যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ইরানে সামরিক হামলা স্থগিত রাখলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামেনি, বরং নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ইরান। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন আরও বহুমুখী ও জটিলাকার রূপ নিয়েছে।
টানা ১৩ রাত হামলার পর গত শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানে নতুন করে কোনো সামরিক অভিযান চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর থাকলেও হামলা আপাতত বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে একই দিন ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনায় নতুন করে কোনো পাল্টা হামলা চালানো থেকে বিরত ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প সব সময়ই কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে কী ধরনের ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানকে সেটাই স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্ত্রের পর্যাপ্ততার হিসাব, উপসাগরীয় মিত্রদের উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আপাতত হামলা না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হোয়াইট হাউস।
সিএনএনের প্রতিবেদনেও বলা হয়, মার্কিন অস্ত্রের মজুত সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আসার পরেই সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ আসে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক স্থিতিশীলতা ফেরার স্বস্তির মধ্যেই শনিবার ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দেয়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, বিশ্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লোহিত সাগরের বাব আল–মানদেবও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আবার জোরালো হতে পারে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তারা সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবু অঞ্চলের প্রধান প্রধান স্থাপনায় হামলা চালিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাইকৃত ভিডিওতে জিজানের একটি তেল শোধনাগারের দিক থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরামকো কোনো মন্তব্য করেনি। সৌদি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইয়ানবুর দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে থাকা অবস্থাতেই প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়ানবুতে তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি বাহিনী। লোহিত সাগরতীরের এ বন্দর হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির সৌদি–সমর্থিত সরকারের বিমানবাহিনী মারিব ও আল–জাওফ প্রদেশে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দুই পক্ষই রণাঙ্গনে সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে।
ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমে গেলেও চলতি মাসে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে হুতিরাও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে।
গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। গোষ্ঠীটির নেতা আবদুল মালিক আল–হুতি সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই এখন হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
অন্যদিকে শনিবার ইরান অভিযোগ করেছে, কাস্পিয়ান সাগরে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার খবরে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এ হামলাকে ‘বৈরী ও অপরাধমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইরানের জাহাজে হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। তিনি দাবি করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারির জন্য সংগ্রহ করা স্যাটেলাইট তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করছে, যাতে অঞ্চলটিতে তেহরানের হামলা চালাতে সুবিধা হয়।
আরটিভি/এআর



