ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

যে দুই পেশায় আলঝেইমার রোগে মৃত্যুঝুঁকি কম

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
নিয়মিত পথ চিনে চলার কাজ মস্তিষ্কের স্মৃতি ও স্থানিক দক্ষতার ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

আলঝেইমার রোগ বয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার রোগগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে এ রোগের কারণ ও কার্যকর চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা হলেও এখনো এর পুরোপুরি কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তবে নতুন এক গবেষণায় এমন একটি বিষয় সামনে এসেছে, যা আলঝেইমার নিয়ে গবেষণায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য অনেক পেশার তুলনায় ট্যাক্সিচালক ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের কাজে নিয়মিত পথ চিনে চলা ও তাৎক্ষণিকভাবে দিক নির্ধারণের প্রয়োজন হওয়ায় মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

তবে গবেষণাটি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না যে ট্যাক্সি বা অ্যাম্বুলেন্স চালানো আলঝেইমার থেকে সুরক্ষা দেয়।

কীভাবে পেশার সঙ্গে আলঝেইমারের সম্পর্ক মিলল?

গত দুই দশকে করা কিছু ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, লন্ডনের ট্যাক্সিচালকদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে বড় হতে পারে। মস্তিষ্কের এই অংশ স্মৃতি তৈরি এবং বিশেষ করে স্থান ও পথ মনে রাখার সঙ্গে জড়িত।

মজার বিষয় হলো, আলঝেইমার রোগে হিপোক্যাম্পাসের এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণেই গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়—নিয়মিত পথ খোঁজা ও স্থানিক স্মৃতি ব্যবহারের মতো কাজ কি ট্যাক্সিচালকদের মস্তিষ্কে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটায়, যা আলঝেইমারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত?

নতুন গবেষণায় সেই সম্ভাবনাই আরও বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।

প্রায় ৯০ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ

গবেষকেরা প্রায় ৯০ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এসব মানুষ তিন বছরের একটি সময়ে মারা গেছেন এবং তাদের মৃত্যুসনদে পেশার তথ্য ছিল।

বিভিন্ন বয়সের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ৪৪৩টির বেশি পেশায় আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার হিসাব করা হয়। এতে ট্যাক্সিচালক ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।

ট্যাক্সিচালকদের মৃত্যুর মধ্যে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ ছিল আলঝেইমার-সম্পর্কিত। অ্যাম্বুলেন্সচালকদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

অন্যদিকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের মৃত্যুর মধ্যে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা সাধারণ জনগোষ্ঠীর গড় হারের কাছাকাছি।

গবেষণার হিসাবে, অন্যান্য পেশার তুলনায় ট্যাক্সিচালক ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের মধ্যে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যু ৪০ শতাংশের বেশি কম ছিল।

সব ধরনের চালকের ক্ষেত্রে একই ফল নয়

তবে মজার বিষয় হলো, পথনির্দেশ ও চলাচলের সঙ্গে যুক্ত সব পেশায় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি।

বিমানচালকদের মধ্যে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার ছিল ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং জাহাজের ক্যাপ্টেনদের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ১২ শতাংশ। বাসচালকদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ শুধু গাড়ি বা যানবাহন চালানোর সঙ্গে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

ট্যাক্সি ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের ক্ষেত্রে কেন এমন হতে পারে?

গবেষকদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ট্যাক্সি ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের অনেক সময় চলার পথে তাৎক্ষণিকভাবে দিক নির্ধারণ করতে হয়। কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে, কোথায় মোড় নিতে হবে এবং কীভাবে নির্দিষ্ট গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নিতে নিয়মিত স্থানিক স্মৃতি ও পথ চিনে চলার দক্ষতা ব্যবহার করতে হয়।

এ ধরনের নিয়মিত মানসিক কাজ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের গঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিপোক্যাম্পাস সুস্থ থাকলে তা আলঝেইমার-সম্পর্কিত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অন্যদিকে বাসচালক, বিমানচালক বা জাহাজের ক্যাপ্টেনদের অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট পথ বা পূর্বনির্ধারিত চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। ফলে তাদের কাজের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে পথ খোঁজার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

তবে গবেষণার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিলেও এটিকে আলঝেইমার প্রতিরোধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। এ ধরনের গবেষণায় দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেলেও একটি বিষয় সরাসরি অন্যটির কারণ—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

