
আধুনিক জীবনের অবিরাম মানসিক চাপ মানুষের প্রজনন ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের শরীর এমন এক ভিন্ন ধরনের জীবনের জন্য বিবর্তিত হয়েছিল, যা আজকের পৃথিবীর নিরন্তর চাপ সামলাতে অক্ষম। ফলে এই পরিস্থিতি প্রজনন স্বাস্থ্য, উর্বরতার হার এবং এমনকি শুক্রাণুর গুণমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। খবর এনডিটিভির।
জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী কলিন শ এবং লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল লংম্যান কর্তৃক বায়োলজিক্যাল রিভিউজ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই গুরুতর বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তি এবং পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন মানব বিবর্তনের ধীর প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করে যাওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্রাচীনকালে মানুষ হঠাৎ আসা চাপের পরিস্থিতিতে (যেমন শিকারিদের মোকাবিলা) দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারত এবং সেই বিপদ কেটে গেলে শরীর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেত। এই ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া তখন আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকতে সাহায্য করত।
কিন্তু আজকের দিনের স্ট্রেস—যেমন ট্র্যাফিক, ডেডলাইন, শব্দের দূষণ, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এমনকি সাধারণ চাপগুলোও সেই একই স্নায়ুতন্ত্রীয় প্রক্রিয়া সক্রিয় করে।
গবেষক লংম্যান বলেন, কেউ কঠিন আলোচনার মুখোমুখি হোক বা ট্র্যাফিকের ভিড়ে আটকে থাকুক, শরীর ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন হওয়ার মতোই আচরণ করে। স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানালেও, এই আধুনিক জীবনে শরীরকে শান্ত হওয়ার জন্য আর পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না।
গবেষক শ এবং লংম্যান যুক্তি দেন যে, আমাদের জৈবিক সক্ষমতা এবং আধুনিক জীবনের মধ্যে তৈরি হওয়া এই ব্যবধান আমাদের বিবর্তনীয় ফিটনেস—অর্থাৎ টিকে থাকার এবং বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। এর লক্ষণ হিসেবে তারা বিশ্বব্যাপী হ্রাস পাওয়া উর্বরতার হার, ক্রমাগত প্রদাহ এবং শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছেন।
গবেষকরা দেখেছেন, স্বল্পমেয়াদি জরুরি অবস্থার জন্য ডিজাইন করা স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া আধুনিক জীবনের কারণে এখন প্রায় সবসময় সক্রিয় থাকে। এই অতিরিক্ত চাপ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, স্মৃতিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং হরমোনের মাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
গবেষকরা আরও জানান, ১৯৫০-এর দশক থেকে শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সঙ্গে দূষণকারী পদার্থ যেমন মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং কীটনাশকের একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে কিছু গবেষণায় জানা গেছে।
গবেষণাটি মূলত মানব সমাজকে এই বিষয়ে সতর্ক করছে যে, জীবনযাত্রার এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে জৈবিক চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানবজাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরটিভি/এআর




