
১৯৪৮ সালের ১ ডিসেম্বর। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড উপশহরের সোমারটন পার্ক সৈকতে হাঁটতে গিয়ে এক দম্পতি দেওয়ালের সঙ্গে পা ক্রশ করে হেলে থাকা এক ব্যক্তির মরদেহ দেখতে পান। আগের রাতে স্থানীয়রা তাকে হাত-পা নাড়াতে দেখলেও সকালে তিনি আর বেঁচে ছিলেন না।
প্রথম দিকে ঘটনাটিকে সাধারণ মৃত্যু মনে হলেও পরবর্তী তদন্তে উঠে আসা নানা অদ্ভুত তথ্য একে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক অমীমাংসিত রহস্য বা ‘কোল্ড কেস’-এ পরিণত করে।
মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েক দশক, কিন্তু কেউ ওই ব্যক্তির পরিচয় দাবি করতে আসেনি। তার পরিহিত পোশাক এবং ঘটনার ছয় সপ্তাহ পর কাছের একটি ট্রেন স্টেশনে উদ্ধার হওয়া একটি স্যুটকেসের সব কাপড় থেকেই ব্র্যান্ডের ট্যাগ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। অ্যাথলেটের মতো সুঠাম শরীর থাকা সত্ত্বেও বিষবিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে; যদিও মরদেহে এর কোনো স্পষ্ট রাসায়নিক প্রমাণ মেলেনি।
তবে একটি ছোট্ট সূত্র এই অজ্ঞাতপরিচয় ‘সোমারটন ম্যান’-কে পরিণত করে এক রোমাঞ্চকর রহস্যে। তার প্যান্টের ভেতরের ছোট্ট পকেটে পাওয়া যায় ‘তামাম শুদ’ লেখা একটি কাগজের টুকরো, যা ফারসি কবি ওমর খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ থেকে নেওয়া। ফারসি এই শব্দটির অর্থ ‘শেষ’ বা ‘সমাপ্ত’। কাগজটি কোনো ফটোকপি ছিল না, বরং বইয়ের শেষ পাতা থেকেই ছেঁড়া হয়েছিল। পরে পুলিশ মূল বইটি উদ্ধার করে, যার পেছনের পাতায় খোদাই করা ছিল পাঁচ লাইনের একটি সাংকেতিক কোড। ২০১৪ সালে এক ভাষাবিজ্ঞানী এই কোড উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়ে ধারণা করেন, এটি এমন এক সংক্ষিপ্ত বার্তা যা কেবল এর লেখকই বুঝতে পারতেন।
দীর্ঘ আট দশক ধরে এই রহস্য অমীমাংসিত থাকার পর, ২০২১ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশ জট খুলতে মরদেহের অবশিষ্টাংশ কবর থেকে তোলে। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডেরেক অ্যাবোট, বংশগতিবিদ কলিন ফিটজপ্যাট্রিক এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ‘অ্যাস্ট্রিয়া ফরেনসিকস’ যৌথভাবে জিনোলজিক্যাল সাইট ‘জিইডিমেচ’-এর সহায়তায় আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষা শুরু করেন।
ডিএনএ মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিচয় খোঁজার এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বংশগতিবিদ কলিন ফিটজপ্যাট্রিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এটি অনেকটাই সুডোকু খেলার মতো—যেখানে শুধু সঠিক ও সেরা মিলটি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা চলে।
অবশেষে দীর্ঘ গবেষণার পর বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর সত্য। মৃত ব্যক্তিটি ছিলেন কার্ল চার্লস ওয়েব নামের এক ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যন্ত্র নির্মাতা, যিনি কবিতা ও ঘোড়দৌড়ে বাজি ধরতে ভালোবাসতেন (গবেষকদের ধারণা, বইয়ের পাতায় থাকা সাংকেতিক অক্ষরগুলো হয়তো রেসের ঘোড়ার নাম ছিল)।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানিকে (এবিসি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেরেক অ্যাবোট জানিয়েছেন, তিনি ৯৯.৯৯ শতাংশ নিশ্চিত যে ১৯৪৮ সালে সোমারটন পার্ক সৈকতে পাওয়া মৃত ব্যক্তিটি কার্ল ওয়েবই। তবে তিনি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশের আনুষ্ঠানিক কোরোনার রিপোর্টের অপেক্ষায় আছেন। খুব শিগগিরই এটি প্রকাশ পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আর এর মাধ্যমেই অবসান ঘটতে যাচ্ছে সোমারটন ম্যানকে ঘিরে দীর্ঘ আট দশকের জমাটবদ্ধ এক রহস্যের।
সূত্র: পপুলার মেকানিকস
আরটিভি/এসএস


