
সোনা—হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে যার আকর্ষণ একটুও কমেনি। দাম বাড়লেও এর প্রতি মানুষের আগ্রহ থেকে যায়। কখনো অলংকার, কখনো সম্পদ, আবার কখনো ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে সোনা জায়গা করে নিয়েছে মানুষের জীবন ও সভ্যতার ইতিহাসে।
সোনার প্রতি মানুষের এই আকর্ষণের পেছনে রয়েছে এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পাথর, কাঠ বা লোহার মতো এতে সহজে মরিচা ধরে না। দীর্ঘদিন এর উজ্জ্বলতা বজায় থাকে। আবার অল্প পরিমাণ সোনা দিয়েও সুন্দর ও জটিল অলংকার তৈরি করা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোনার বিরলতা, সৌন্দর্য, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মূল্য।
সোনার প্রথম ব্যবহার কবে?
সোনা কে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন, তার নির্দিষ্ট উত্তর ইতিহাসে নেই। কারণ প্রকৃতিতে অনেক সময় সোনা সরাসরি ধাতব অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে অন্য অনেক ধাতুর মতো আকরিক থেকে জটিল প্রক্রিয়ায় এটি আলাদা করার প্রয়োজন সবসময় হয় না।
প্রাচীন মানুষের সোনা ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি পাওয়া গেছে বর্তমান বুলগেরিয়ার ভার্না এলাকায়। সেখানে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০০ থেকে ৪২০০ সালের সময়কার সমাধি থেকে তিন হাজারের বেশি সোনার বস্তু পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এসব নিদর্শন প্রাগৈতিহাসিক সমাজে সম্পদ ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
এরও আগে সোনা প্রক্রিয়াজাত করার প্রমাণ পাওয়ার দাবি রয়েছে। বুলগেরিয়ার ইউনাতসিতেতে পাওয়া একটি ছোট সোনার পুঁতির বয়স প্রায় ৬৫০০ বছর বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তাই সোনার ইতিহাসে নির্দিষ্ট কোনো ‘আবিষ্কারের দিন’ বলা সম্ভব নয়।
মিশরে সোনা ছিল দেবত্বের প্রতীক
প্রাচীন মিশরের সঙ্গে সোনার সম্পর্ক ছিল গভীর। শুধু অলংকার নয়, মন্দির, ধর্মীয় আচার এবং মৃতদের সমাধিতেও সোনা ব্যবহার করা হতো।
মেট্রোপলিটন জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, মিশরে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকেই সোনার তৈরি বস্তু পাওয়া যায়। রাজপরিবারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সোনার অলংকার ব্যবহারের প্রচলন ছিল।
মিশরীয়দের কাছে সোনার রং ও স্থায়িত্বের সঙ্গে দেবত্ব ও অমরত্বের ধারণা যুক্ত ছিল। মৃতদের মুখে সোনার পাত বা সোনালি মুখোশ ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। মধ্য রাজ্যের একটি সমাধিতে খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৮১ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়কার সোনার মুখোশের নিদর্শন রয়েছে।
আর মিশরের রাজা তুতানখামুনের সমাধিতে পাওয়া বিপুল সোনার সামগ্রী এখনো প্রাচীন মিশরের ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রতীক।
মেসোপটেমিয়াতেও ছিল সোনার কদর
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর নগরীর সমাধিগুলোতেও সোনার অলংকার, মাথার সাজ, কানের দুল ও হারসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া গেছে। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, তখন সোনা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
প্রাচীন মিশরেও ধাতুর ওজন হিসাব করে লেনদেনের নজির রয়েছে। ব্রিটিশ জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে সোনার বার, আংটি ও অন্যান্য ধাতব বস্তু নির্দিষ্ট ওজন অনুযায়ী লেনদেনে ব্যবহৃত হতো।
যেভাবে সোনা মুদ্রায় পরিণত হলো
সোনার ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে যখন এটি মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচীন রাজ্য লিডিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে প্রাকৃতিক সোনা-রুপার মিশ্র ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরি শুরু হয়।
পরে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে খাঁটি সোনার মুদ্রা তৈরি করা হয়। লিডিয়ার রাজা ক্রোয়েসাসের নামের সঙ্গে যুক্ত সোনার মুদ্রা এতটাই বিখ্যাত হয়েছিল যে পরবর্তীকালে তার নাম বিপুল সম্পদের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। তার মুদ্রাব্যবস্থা পারস্যসহ ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও প্রভাব ফেলেছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় সোনার আলাদা গুরুত্ব
