ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন

ড. মারুফ মল্লিক

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১৭ এএম
মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই এই নবীন দেশে চেপে বসে একদলীয় বাকশালি শাসনের অভিশাপ। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মৃত্যুর মুখে পতিত হয় হাজারো মানুষ। সঙ্গে ছিল রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস ও নির্মম নির্যাতন।

সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষ দুঃশাসন ও দুর্ভিক্ষে দিশেহারা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনীতি। রাজনীতির এই ক্রান্তিকালে দেশের অস্তিত্ব পড়ে হুমকির মুখে। চারদিকে হতাশা, ভয়, আতংক; তখনই ১৯৭৫ সালের নানা ঘটনার পরিক্রমায় সামনে চলে আসে ৭ নভেম্বর।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব বিশাল। নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মাপকাঠিতে ৭ নভেম্বরকে বিবেচনা করা যাবে না। দেশের রাজনীতিতে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশ আজকে যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তা ৭ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল বলেই সম্ভব হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সারাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ওই দিনই বাংলাদেশ তার নিজের চলার পথ খোঁজে নেয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটে ৭ নভেম্বর।

৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ঘটনা প্রবাহের মূল চরিত্র তিনজন। সামরিক কর্মকর্তা ক্ষণস্থায়ী সেনা প্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। কিন্তু ৭ নভেম্বর এসে সিপাহী ও জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানই মূল নায়ক। ষড়যন্ত্রের দায় নিয়ে ছিটকে গেলেন খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের কবলে জাতি যখন নানা ধারার বিভাজিত তখনই জাতি গঠনে ঐক্যের ডাক নিয়ে রাজনীতির মঞ্চে হাজির হন জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান আগে থেকে প্রবলভাবে জনপ্রিয় ছিলেন জনসাধারণের মাঝে। খালেদ মোশাররফ ও আবু তাহের টিকতে পারেননি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে। ওই সময় দেশের মানুষের চাহিদার সঙ্গে তারা তাল মিলাতে পারেননি।

স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে জিয়াউর রহমানের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। বিপরীতে মানুষ দেখেছে আওয়ামী লীগ ও জাসদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। একদিকে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করেছিল। আর বিপরীতে জাসদ জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি শুরু করেছিল।

ওই সময়ের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, জাসদের এককভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার ক্ষমতা ছিল না। ফলে জাসদ বা কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানের ওপর ভর করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু ঘটনা প্রবাহের শেষ অঙ্কে জিয়াউর রহমানকে সামনে নিয়ে আসে সিপাহী-জনতা। এক পর্যায়ে সব কিছুই জিয়াউর রহমানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জিয়াউর রহমানের গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহের আর টিকতে পারেননি। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে জাসদের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।

এরপরই জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ শুরু করনে। প্রথমেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেন। বাকশালের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত উদার বাজার ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যান। অর্থনীতির দুয়ার তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ করে দেন। কিন্তু একইসঙ্গে রাষ্ট্রের নজরদারিও বজায় রইল।

জিয়াউর রহমানের আমলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নতুনভাবে কাজ শুরু করার সুযোগ পায়। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দেশে বিপুল পরিমানে উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ প্রবেশ করে। এই অর্থ দেশে বিনিয়োগের ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে থাকে এনজিওগুলোতে। ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশ জিয়াউর রহমানের আমলেই ঘটেছিল।

এসব নানা ধরনের কর্মসূচির পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জিয়াউর রহমান বিদেশি বিনিয়োগ বিশেষ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জিয়াউর রহমান রাজনীতিকেও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। জিয়াউর রহমানের আমলেই বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নিজ নামে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়।

একইসঙ্গে অন্যান্য দলের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতি ফেরা শুরু করে। জিয়াউর রহমান যুদ্ধত্তোরকালে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দেশের কল্যাণে সবাইকে নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন।

দেশের রাজনীতির ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক ঐক্যের প্রতীক। আর সেই ঐক্যের মহানায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান যখন রাজনীতির মঞ্চে আসেন তখন সারাবিশ্বেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। দেশে-দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হচ্ছে। সামারিক শাসকরা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ক্ষমতা দখল করছেন।

