ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত একটি দিন। গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা এবং সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে সেদিন দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা জাতির জীবনে যে পটপরিবর্তন ঘটিয়েছিল- তা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শৃঙ্খলা সুরক্ষায় এক যুগান্তকারি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেদিন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সিপাহী-জনতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।

জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সুরক্ষার অনন্য প্রতীক ‘ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস।’ সেই দিন সিপাহী জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে দেশপ্রেমের যে বিরল নজির স্থাপিত হয়েছিল, তা আজও প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ইতিহাসের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশ আজ স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় সামিল হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি উন্নত এবং কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। ৭ই নভেম্বর আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি দিন যা আমাদের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল।

৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ সামরিক অভ্যুত্থান মাত্র ছিল না। এর তাৎপর্য ছিল অনেক গভীরে লুকায়িত। ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার সম্মিলনে যে অভুতপূর্ব অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল বিক্ষুব্ধ সাধারণ সিপাহী এবং বঞ্চিত জনতার অভুতপূর্ব সম্মিলনের কাহিনী। সেদিনের ঢাকা অভিমুখে সিপাহী-জনতার সেই ঐতিহাসিক মিছিল শুধু ক্ষমতার পালা বদলের লড়াই ছিল না, সেটি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা,স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য গণপ্রতিরোধ।

দিনটি এখনও আমাদের মনে করিয়ে দেয়- জাতীয় সংকটকালে ঐক্যই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি। সংকটমুহূর্তে জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে তাহলে যে কোনো অপশক্তির তৎপরতা রুখে দেওয়া সম্ভব। শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেও ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি রাজনৈতিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা হরণ করেন। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল গঠন করেন। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র রেখে অবশিষ্ট সংবাদপত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতা চিরস্থায়ীভাবে কুক্ষিগত করার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।

অপশাসনের কারণে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। পরবতীতে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সেই সময় দেশে খাদ্যাভাব খুব একটা প্রকট ছিল না। কিন্তু বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে খাদ্য সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছাতে পারেনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বপরিবারের নিহত হলে দেশ চরম অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হয়। অভ্যুত্থানকারীগণ আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার মোস্তাক আহমদকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব প্রদান করেন। কিন্তু দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশঙ্খলা দেখা দেয়। সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

এমন এক অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দী করা হয়।

খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

সেই সময় ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশ কার্যত কোন সরকার ছিল না। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে খোন্দকার মোস্তাক আহমদকে সরিয়ে দিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সাধারণ সেনা সদস্যরা খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থন করেনি। তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ৬ নভেম্বর গভীর রাতে অর্থাৎ ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে সাধারণ সিপাহীরা বিদ্র্রোহ ঘোষণা করে। ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, সিপাহীর ওপরে অফিসার নাই’ এমন শ্লোগানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট উত্তপ্ত করে তোলা হয়।

এই সময় সিপাহীরা বন্দীদশা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনেন। সৈনিকদের মাঝে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। সাধারণ সৈনিকরা মনে করেছিল, জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের নায়ক খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমূল হুদা এবং লে: কর্নেল এ টি এম হায়দার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেই তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

৭ নভেম্বরের পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসে জেনারেল জিয়াউর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে ‘চেইন অফ কমান্ড’ ফিরিয়ে আনেন। ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রাধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন সরাসরি জনগণের ভোটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের ওপর সিপাহী-জনতার আস্থা ছিল, কারণ তিনি ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। তার ব্যক্তিগত সততা ছিল প্রবাদপ্রতীম। এসব কারণে তিনি ছিলেন সিপাহী-জনতার আস্থার প্রতীক। তিনি সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।

৭ নভেম্বরের সফল সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিশ্চিত হয়। জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে জাতি হিসেবে আমাদের যে পরিচয় সংকট ছিল তা দূর হয়। স্বাধীনতার পর সমস্ত উৎপাদনযন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ফলে এক সময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়।

৭ নভেম্বরের পর সময়ের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গৃহীত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল যুগের চেয়েও অগ্রগামী, বাস্তবসম্মত এবং অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ। এ সময় মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেই প্রথম বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। তার একটি অনন্য কীর্তি হচ্ছে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) স্থাপন করা। বাংলাদেশের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ইপিজেডের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিত দেশগুলোকে নিয়ে একটি কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান সার্ক গঠনের জন্য প্রাথমিক যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর কারণে সেই উদ্যোগ কিছুটা থমকে যায়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার ৭ দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মেলনে সার্ক গঠন করা হয়। কিন্তু একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র শর্ত দেয় যে, সার্কে কোনো দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। এই শর্ত মেনে নেওয়ার কারণে সার্ক গঠনের মূল উদ্দেশ্যই বিঘ্নিত হয়েছে।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় মৌলনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতার স্থলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস যুক্ত করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সংবিধানে যুক্ত করা হয়। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিশ্বে মাত্র কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় শাসনভার হাতে পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন অন্যতম।

