
রুশ ড্রোন হামলায় এক পা হারিয়েছিলেন। গুরুতর আহত অন্য পা নিয়ে আটকে ছিলেন ধ্বংসস্তূপের নিচে। বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে বাধ্য হন ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। দীর্ঘ ৪৯১ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর একটি বিশাল ড্রোনে ঝুলে মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার হন ৪৯ বছর বয়সী এই সেনা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর ছয় পাখার একটি ভারী ড্রোনের সাহায্যে ভ্লাসেনকোকে উদ্ধার করা হয়। ড্রোনটি তাকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডারদের দাবি, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম ঘটনা।
ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে যুদ্ধ করছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে তাকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে সহযোদ্ধা বাস্কির সঙ্গে একটি ছোট মাটির গর্তে অবস্থান করতেন তিনি। ড্রোনের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হতো।
দীর্ঘদিন ওই এলাকায় থাকার পর তাদের অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু নতুন সেনাদের সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। একের পর এক সেনা নিহত হওয়ায় ভ্লাসেনকো বুঝতে পারেন, ওই এলাকা থেকে জীবিত ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন।
পরে তাদের আশ্রয়স্থলে পানি ঢুকে পড়লে ভ্লাসেনকো ও বাস্কি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে শুকনা কাপড় ও খাবার আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোনের বোমা হামলায় বাস্কি নিহত হন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে।
গুরুতর আহত অবস্থায় ভ্লাসেনকো স্কুলের একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে ছোট একটি গর্তে আশ্রয় নেন। সেখানে তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাঁ পা ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে। অন্য পায়ের হাড়ও বাইরে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ডান পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলেন তিনি। রক্তপাত বন্ধ করতে ব্যান্ডেজও বাঁধেন। এভাবেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যান এই সেনা।

খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম। আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’
ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তার কমান্ডাররা। ড্রোনের কারণে ওই এলাকায় পিকআপ ট্রাক কিংবা সাঁজোয়া যান পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিকল্প হিসেবে পাঠানো দুটি চালকবিহীন স্থলযানও রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়।
এরপর ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। ছয়টি খাড়া পাখাবিশিষ্ট এই ড্রোনটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।
উদ্ধার অভিযানের আগে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি নিরাপত্তা বেল্ট ও নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়। ৪ অক্টোবর ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছালে তিনি বেল্টের সাহায্যে নিজেকে ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাঁকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে উড়ে যায়।
অভিযানের সময় রুশ ড্রোনের হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনীয় বাহিনী একাধিক ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাওয়ালা ড্রোন ব্যবহার করে। উদ্ধারকারী ড্রোনটির যাত্রাপথ নিরাপদ রাখতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রুশ ড্রোনের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে ভ্লাসেনকোকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণে উদ্ধারস্থলের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার সম্মুখসারির লড়াইকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। আকাশে নজরদারি ও আক্রমণকারী ড্রোনের উপস্থিতির কারণে সামান্য নড়াচড়াও সেনাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আহত সেনাদের স্থলপথে উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভ্লাসেনকোর উদ্ধার অভিযান সেই বাস্তবতারই এক নাটকীয় উদাহরণ। তবে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেও তার সামনে এখন দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ।
উদ্ধারের সময়কার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ভ্লাসেনকো জানান, ড্রোন থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার চেয়ে বনের মধ্যে বা পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাকে বেশি ভাবাচ্ছিল। সাঁতার না জানায় পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল তার।
ধ্বংসস্তূপের নিচে নিজের পা কেটে বেঁচে থাকা থেকে শুরু করে আকাশপথে ড্রোনে ঝুলে উদ্ধার ভ্লাসেনকোর এই ঘটনা আধুনিক যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ভূমিকা তুলে ধরেছে।
আরটিভি/এসকে