ব্রাজিলে এক দশকের সামরিক শাসন চলছে। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দেকে হটিয়ে পিনোশে ক্ষমতা দখল করেছেন। আর্জেন্টিাতেও হোর্হে ভিদালের সামরিক শাসন শুরু হয়েছে। ওদিকে আফ্রিকায় লিবিয়া, মিসর কঠোর সামরিক শাসকদের হাতে পরিচালিত হচ্ছে। আরবেও সামরিক শাসনের ঘনঘটা। সিরিয়া ও ইরাকে লৌহমানবরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।

এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী থেকে শাসন ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান নিজেকে আলাদা করে নিলেন। অস্থিরতা দমন করে, পরিস্থিতি সামলে নিয়ে দ্রুতই দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে গেলেন। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমনের মুখে হতবিহ্বল জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছেন। সেই সাহসের ওপর ভর করেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর দেশের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

ফলে দেখাই যাচ্ছে, স্বাধীন ও স্বনির্ভর দেশ গঠনের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ৭ নভেম্বর বিপ্লবের হাত ধরে। ১৯৭১ সালের পর সারা দেশের মানুষ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ৭ নভেম্বর।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি ছিলো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে এই তারিখটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে উজ্জ্বল ও ভাস্মর হয়ে আছে।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত একটি দিন। গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা এবং সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে সেদিন দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা জাতির জীবনে যে পটপরিবর্তন ঘটিয়েছিল- তা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শৃঙ্খলা সুরক্ষায় এক যুগান্তকারি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেদিন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সিপাহী-জনতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল। 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার মিলিত এক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ওই মহান বিপ্লবে আধিপত্যবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। সুসংহত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ফলে ৭ নভেম্বরের দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
প্রতিটি শীতের আগমনী বার্তা কিংবা শুষ্ক মৌসুমের আবহাওয়া মনে এক অদৃশ্য উৎকণ্ঠা তৈরি করে। নগরের আকাশ যখন আকস্মিক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কালো হয়ে ওঠে কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাইরেনের শব্দ বুক কাঁপিয়ে তোলে, তখন সামনে ভেসে ওঠে নির্মম বাস্তবতা– আগুন।  ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে যখন প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দেখি, তখন কেবল ছাই কিংবা ধ্বংসস্তূপই চোখে পড়ে না; পেছনে থাকে প্রিয়জন হারানোর অন্তহীন কান্না, তিলে তিলে গড়া স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনা এবং দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি। প্রশ্ন জাগে– আমরা কি শুধু আগুন নেভানোর জন্যই প্রতিনিয়ত প্রস্তুত থাকব? নাকি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত আগুন যেন কোনোভাবে লাগতে না পারে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর? আধুনিক নগর পরিকল্পনা আমাদের শেখায়, বিপর্যয় ঘটার পর সামাল দেওয়ার চেয়ে বিপর্যয় রোধ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সন্দেহ নেই, তারা জাতির নীরব বীর। কিন্তু যখন বহুতল ভবন বা ঘনবসতিপূর্ণ মার্কেটে আগুন লাগে, তখন ফায়ার ফাইটারদের শতচেষ্টার পরও বহু মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।  আমাদের সমাজে ‘অগ্নিনিরাপত্তা’ মানেই যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পাইপ, পানি আর হুটার বাজিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা কেবল জরুরি সেবা বিভাগ বা কিছু সরঞ্জামের নাম নয়; একটি সমন্বিত সংস্কৃতি। উন্নত বিশ্ব যেমন জাপান, সিঙ্গাপুর বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা যতটা না আগুন নেভানোর, তার চেয়ে ঢের বেশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করা; ভবনের নকশা পরীক্ষা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো। আমাদের দেশেও সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। ফায়ার সার্ভিসকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল সংস্থা হিসেবে না দেখে প্রতিরোধমূলক কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের অনুধাবন করতে হবে– অগ্নিকাণ্ড রোধের প্রথম এবং প্রধান প্রহরী ফায়ার ফাইটার নন, বরং ভবনটির মালিক, নকশাকার, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা নিজে। আমাদের নগরগুলোর কাঠামোগত বিন্যাসে কিছু ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরান ঢাকার কথা ধরা যাক; সেখানে শতবর্ষী ভবনগুলোর গায়ে গায়ে লাগানো দোকানপাট, বৈদ্যুতিক তারের জটলা এবং গুদামঘরের আধিক্য যে কোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এবং অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোতে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমাদের বহুতল ভবনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ ও পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন, অতিরিক্ত