
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে আজ (২৭ অক্টোবর) ভোট গ্রহণ হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের শেষ দিকের জনমত জরিপে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থী দল সামান্য ব্যবধানে নেতানিয়াহুর লিকুদ দলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এর মধ্যে লেবানন ও ইরানের সঙ্গেও সামরিক সংঘাত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পতন ঘটেছে।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে লড়াই ৩৭ দলের
ইসরায়েলে এবার প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ ভোট দেওয়ার যোগ্য। তাদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক। দেশজুড়ে ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্স রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচনের দিন দেশটিতে সরকারি ছুটি।
পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৩৭টি দল ও নির্বাচনী জোট। সরকার গঠন করতে হলে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোটাররা সরাসরি প্রার্থীকে নয়, দলকে ভোট দেন। পার্লামেন্টে আসন পেতে কোনো দলকে বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়।
দেশটির ইতিহাসে কোনো দল এককভাবে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই নির্বাচনের পর সরকার গঠনে বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জরিপে এগিয়ে আইজেনকটের দল
ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন সম্প্রচারমাধ্যমের প্রকাশিত শেষ দিকের জরিপ অনুযায়ী, গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থী দল ইয়াশার ২২ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ দল পেতে পারে ১৯ থেকে ২১টি আসন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিয়াখাদ বা ‘একসঙ্গে’ জোট তৃতীয় অবস্থানে থাকতে পারে। তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ১৪ থেকে ১৫টি।
বিরোধী শিবিরের অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু।
জরিপে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫২ থেকে ৫৬। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো পক্ষই সহজে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে বলে মনে হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই যে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী হবেন, এমন নিয়মও নেই। নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি, তাকেই সেই দায়িত্ব দেবেন।
ক্ষমতা ধরে রাখতে কঠিন লড়াই নেতানিয়াহুর
৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু তিন দফায় ১৮ বছরেরও বেশি সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারও ক্ষমতায় ফিরতে তার প্রচারের মূল বিষয় জাতীয় নিরাপত্তা। আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় নিজের অভিজ্ঞতা ও সামরিক নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে তার সরকারের ব্যর্থতা, পরবর্তী সংঘাত মোকাবিলা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনে আপত্তি জানানো নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
দুর্নীতির অভিযোগেও তার বিচার চলছে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। এছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দলগুলো। পাশাপাশি রয়েছে অতি-ধর্মীয় দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম।
বেন-গভির ও স্মোটরিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে। তারা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চলে যাওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে, অতি-ধর্মীয় দলগুলো ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছাড় বজায় রাখতে চায়। দীর্ঘ সংঘাতের পর সেনাসংকটের মুখে এসব ছাড় নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হতে চান আইজেনকট
৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর জরুরি সরকারে যোগ দেন। তবে গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের অভাব নিয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে পরে সরকার ছাড়েন তিনি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালনকালে তার ছেলে নিহত হন।
আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার। তিনি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতা তদন্তে সরকারি কমিশন গঠন এবং অতি-ধর্মীয় পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় বন্ধ করার পক্ষে।
তবে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরলেও নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার অবস্থান নেতানিয়াহুর কাছাকাছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে গাজায় হামাসের সামরিক সক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার পক্ষে।
তাই এবারের নির্বাচনে নেতৃত্ব, সরকার পরিচালনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোতে ভোটারদের সামনে ভিন্ন পথ থাকলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই নেতার অবস্থানে মিল রয়েছে।
সরকার গঠনে নির্ধারক হতে পারে ফিলিস্তিনি দলগুলো
কোনো পক্ষই ৬১টি আসন না পেলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম দল সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরিপে জয়েন্ট লিস্ট প্রায় ৯টি এবং রা'আম ৫ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এসব দলের এক বা একাধিক দলের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তারা সরাসরি জোটে যোগ দিতে পারে, আবার জোটের বাইরে থেকেও সংসদে সমর্থন দিতে পারে।
তবে এ ধরনের সমঝোতা সহজ হবে না। লিবারম্যান ফিলিস্তিনি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারাও এমন সমঝোতার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে চাননি।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ডানপন্থী ভোটারদের সমর্থন বাড়াতে বারবার ফিলিস্তিনি দলগুলোর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছেন।
আবারও কি রাজনৈতিক অচলাবস্থা?
নির্বাচনের পর কয়েকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নেতানিয়াহুর জোট প্রয়োজনীয় আসন পেলে কিংবা অন্য শিবির থেকে আইনপ্রণেতাদের সমর্থন পেলে তিনি আবার সরকার গঠন করতে পারেন।
আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের জন্য ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন, অন্য শিবিরের আইনপ্রণেতাদের পক্ষ পরিবর্তন অথবা মতাদর্শগতভাবে ভিন্ন বিরোধী নেতাদের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।
লিকুদ ও বিরোধী শিবিরের বড় দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে আইজেনকট ও তার কয়েকজন মিত্র নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে জোট গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু দায়িত্বে থাকতে পারেন এবং আবারও নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভোটের ন্যূনতম সীমার কাছাকাছি থাকা ছোট দলগুলোর ফলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো দল বৈধ ভোটের ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ না পেলে পার্লামেন্টে আসন পাবে না। এতে তাদের মিত্রদের আসনসংখ্যা কমে যেতে পারে এবং দুই শিবিরের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বুথফেরত জরিপ প্রকাশের কথা রয়েছে। রাতভর প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করবে। তবে সেনাসদস্য, হাসপাতাল, কারাগার ও বিশেষ ব্যবস্থায় ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের ব্যালট গণনায় কয়েক দিন লাগতে পারে। আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের সূচি রয়েছে। এরপর সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আরটিভি/জেএমএ



