজায়, যেন স্থায়িত্ব তার জন্মগত অধিকার। ঘর বানায়, সম্পদ জমায়, নাম রেখে যেতে চায়, নিজের চারপাশে পরিচয়ের এত স্তর নির্মাণ করে যে একসময় সেই স্তরগুলোকেই নিজের অস্তিত্ব বলে ভুল করে। মহালয়ার মতো একটি মুহূর্ত এসে সেই ভ্রমের ওপর নীরব আলো ফেলে। মনে করিয়ে দেয়, অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো তার ক্ষণস্থায়িত্ব। মানুষ থাকার জন্য জন্মায় না, চলে যাওয়ার মধ্য দিয়েই তার থাকার অর্থ তৈরি হয়।
তবু মহালয়া কেবল ক্ষয়ের দর্শন নয়। অন্ধকারের পরেই আলো আসে, এই সরল কথার মধ্যেও গভীর এক অস্তিত্ববোধ লুকিয়ে আছে। কারণ আলো অন্ধকারকে মুছে দেয় না, তাকে অতিক্রম করে। মানুষের জীবনেও তেমন। দুঃখ মুছে গিয়ে সুখ আসে না, বরং দুঃখের মধ্য দিয়েই সুখের অর্থ বদলে যায়। যে মানুষ হারিয়েছে, সে অপেক্ষার প্রকৃতি জানে। যে একবার ভেঙেছে, সে পুনর্গঠনের শব্দ শুনতে পায়। যে বিদায়ের সামনে দাঁড়িয়েছে, তার কাছেই আগমনের অর্থ আর কেবল আনন্দের থাকে না।
তাই দেবীপক্ষের আগমনকে কেবল কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির আগমন হিসেবে দেখলে মহালয়ার গভীরতর অর্থটি হয়তো অধরা থেকে যায়। দেবীর প্রতীকী আগমন মানুষের নিজের ভেতরের জাগরণও হতে পারে। যে শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তা বাইরে কোথাও অপেক্ষা করে নেই। মানুষের বিবেক, সাহস ও প্রতিরোধের মধ্যেই তার সম্ভাব্য আবাস। অশুভের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় কোনো অন্ধকার গুহা নয়, মানুষের নিজের আত্মসমর্পণ। আর শুভের প্রথম উচ্চারণ কোনো বিজয়ধ্বনি নয়, অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়ানোর ক্ষীণ অথচ অনমনীয় সিদ্ধান্ত।
মহালয়ার ভোর তাই কেবল একটি উৎসবের পূর্বভোর নয়। এটি মানুষের নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার একটি বিরল অবকাশ। চারদিকে যখন আগমনের প্রস্তুতি, তখন মানুষ একবার নিজের অন্তর্গত ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকাতে পারে। কত পুরোনো ভয় এখনও তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কত অপ্রকাশিত অনুশোচনা তার ভেতরে পাথরের মতো পড়ে আছে, কত সম্পর্ক কেবল অভ্যাসের কারণে বেঁচে আছে, কত স্বপ্ন নিজের হাতেই নির্বাসিত হয়েছে। জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার হয়তো আলোহীনতা নয়, নিজের অন্ধকারকে দেখতে না চাওয়া।
সময়ের কাছে মানুষ শেষ পর্যন্ত একজন পথিক। তার হাতে কিছু স্মৃতি থাকে, কিছু অসমাপ্তি থাকে, কিছু নাম থাকে যাদের আর ডাকার উপায় নেই। তবু পথ থামে না। একটি দরজা বন্ধ হয়, অন্য কোনো দরজার ওপারে অদৃশ্য ভোর জমতে থাকে। এই চলার মধ্যেই জীবনের রহস্য। মানুষ জানে না কোথায় তার শেষ অবতরণ, তবু প্রতিটি সকাল তাকে আবার শুরু করার ভ্রম দেয়। সম্ভবত সেই ভ্রমই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্য।
মহালয়া সেই সত্যের কাছে এসে দাঁড়ায় এক নীরব সন্ধিক্ষণ হয়ে। এখানে মৃত্যু আছে, কিন্তু নিঃশেষ নেই। বিদায় আছে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা নেই। অন্ধকার আছে, কিন্তু আলোকে অস্বীকার করার মতো চূড়ান্ত অন্ধকার নেই। মানুষ তার অতীতের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের দিকে হাঁটে। পেছনে যারা নেই, তারা তার সঙ্গে থাকে স্মৃতির অদৃশ্য ভার হয়ে। সামনে যারা এখনও আসেনি, তারা থাকে সম্ভাবনার অদৃশ্য আলো হয়ে।
ভোর শেষ পর্যন্ত আসে। কিন্তু মহালয়ার আসল ভোর আকাশে নয়, মানুষের বোধে জন্ম নেয়। যে মুহূর্তে মানুষ বুঝতে পারে, তার জীবন কোনো স্থির আশ্রয় নয়, বরং ক্রমাগত বিদায় ও আগমনের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত এক দীর্ঘ সেতু, সেই মুহূর্তেই অন্ধকারের অর্থ বদলে যায়। তখন আলো আর বাইরে থেকে আসা কোনো ঘটনা থাকে না। আলো হয়ে ওঠে নিজের ভেতর অন্ধকারকে চিনে ফেলার ক্ষমতা।
লেখকঃ নির্ঝর জয়, শিক্ষক, গীতিকার ও সাহিত্যসমালোচক
আরটিভি/ এসকেডি