লোড বহনকারী তার এবং সাব-স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রায়ই আগুনের উৎস তৈরি করে। পাশাপাশি রয়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার এবং এর সঠিক সিলিন্ডারিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতা। এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করতে হলে কোনো একক সংস্থার প্রচেষ্টা নয়, প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত ও সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে মডেলগুলো অনুসরণ করে, তার মূল স্তম্ভগুলো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি ভবন নির্মাণের আগে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অগ্নিপ্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ইমারতের ভেতরে ধোঁয়া নির্গমনের পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি এবং ফায়ার ডোর স্থাপন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিহার্য অংশ। আমাদের দেশে নকশা পাসের সময় এ বিষয়গুলো কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবায়নে অবহেলা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।  সক্রিয় ব্যবস্থা বলতে বোঝায় স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম, ফায়ার অ্যালার্ম এবং হাইড্র্যান্ট পয়েন্ট। আর নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা হলো ভবনের অবকাঠামোগত নকশা, যা আগুন ও ধোঁয়া ছড়াতে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক মানে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে এ দুটি ব্যবস্থার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। ফায়ার সার্ভিস এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সর্বদা প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু মালিকপক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা।  আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে– সে বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ বেশি কার্যকরী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমল এবং করপোরেট অফিসগুলোতে প্রতিবছর দুই থেকে তিনবার ফায়ার ড্রিল বা মহড়া পরিচালনা করা উচিত। কর্মীদের মধ্যে কার কী দায়িত্ব– কে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবেন; কে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন এবং কে নিরাপদে লোকজনকে বের করে আনবেন; তা সুনির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আইনের কড়াকড়ি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে সচেতনতা অনেক বেশি টেকসই ফল দেয়। যখন গৃহিণী রান্না শেষে গ্যাসের চুলা এবং রেগুলেটর সঠিকভাবে বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন; যখন দোকানদার তাঁর দোকানের বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করান; যখন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মেয়াদ পরীক্ষা করেন– তখন বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না।  সমাজে অগ্নিদুর্ঘটনার পর আমরা কয়েক দিন তোলপাড় করি; তদন্ত কমিটি গঠিত হয়; কিছু সুপারিশমালা তৈরি হয়। কিছুদিন পর সবকিছু সেই আগের মতো। এই প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে একটি প্রস্তুতিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।  সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সাবধানতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র ও প্যানেল আলোচনা প্রচার করা যেতে পারে। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করবে। শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে তারা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক স্মোক ডিটেক্টর, ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং দ্রুততম সময়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্মার্ট কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেক উন্নত দেশে ধোঁয়া শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফায়ার সার্ভিসে সংকেত চলে যায়। আমাদের দেশকেও এই প্রযুক্তির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি শপিংমল, বহুতল আবাসিক ভবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একটি নিরাপত্তা ও ফায়ার সেফটি কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে প্রতি মাসে অন্তত একবার ভবনের বৈদ্যুতিক তার, গ্যাস সংযোগ এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা।  সুন্দর, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। দেশের নাগরিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বাসস্থানে বসবাস করবে– এটিই সবার কাম্য। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ডাকার প্রয়োজনই যেন না পড়ে। আগুনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি আমরা সচেতন ও সতর্ক আচরণ করি। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। কিন্তু সচেতনতা বহু অমূল্য প্রাণ ও স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারে।  লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর আরটিভি/এসআর  
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—মানবিক অধিকার কি শুধু নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য, নাকি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
আরও পড়ুন
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী
আজ ৭ ব্যান্ডের সাত ঘণ্টার কনসার্ট, কখন ও কোথায়
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য