গবেষকেরা মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা মৃত্যুর সময়কার প্রধান পেশার তথ্য ব্যবহার করেছেন। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে একাধিক পেশা থাকতে পারে। আবার মৃত্যুসনদের পেশার তথ্যও সবসময় পুরোপুরি নির্ভুল নাও হতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, কিছু মানুষ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই পথ চিনতে বেশি দক্ষ। যারা আলঝেইমারের ঝুঁকিতে বেশি, তারা হয়তো এমন পেশা বেছে নেন না, যেখানে নিয়মিত পথ খুঁজে চলতে হয়। ফলে পেশার পরিবর্তে ব্যক্তির স্বাভাবিক সক্ষমতাও ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ধূমপানের মতো অন্যান্য বিষয়ও এখানে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন ট্যাক্সি বা অ্যাম্বুলেন্সচালকদের মধ্যে ধূমপানের হার যদি তুলনামূলকভাবে কম হয়, তাহলে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর কম হারের পেছনে সেটিও ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া ট্যাক্সিচালকদের মধ্যে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ১০টি। এত কম সংখ্যার ক্ষেত্রে কয়েকটি তথ্য বাদ পড়লেও গবেষণার ফল পরিবর্তিত হতে পারে।

মুঠোফোনের পথনির্দেশ কি প্রভাব ফেলবে?

গবেষণাটি আরও একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। বর্তমানে পথ খুঁজে নিতে মুঠোফোনের মানচিত্র ও পথনির্দেশের ব্যবস্থা (গুগল ম্যাপ) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ট্যাক্সি ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের যদি এখন আগের তুলনায় কম নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে পথ খুঁজতে হয়, তাহলে এই পেশার সম্ভাব্য সুরক্ষামূলক প্রভাবও কমে যেতে পারে কি না—তা ভবিষ্যৎ গবেষণায় দেখা প্রয়োজন।

পথ চিনে চলার অনুশীলন কি সবার জন্য উপকারী?

নতুন গবেষণার ফল সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—ট্যাক্সি বা অ্যাম্বুলেন্স চালানোর মতো কাজ না করেও কি নিয়মিত স্থানিক স্মৃতির অনুশীলন করা যায়?

পথ খোঁজার খেলা, জটিল ধাঁধা, কিছু মুঠোফোনভিত্তিক খেলা কিংবা বোর্ডের খেলায় স্থানিক দক্ষতা ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। এমনকি জটিল পথে দিকনির্দেশ অনুসরণ করে চলার অনুশীলনও মস্তিষ্কের এই দক্ষতা চর্চায় সহায়ক হতে পারে।

তবে এসব কার্যক্রম আলঝেইমার প্রতিরোধ করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এখন কী করা উচিত?

একটি গবেষণার ফলের ওপর ভিত্তি করে আলঝেইমার প্রতিরোধের নতুন কোনো পদ্ধতি নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের প্রচলিত পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ট্যাক্সিচালক ও অ্যাম্বুলেন্সচালকদের মধ্যে আলঝেইমার-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার কম পাওয়ার বিষয়টি গবেষণায় নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। ভবিষ্যৎ গবেষণায় যদি এই সম্পর্ক নিশ্চিত হয়, তাহলে মস্তিষ্কের স্মৃতি ও স্থানিক দক্ষতার সঙ্গে আলঝেইমারের সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে রোগটি প্রতিরোধের নতুন পথও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

সূত্র: হার্ভার্ড


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ব্যায়ামেই বাড়ে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি
শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের গুরুত্ব অনেক। নিয়মিত ব্যায়াম পেশির শক্তি ধরে রাখে, হৃদ্‌যন্ত্র ভালো রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ব্যায়ামেই বাড়ে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি
দুশ্চিন্তায় অস্থির? মস্তিষ্ক শান্ত রাখতে প্রতিদিন করুন এই অভ্যাস 
ব্যস্ততা, কাজের চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা নানা দুশ্চিন্তায় অনেক সময় মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে পড়ে।
দুশ্চিন্তায় অস্থির? মস্তিষ্ক শান্ত রাখতে প্রতিদিন করুন এই অভ্যাস 
মাটিতে খেললেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে? জানুন গবেষণা
শহরের ব্যস্ত জীবনে শিশুদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ দিন দিন কমছে। কংক্রিটের ভবন, ব্যস্ত রাস্তা আর চার দেয়ালের মধ্যেই বড় হচ্ছে অনেক শিশু।
মাটিতে খেললেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে? জানুন গবেষণা
ছুটিতে গিয়েও কেন মনে পড়ে অফিসের কথা
ছুটি মানেই অফিসের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে ছুটিতেও অফিস যেন পিছু ছাড়ে না।
ছুটিতে গিয়েও কেন মনে পড়ে অফিসের কথা
জেনে নিন পুরুষের ৩ গোপন রোগ ও চিকিৎসা
পুরুষদের কিছু শারীরিক ও যৌন স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, যা নিয়ে অনেকেই লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে চান না।
জেনে নিন পুরুষের ৩ গোপন রোগ ও চিকিৎসা