
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কঠোর করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার ছয়-তিন ভোটে দেওয়া এই রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আপাতত কার্যকর না রাখার পথ খুলে গেছে।
মামলাটি ২৩টি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য ও রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি বিরোধকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপের আবেদন করেছিল। আদালত বলেছে, অঙ্গরাজ্যগুলো খুব আগেভাগেই মামলা করেছে। তবে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের আওতায় সরকার যেসব পদক্ষেপ নেবে, সেগুলো আইনসম্মত কি না—তা এই রায়ে নির্ধারণ করা হয়নি।
আদালতের লিখিত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, নির্বাহী আদেশটি নিজে অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতির কারণ হয়নি। ফলে নিম্ন আদালতের সরকারের পদক্ষেপ আটকে দেওয়ার এখতিয়ার ছিল না।
এই রায়ের ফলে মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তর ভোট দেওয়ার যোগ্য বাসিন্দাদের তালিকা তৈরির একটি প্রস্তাব নিয়ে এগোতে পারবে। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ডাকযোগে পাঠানো ভোটপত্রের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নিয়ম চালুর পথও খুলেছে।
হোয়াইট হাউস এই রায়কে মার্কিন নির্বাচনের নিরাপত্তার জন্য বড় জয় হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, নতুন ব্যবস্থাগুলো ডাকযোগে পাঠানো ভোটপত্রের নিরাপত্তা বাড়াবে এবং শুধু মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের তিন উদারপন্থী বিচারপতি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র লিখেছেন, এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো সাংবিধানিক কি না, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করছে না; শুধু বিষয়টির বিচার কিছুটা পিছিয়ে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে কী আছে
ট্রাম্প গত মার্চে একটি নির্বাহী আদেশে ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগ নেন। এতে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নাগরিকত্বের তালিকা তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ব্যবহারের কথা বলা হয়।
এ ছাড়া ডাক বিভাগকে ভোটারদের যোগ্যতার তালিকার সঙ্গে ডাকযোগে পাঠানো ভোটপত্রের তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভোটপত্রের খাম কেমন হবে, তার নকশা নিয়েও নতুন কিছু শর্ত রাখা হয়েছে।
নির্বাহী আদেশে ভোট দেওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন ডাক বিভাগ নির্বাহী আদেশের কয়েকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নতুন নিয়ম প্রকাশ করেছে। এর আওতায় অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভোটপত্র পাওয়ার কথা যেসব ভোটারের, তাদের নাম ও ঠিকানাসহ নির্দিষ্ট তথ্য একটি অনলাইন ব্যবস্থায় জমা দিতে হবে।
তবে ডাক বিভাগ জানিয়েছে, ভোটার কে যোগ্য তা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা পরিচালনা বা ভোট গণনায় তারা কোনো ভূমিকা পালন করবে না।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আপত্তি
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের পর ২৩টি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি আদালতে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের এমন ক্ষমতা নেই।
একটি নিম্ন আদালতও তাদের পক্ষে রায় দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টে সতর্ক করে বলেন, নতুন ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা হলে ডাকযোগে ভোট দেওয়া লাখো ভোটারের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং অনেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তাদের দাবি, নির্বাচনের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ, নতুন নিয়মে প্রশিক্ষণ এবং ভোটারদের সচেতন করার কাজে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের সিদ্ধান্ত অঙ্গরাজ্যগুলোকে ভবিষ্যতে প্রশাসনের চূড়ান্তভাবে চালু করা নীতির বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করার সুযোগ বন্ধ করেনি।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আগামী নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। ইতোমধ্যে কিছু অঙ্গরাজ্যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডাকযোগে ভোটপত্র পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ডাকযোগে ভোটের সমালোচনা করে আসছেন। তিনি দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অযোগ্য বা অ-মার্কিন নাগরিক ভোট দিচ্ছেন। তবে এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অ-মার্কিন নাগরিকদের নির্বাচনে ভোট দেওয়া অবৈধ এবং এ ধরনের ভোট দেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ট্রাম্প প্রশাসন ততই ডাকযোগে ভোট কমানো এবং ভোটার নিবন্ধনে নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগ জোরদার করছে। একই সময়ে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়েও আদালতে আইনি বাধার মুখে পড়েছে প্রশাসন।
সূত্র: সিবিএস
আরটিভি/জেএমএ


