
যুক্তরাষ্ট্রের চার অঙ্গরাজ্যে প্রতারণার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ১৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ও সোনা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন জর্জিয়ায় বসবাসকারী ৩৩ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক প্রদীপ প্যাটেল।
১৮ আগস্ট আলাবামার মোবাইলের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে তিনি দোষ স্বীকার করেন। তার প্লিয়া চুক্তি অনুযায়ী, আলাবামার পাশাপাশি সাউথ ক্যারোলাইনা, ফ্লোরিডা ও টেনেসিতে সংঘটিত প্রতারণার ক্ষতির দায়ও তিনি স্বীকার করেছেন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার একটি ঘটনায় আলাবামার ফেয়ারহোপের এক দম্পতিকে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে বলে বিশ্বাস করানো হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে ওই নারী তার আইপ্যাডে একটি পপআপ বার্তা পান, যেখানে তার অ্যাপল অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশের সতর্কতা দেখানো হয়। বার্তায় দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করার পর একজন নিজেকে ‘স্কট গিবসন’ নামে পরিচয় দেন এবং পরে তাকে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন।
ওই ব্যক্তি নিজেকে ‘রবিন স্টল’ নামে পরিচয় দিয়ে রিজিয়ন্স ব্যাংকের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। তিনি ওই নারীকে জানান, হ্যাকাররা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চুরির চেষ্টা করছে এবং ব্যাংকের একজন কর্মীও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এ কারণে স্থানীয় ব্যাংক শাখার কর্মীদের বিষয়টি জানাতে নিষেধ করা হয়।
প্রতারকদের নির্দেশনা অনুসরণ করে ওই দম্পতি কয়েক দফায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেন। প্রথমে ১২ হাজার ৫০০ ডলার তুলে একটি বিটকয়েন এটিএমে জমা দেন। পরবর্তী সময়ে আরও ৩২ হাজার ডলারের বেশি অর্থ উত্তোলন করেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর প্রতারণার কৌশল বদলে দম্পতিকে সোনার বার কেনার জন্য প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার একটি টেক্সাসভিত্তিক বুলিয়ন ডিলারের কাছে পাঠাতে বলা হয়। তাদের বোঝানো হয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে অর্থ সোনায় রূপান্তর করা প্রয়োজন।
প্লিয়া চুক্তি অনুযায়ী, প্রদীপ প্যাটেল জর্জিয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেয়ারহোপে ওই দম্পতির বাড়িতে যান এবং তারা কেনা সোনার বার সংগ্রহ করেন।
তবে প্যাটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু আলাবামার এই ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, সাউথ ক্যারোলাইনা, ফ্লোরিডা ও টেনেসিতেও একই ধরনের প্রতারণায় তার ভূমিকা ছিল।
সাউথ ক্যারোলাইনার মাউন্ট প্লেজেন্টে এক দম্পতির কাছ থেকে ২০২৫ সালের মার্চে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৫২৭ ডলারের ক্ষতির ঘটনায় প্যাটেল তার দায় স্বীকার করেছেন। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগীকে বলা হয়েছিল, তার অ্যাপল অ্যাকাউন্টের সঙ্গে শিশু পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এরপর তাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠাতে এবং সোনা কিনতে প্ররোচিত করা হয়। প্যাটেল স্বীকার করেছেন, তিনি ওই সোনা সংগ্রহকারী কুরিয়ারদের একজন ছিলেন।
মাউন্ট প্লেজেন্টের আরেক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ১১৫ ডলারের সোনার মুদ্রা প্যাটেল সংগ্রহ করেন বলেও প্লিয়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ফ্লোরিডার পানামা সিটির এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৮১ হাজার ২৯ ডলারের সোনা এবং টেনেসির বার্ডসটাউনের আরেক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ২ লাখ ২ হাজার ৬৫ ডলারের সোনা নেওয়ার ঘটনায়ও তিনি দায় স্বীকার করেছেন।
প্লিয়া চুক্তিতে এসব প্রতারণার সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ ১৫ লাখ ডলারের বেশি উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মামলায় নেপালের নাগরিক সৌরভ শর্মার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ফেয়ারহোপের একই দম্পতির কাছ থেকে তিনি আলাদাভাবে সোনা সংগ্রহ করেছিলেন। শর্মাকে জুন মাসে জর্জিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার বিরুদ্ধে মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, প্যাটেল এর আগে মার্চে অভিযোগ অস্বীকার করে দোষী নন বলে আবেদন করেছিলেন এবং বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি প্লিয়া চুক্তির মাধ্যমে দোষ স্বীকার করেন।
ফেডারেল আইনে প্যাটেলের সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে দোষ স্বীকারের চুক্তির অংশ হিসেবে প্রসিকিউটররা তার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম শাস্তির সুপারিশ করতে সম্মত হয়েছেন। চূড়ান্ত সাজা নির্ধারণ করবেন আদালত।
প্যাটেলের সাজা ঘোষণার কোর্ট হিয়ারিং আগামী ১৯ নভেম্বর নির্ধারিত হয়েছে।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক ‘গোল্ড বার স্ক্যাম’-এর একটি উদাহরণ, যেখানে প্রতারকরা ভুক্তভোগীদের ব্যাংক বা প্রযুক্তি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ নিরাপদ রাখার নামে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা স্বর্ণে রূপান্তর করতে বলে। আলাবামা সিকিউরিটিজ কমিশনও ২০২৫ সালে এ ধরনের গোল্ড বার প্রতারণা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল।
আরটিভি/এসএস