দক্ষিণ এশিয়ায় সোনার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও আবেগপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতে বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব, পারিবারিক সম্পদ ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সোনা গভীরভাবে জড়িত।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে বিয়ে ও উৎসব সোনার বাজারের বড় চালিকাশক্তি। কনের গয়নাও সোনার বাজারের একটি বড় অংশ। অনেক পরিবারের কাছে বিয়েতে পাওয়া সোনা নারীর নিজস্ব সম্পদ বা আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বিয়ের গয়না, পারিবারিক সঞ্চয় ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সোনার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এ কারণেই দাম বাড়লেও সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায় না।
সোনাকে ঘিরে সংঘাতও হয়েছে
সোনার আকর্ষণ শুধু অলংকার বা অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকার প্রাক-কলম্বীয় সভ্যতাগুলোতেও সোনার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল।
ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের কাছে আমেরিকার বিপুল সোনা ছিল লোভের অন্যতম কারণ। স্প্যানিশ বিজয়ের সময় সোনার সন্ধান ও লুটপাট ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় তৈরি করে। অর্থাৎ যেখানে সোনা সম্পদের প্রতীক হয়েছে, সেখানেই এটি ক্ষমতা, দখল ও সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
সোনা এত মূল্যবান কেন?
সোনার মূল্য বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ এর বিরলতা। পৃথিবীতে এর মজুত সীমিত। একই সঙ্গে সোনা সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, অত্যন্ত নমনীয় এবং পাতলা করে টানা বা পেটানো যায়।
গয়না তৈরির পাশাপাশি শিল্প ও প্রযুক্তিতেও সোনার ব্যবহার রয়েছে। আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে সোনা ব্যবহার করা হয়, কারণ এটি ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী এবং ক্ষয় প্রতিরোধী।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রযুক্তি খাতে প্রায় ৮০ টন সোনা ব্যবহার হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর প্রসারও প্রযুক্তি খাতে সোনার চাহিদাকে সমর্থন করছে।
সোনার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক
একসময় বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থার সঙ্গেও সোনা সরাসরি যুক্ত ছিল। ‘স্বর্ণমান’ ব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চালু হওয়া ব্রেটন উডস ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারও সোনার সঙ্গে নির্দিষ্ট মূল্যে যুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারের সঙ্গে সোনার সরাসরি বিনিময় বন্ধ করলে সেই ব্যবস্থা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
তবে অর্থনীতির কেন্দ্র থেকে সোনার সরাসরি ভূমিকা কমলেও মানুষের আস্থা থেকে এটি হারিয়ে যায়নি।
এখনো কেন সোনার এত চাহিদা?
বর্তমানে সোনা একসঙ্গে গয়না, বিনিয়োগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত এবং প্রযুক্তির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বে সোনার মোট চাহিদা প্রথমবার পাঁচ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর মোট চাহিদার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৫৫৫ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৮৬৩ টন সোনা কিনেছে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিট সোনা কেনা বেড়ে ২৮৯ টনে পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের মতে, মজুতের বৈচিত্র্য আনা এবং ভূরাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সময়ে সোনার ভূমিকা এর চাহিদাকে সমর্থন করছে।
তবে সোনার দাম যত বাড়ছে, গয়না হিসেবে এর পরিমাণগত চাহিদা ততটা বাড়ছে না। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে গয়না হিসেবে সোনার চাহিদা কমলেও দাম বেশি থাকায় মোট ব্যয়ের পরিমাণ শক্তিশালী ছিল। অর্থাৎ মানুষ কম পরিমাণ সোনা কিনলেও প্রতি একক সোনার জন্য বেশি অর্থ খরচ করছে।
সোনার ইতিহাস তাই শুধু একটি ধাতুর ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সৌন্দর্যবোধ, ধর্ম, রাজনীতি, যুদ্ধ, বাণিজ্য, মুদ্রা, পারিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতা বদলেছে, মুদ্রা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু সোনার ঝলক মানুষের চোখে এখনো একই রকম আকর্ষণ তৈরি করে। সম্ভবত এ কারণেই ইতিহাসের এত দীর্ঘ সময় ধরে অলংকার, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে সোনা তার জায়গা ধরে রেখেছে।
আরটিভি/জেএমএ


