
বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেটই শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে ফেলা হয়। ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার সুবিধা পাচ্ছে না।
খাদ্যনিরাপত্তা, ক্ষুধা মোকাবিলা এবং খাদ্য অপচয় কমানোর বিষয়টি সামনে রেখে প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে দিবসটি পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজ উদ্ভাবন, আগামীতে পুষ্টি’। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অপচয় কমিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এতে।
ধীরে ধীরে কমছে বিশ্বে ক্ষুধার হার
জাতিসংঘের ‘বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির পরিস্থিতি’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২২ সালে ক্ষুধার হার বেড়ে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
টানা তিন বছর ধরে বিশ্বে ক্ষুধার হার কমলেও করোনা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি এখনো খারাপ। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি ছিল।
কোন অঞ্চলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি
বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। অর্থাৎ, আফ্রিকার প্রতি পাঁচজন মানুষের একজনের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ছিল না। বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই এ মহাদেশের বাসিন্দা।
অন্যদিকে, এশিয়ায় প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে, যা মহাদেশটির মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ, যা ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সেও দেশভিত্তিক ক্ষুধার পরিস্থিতির একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। এ সূচকে অপুষ্টি, শিশুদের বয়স অনুযায়ী কম উচ্চতা, উচ্চতার তুলনায় কম ওজন এবং শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনা করে ১০০-এর মধ্যে স্কোর দেওয়া হয়। ৩৫ বা তার বেশি স্কোরকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূচকে মূল্যায়ন করা ১২২টি দেশের মধ্যে আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এর সাতটিই আফ্রিকার দেশ। তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, চাদ ও মাদাগাস্কার। সংঘাত ও তথ্যের ঘাটতির কারণে সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনের স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবছর কত খাবার অপচয় হয়
খামার থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই খাদ্য নষ্ট হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাবারের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল তোলার পর থেকে দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব খাবার নষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে ফলমূল ও শাকসবজির ক্ষতির হার সবচেয়ে বেশি।
দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হওয়া খাবারের আর্থিক মূল্য বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভোক্তাদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ ১০৫ কোটি টন খাবার দোকান, রেস্তোরাঁ ও পরিবারগুলো থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই পরিমাণ খাবার বহন করতে ২০ টন ধারণক্ষমতার প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক লাগবে।
খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটে পরিবারে। মোট অপচয় হওয়া খাবারের ৬০ শতাংশই আসে গৃহস্থালি থেকে। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে আসে ২৮ শতাংশ এবং দোকান থেকে ১২ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় করে কোন দেশ
বিশ্বে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার অপচয় করেন। এর মধ্যে শুধু বাড়িতেই ফেলে দেওয়া হয় প্রায় ৭৯ কেজি খাবার।
তবে দেশভেদে খাবার অপচয়ের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির মতে, উষ্ণ আবহাওয়ার দেশগুলোতে বাড়িতে খাবার অপচয়ের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বেশি পরিমাণ তাজা খাবার খাওয়া এবং খাবার সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত শীতলীকরণব্যবস্থার অভাবকে বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মাথাপিছু খাবার অপচয়ের পরিমাণে শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার অপচয় করেন, যা বিশ্ব গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
এ তালিকায় এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয় হয়। বিপরীতে, স্পেনে মাথাপিছু খাবার অপচয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম, বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম।
খাবার অপচয়ে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। তবে ক্ষতি শুধু অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাবার উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যবহৃত জমি, পানি, জ্বালানি ও শ্রমও অপচয় হয়।
বিশ্বের প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর কৃষিজমিতে এমন খাবার উৎপাদন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না। এটি বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ এবং আয়তনে কানাডার চেয়েও বড়।
এ ছাড়া খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের আনুমানিক ৮ থেকে ১০ শতাংশ তৈরি হয়। বিশেষ করে, ফেলে দেওয়া খাবার ভাগাড়ে পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
ঘরে খাবার অপচয় কমাবেন যেভাবে
খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যেহেতু পরিবারে ঘটে, তাই দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাবার বাঁচানো সম্ভব। খাদ্য অপচয়বিরোধী প্রচারক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, ঘরে খাবারের অপচয় কমানোর কয়েকটি উপায় হলো—
১. কেনাকাটার আগে পরিকল্পনা করুন: ঘরে কী কী খাবার আছে, তা দেখে নিন। সপ্তাহের খাবারের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করুন। এতে অতিরিক্ত খাবার কেনার প্রবণতা কমবে।
২. খাবারের মেয়াদ বুঝে নিন: ‘ইউজ বাই’ লেবেল সাধারণত খাবারের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, ‘বেস্ট বিফোর’ মূলত খাবারের গুণমান বোঝায়। তাই ‘বেস্ট বিফোর’ তারিখ পার হলেই খাবারটি অনিরাপদ হয়ে যায় না। তবে খাওয়ার আগে খাবারের ধরন, সংরক্ষণপদ্ধতি ও নিরাপত্তা বিবেচনা করা জরুরি।
৩. সঠিকভাবে খাবার সংরক্ষণ করুন: ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখুন। ফলমূল ও শাকসবজি উপযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করুন। যেমন, পাকা কলা থেকে নির্গত ইথিলিন গ্যাস কাছাকাছি থাকা কিছু ফল দ্রুত পাকিয়ে দিতে পারে।
৪. ফ্রিজারে খাবার রাখুন: পাউরুটি, রান্না করা খাবার, মাংস এবং অনেক ধরনের ফল ও সবজি নষ্ট হওয়ার আগেই ফ্রিজারে রাখা যায়। এতে খাবারের ব্যবহারযোগ্য সময় বাড়ে।
৫. প্রয়োজনমতো রান্না করুন: বিশেষ করে ভাত, পাস্তা বা অন্য শস্যজাতীয় খাবার রান্নার সময় পরিমাণ মেপে নিন। এতে বাড়তি খাবার ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন কমবে।
৬. পুরোনো খাবার আগে খান: ফ্রিজ ও আলমারিতে আগে রাখা খাবার সামনে রাখুন। নতুন খাবারের আগে সেগুলো ব্যবহার করলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
৭. বেঁচে যাওয়া খাবার কাজে লাগান: আগের দিনের রান্না করা খাবার দিয়ে নতুন পদ তৈরি করা যায়। সবজির খোসা ও ডাঁটার মতো উপাদানও উপযুক্তভাবে পরিষ্কার করে স্যুপ বা স্টক তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
৮. অখাদ্য অংশ কম্পোস্ট করুন: যেসব অংশ খাওয়া যায় না, যেমন ডিমের খোসা ও কিছু সবজির খোসা, সেগুলো দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করা যেতে পারে। এতে এসব বর্জ্য ভাগাড়ে ফেলা কমবে এবং পচনের ফলে মিথেন নির্গমন কমাতে সহায়তা করবে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমাতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত খাবারের অপচয় রোধ করাও জরুরি। কেনাকাটা, রান্না ও খাবার সংরক্ষণে সচেতন হলে পরিবারগুলো যেমন অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, তেমনি পরিবেশের ওপর চাপ কমানো এবং খাদ্যসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সম্ভব।
আরটিভি/ এসকেডি