জিয়াউর রহমান একমুখী পররাষ্ট্র নীতি থেকে সরে এসে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা হয়। জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। বর্তমানে জনশক্তি রপ্তানি খাত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত।

জিয়াউর রহমানের সময়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান মুসলিম দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধে বন্ধে মধ্যস্থকতাকারীর ভূমিকা পালন করে প্রশংসিত হন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর দেশের রাজনীতিকে শহর থেকে গ্রামমুখী করা হয়। খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ আদালত গঠনের মাধ্যমে উন্নযন কর্মকাণ্ডে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একের পর এক গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন পদব্রজে। তিনি কৃষক-শ্রমিকের সঙ্গে মিশেছেন একান্ত আপনজনের মতো। তিনি বলেছিলেন, শহরের বিলাসবহুল ভবনে বসে গ্রামের মানুষের কল্যাণ চিন্তার দিন শেষ। গ্রামের মানুষের কল্যাণ চিন্তা করতে হলে গ্রামে যেতে হবে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করে তাদের দুঃখ-কষ্ট জানতে হবে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে. তার চেতনা আমাদের বারবার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের কোনো বিকল্প নেই। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ অগস্টের অভ্যুত্থানের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এখনও বাংলাদেশকে নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের চলছে।

আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। তাই সর্বাবস্থায় দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যই আগামী দিনের প্রত্যাশা। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর এমিরিটাস, ঢাবি: ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি ছিলো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে এই তারিখটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে উজ্জ্বল ও ভাস্মর হয়ে আছে।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন
নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই এই নবীন দেশে চেপে বসে একদলীয় বাকশালি শাসনের অভিশাপ। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মৃত্যুর মুখে পতিত হয় হাজারো মানুষ। সঙ্গে ছিল রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস ও নির্মম নির্যাতন।
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার মিলিত এক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ওই মহান বিপ্লবে আধিপত্যবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। সুসংহত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ফলে ৭ নভেম্বরের দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
প্রতিটি শীতের আগমনী বার্তা কিংবা শুষ্ক মৌসুমের আবহাওয়া মনে এক অদৃশ্য উৎকণ্ঠা তৈরি করে। নগরের আকাশ যখন আকস্মিক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কালো হয়ে ওঠে কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাইরেনের শব্দ বুক কাঁপিয়ে তোলে, তখন সামনে ভেসে ওঠে নির্মম বাস্তবতা– আগুন।  ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে যখন প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দেখি, তখন কেবল ছাই কিংবা ধ্বংসস্তূপই চোখে পড়ে না; পেছনে থাকে প্রিয়জন হারানোর অন্তহীন কান্না, তিলে তিলে গড়া স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনা এবং দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি। প্রশ্ন জাগে– আমরা কি শুধু আগুন নেভানোর জন্যই প্রতিনিয়ত প্রস্তুত থাকব? নাকি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত আগুন যেন কোনোভাবে লাগতে না পারে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর? আধুনিক নগর পরিকল্পনা আমাদের শেখায়, বিপর্যয় ঘটার পর সামাল দেওয়ার চেয়ে বিপর্যয় রোধ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সন্দেহ নেই, তারা জাতির নীরব বীর। কিন্তু যখন বহুতল ভবন বা ঘনবসতিপূর্ণ মার্কেটে আগুন লাগে, তখন ফায়ার ফাইটারদের শতচেষ্টার পরও বহু মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।  আমাদের সমাজে ‘অগ্নিনিরাপত্তা’ মানেই যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পাইপ, পানি আর হুটার বাজিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা কেবল জরুরি সেবা বিভাগ বা কিছু সরঞ্জামের নাম নয়; একটি সমন্বিত সংস্কৃতি। উন্নত বিশ্ব যেমন জাপান, সিঙ্গাপুর বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা যতটা না আগুন নেভানোর, তার চেয়ে ঢের বেশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করা; ভবনের নকশা পরীক্ষা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো। আমাদের দেশেও সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। ফায়ার সার্ভিসকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল সংস্থা হিসেবে না দেখে প্রতিরোধমূলক কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের অনুধাবন করতে হবে– অগ্নিকাণ্ড রোধের প্রথম এবং প্রধান প্রহরী ফায়ার ফাইটার নন, বরং ভবনটির মালিক, নকশাকার, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা নিজে। আমাদের নগরগুলোর কাঠামোগত বিন্যাসে কিছু ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরান ঢাকার কথা ধরা যাক; সেখানে শতবর্ষী ভবনগুলোর গায়ে গায়ে লাগানো দোকানপাট, বৈদ্যুতিক তারের জটলা এবং গুদামঘরের আধিক্য যে কোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এবং অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোতে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমাদের বহুতল ভবনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ ও পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন, অতিরিক্ত লোড বহনকারী তার এবং সাব-স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রায়ই আগুনের উৎস তৈরি করে। পাশাপাশি রয়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার এবং এর সঠিক সিলিন্ডারিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতা। এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করতে হলে কোনো একক সংস্থার প্রচেষ্টা নয়, প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত ও সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে মডেলগুলো অনুসরণ করে, তার মূল স্তম্ভগুলো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি ভবন নির্মাণের আগে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অগ্নিপ্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ইমারতের ভেতরে ধোঁয়া নির্গমনের পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি এবং ফায়ার ডোর স্থাপন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিহার্য অংশ। আমাদের দেশে নকশা পাসের সময় এ বিষয়গুলো কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবায়নে অবহেলা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।  সক্রিয় ব্যবস্থা বলতে বোঝায় স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম, ফায়ার অ্যালার্ম এবং হাইড্র্যান্ট পয়েন্ট। আর নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা হলো ভবনের অবকাঠামোগত নকশা, যা আগুন ও ধোঁয়া ছড়াতে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক মানে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে এ দুটি ব্যবস্থার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। ফায়ার সার্ভিস এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সর্বদা প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু মালিকপক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা।  আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে– সে বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ বেশি কার্যকরী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমল এবং করপোরেট অফিসগুলোতে প্রতিবছর দুই থেকে তিনবার ফায়ার ড্রিল বা মহড়া পরিচালনা করা উচিত। কর্মীদের মধ্যে কার কী দায়িত্ব– কে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবেন; কে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন এবং কে নিরাপদে লোকজনকে বের করে আনবেন; তা সুনির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আইনের কড়াকড়ি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে সচেতনতা অনেক বেশি টেকসই ফল দেয়। যখন গৃহিণী রান্না শেষে গ্যাসের চুলা এবং রেগুলেটর সঠিকভাবে বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন; যখন দোকানদার তাঁর দোকানের বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করান; যখন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মেয়াদ পরীক্ষা করেন– তখন বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না।  সমাজে অগ্নিদুর্ঘটনার পর আমরা কয়েক দিন তোলপাড় করি; তদন্ত কমিটি গঠিত হয়; কিছু সুপারিশমালা তৈরি হয়। কিছুদিন পর সবকিছু সেই আগের মতো। এই প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে একটি প্রস্তুতিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।  সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সাবধানতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র ও প্যানেল আলোচনা প্রচার করা যেতে পারে। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করবে। শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে তারা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক স্মোক ডিটেক্টর, ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং দ্রুততম সময়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্মার্ট কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেক উন্নত দেশে ধোঁয়া শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফায়ার সার্ভিসে সংকেত চলে যায়। আমাদের দেশকেও এই প্রযুক্তির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি শপিংমল, বহুতল আবাসিক ভবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একটি নিরাপত্তা ও ফায়ার সেফটি কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে প্রতি মাসে অন্তত একবার ভবনের বৈদ্যুতিক তার, গ্যাস সংযোগ এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা।  সুন্দর, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। দেশের নাগরিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বাসস্থানে বসবাস করবে– এটিই সবার কাম্য। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ডাকার প্রয়োজনই যেন না পড়ে। আগুনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি আমরা সচেতন ও সতর্ক আচরণ করি। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। কিন্তু সচেতনতা বহু অমূল্য প্রাণ ও স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারে।  লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর আরটিভি/এসআর  
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—মানবিক অধিকার কি শুধু নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য, নাকি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
আরও পড়ুন
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী
আজ ৭ ব্যান্ডের সাত ঘণ্টার কনসার্ট, কখন ও কোথায়
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন