
প্রতিটি শীতের আগমনী বার্তা কিংবা শুষ্ক মৌসুমের আবহাওয়া মনে এক অদৃশ্য উৎকণ্ঠা তৈরি করে। নগরের আকাশ যখন আকস্মিক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কালো হয়ে ওঠে কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাইরেনের শব্দ বুক কাঁপিয়ে তোলে, তখন সামনে ভেসে ওঠে নির্মম বাস্তবতা– আগুন।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে যখন প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দেখি, তখন কেবল ছাই কিংবা ধ্বংসস্তূপই চোখে পড়ে না; পেছনে থাকে প্রিয়জন হারানোর অন্তহীন কান্না, তিলে তিলে গড়া স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনা এবং দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি। প্রশ্ন জাগে– আমরা কি শুধু আগুন নেভানোর জন্যই প্রতিনিয়ত প্রস্তুত থাকব? নাকি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত আগুন যেন কোনোভাবে লাগতে না পারে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর? আধুনিক নগর পরিকল্পনা আমাদের শেখায়, বিপর্যয় ঘটার পর সামাল দেওয়ার চেয়ে বিপর্যয় রোধ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সন্দেহ নেই, তারা জাতির নীরব বীর। কিন্তু যখন বহুতল ভবন বা ঘনবসতিপূর্ণ মার্কেটে আগুন লাগে, তখন ফায়ার ফাইটারদের শতচেষ্টার পরও বহু মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের সমাজে ‘অগ্নিনিরাপত্তা’ মানেই যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পাইপ, পানি আর হুটার বাজিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা কেবল জরুরি সেবা বিভাগ বা কিছু সরঞ্জামের নাম নয়; একটি সমন্বিত সংস্কৃতি। উন্নত বিশ্ব যেমন জাপান, সিঙ্গাপুর বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা যতটা না আগুন নেভানোর, তার চেয়ে ঢের বেশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করা; ভবনের নকশা পরীক্ষা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো।
আমাদের দেশেও সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। ফায়ার সার্ভিসকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল সংস্থা হিসেবে না দেখে প্রতিরোধমূলক কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের অনুধাবন করতে হবে– অগ্নিকাণ্ড রোধের প্রথম এবং প্রধান প্রহরী ফায়ার ফাইটার নন, বরং ভবনটির মালিক, নকশাকার, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা নিজে।
আমাদের নগরগুলোর কাঠামোগত বিন্যাসে কিছু ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরান ঢাকার কথা ধরা যাক; সেখানে শতবর্ষী ভবনগুলোর গায়ে গায়ে লাগানো দোকানপাট, বৈদ্যুতিক তারের জটলা এবং গুদামঘরের আধিক্য যে কোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এবং অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোতে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমাদের বহুতল ভবনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ ও পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন, অতিরিক্ত লোড বহনকারী তার এবং সাব-স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রায়ই আগুনের উৎস তৈরি করে। পাশাপাশি রয়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার এবং এর সঠিক সিলিন্ডারিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতা। এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করতে হলে কোনো একক সংস্থার প্রচেষ্টা নয়, প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত ও সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে মডেলগুলো অনুসরণ করে, তার মূল স্তম্ভগুলো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি ভবন নির্মাণের আগে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অগ্নিপ্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ইমারতের ভেতরে ধোঁয়া নির্গমনের পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি এবং ফায়ার ডোর স্থাপন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিহার্য অংশ। আমাদের দেশে নকশা পাসের সময় এ বিষয়গুলো কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবায়নে অবহেলা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
সক্রিয় ব্যবস্থা বলতে বোঝায় স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম, ফায়ার অ্যালার্ম এবং হাইড্র্যান্ট পয়েন্ট। আর নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা হলো ভবনের অবকাঠামোগত নকশা, যা আগুন ও ধোঁয়া ছড়াতে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক মানে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে এ দুটি ব্যবস্থার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। ফায়ার সার্ভিস এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সর্বদা প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু মালিকপক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা।
আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে– সে বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ বেশি কার্যকরী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমল এবং করপোরেট অফিসগুলোতে প্রতিবছর দুই থেকে তিনবার ফায়ার ড্রিল বা মহড়া পরিচালনা করা উচিত। কর্মীদের মধ্যে কার কী দায়িত্ব– কে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবেন; কে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন এবং কে নিরাপদে লোকজনকে বের করে আনবেন; তা সুনির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক।
ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আইনের কড়াকড়ি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে সচেতনতা অনেক বেশি টেকসই ফল দেয়। যখন গৃহিণী রান্না শেষে গ্যাসের চুলা এবং রেগুলেটর সঠিকভাবে বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন; যখন দোকানদার তাঁর দোকানের বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করান; যখন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মেয়াদ পরীক্ষা করেন– তখন বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না।
সমাজে অগ্নিদুর্ঘটনার পর আমরা কয়েক দিন তোলপাড় করি; তদন্ত কমিটি গঠিত হয়; কিছু সুপারিশমালা তৈরি হয়। কিছুদিন পর সবকিছু সেই আগের মতো। এই প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে একটি প্রস্তুতিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সাবধানতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র ও প্যানেল আলোচনা প্রচার করা যেতে পারে। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করবে। শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে তারা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক স্মোক ডিটেক্টর, ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং দ্রুততম সময়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্মার্ট কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেক উন্নত দেশে ধোঁয়া শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফায়ার সার্ভিসে সংকেত চলে যায়। আমাদের দেশকেও এই প্রযুক্তির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি শপিংমল, বহুতল আবাসিক ভবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একটি নিরাপত্তা ও ফায়ার সেফটি কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে প্রতি মাসে অন্তত একবার ভবনের বৈদ্যুতিক তার, গ্যাস সংযোগ এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা।
সুন্দর, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। দেশের নাগরিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বাসস্থানে বসবাস করবে– এটিই সবার কাম্য। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ডাকার প্রয়োজনই যেন না পড়ে। আগুনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি আমরা সচেতন ও সতর্ক আচরণ করি। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। কিন্তু সচেতনতা বহু অমূল্য প্রাণ ও স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ
মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর
আরটিভি/এসআর


