
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী ধরপাকড় ও বহিষ্কার কার্যক্রমের প্রভাব শুধু অনিবন্ধিত অভিবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এতে মার্কিন নাগরিকদের চাকরিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমেরিকান নাগরিক স্বাধীনতা ইউনিয়ন ও আমেরিকান শ্রমিক ফেডারেশন-শিল্প সংস্থাগুলোর কংগ্রেসের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে প্রায় ৬০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেক চাকরিতে বর্তমানে মার্কিন নাগরিকরা কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘নাগরিকত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক অভিবাসন বহিষ্কারের ফলে শ্রমবাজারে কর্মী সংকট তৈরি হতে পারে। নির্মাণ, আতিথেয়তা ও পরিচর্যার মতো অভিবাসী কর্মী নির্ভর খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দাম এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত হিসাবটি এসেছে অর্থনৈতিক নীতি ইনস্টিটিউটের একটি প্রক্ষেপণ থেকে। এতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের বহিষ্কার কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে প্রায় ৬০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। এর প্রায় অর্ধেক বর্তমানে মার্কিন নাগরিকদের দখলে।
তবে এটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির একটি প্রক্ষেপণ, ইতোমধ্যে হারিয়ে যাওয়া চাকরির হিসাব নয়। অর্থাৎ ৬০ লাখ চাকরি নিশ্চিতভাবে হারাবে—এমন দাবি করা হয়নি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, অভিবাসন ধরপাকড়ের কারণে অনেক এলাকায় মানুষ কর্মস্থলে যাওয়া, কেনাকাটা ও রেস্তোরাঁয় যাওয়ার মতো স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় ৮১০ কোটি কম ভ্রমণ এবং ৩০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত কম খরচ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মিনেসোটায় ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ চলাকালে ব্যবসাগুলোর প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি থেকে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত বিক্রি কমার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মিনিয়াপোলিস শহরের নিজস্ব হিসাবেও ওই অভিযানের কারণে ব্যবসা ও শ্রমিকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কথা উঠে এসেছে।
অভিবাসন ধরপাকড়ের শ্রমবাজারে প্রভাব নিয়ে মে মাসে প্রকাশিত জাতীয় অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর একটি গবেষণাতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি ধরপাকড় হওয়া এলাকায় অনিবন্ধিত কর্মীদের কর্মসংস্থান ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক বা তার নিচের শিক্ষাগত যোগ্যতার মার্কিন নাগরিক পুরুষদের কর্মসংস্থানও কমেছে।
গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, অনিবন্ধিত পুরুষ কর্মীদের প্রতি ছয়জন চাকরি হারানোর বিপরীতে প্রায় একজন মার্কিন নাগরিক কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। কৃষি, নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে এর প্রভাব বিশেষভাবে দেখা গেছে।
তবে এসব দাবির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন একমত নয়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিসের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনিবন্ধিত অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে মার্কিন নাগরিকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ও মজুরির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রশাসনের অবস্থান হলো, অভিবাসন আইন কার্যকর করার পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের জন্য চাকরির সুযোগ বাড়ানো তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সমর্থকদের যুক্তি, অনিবন্ধিত কর্মীদের শ্রমবাজার থেকে সরিয়ে দিলে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফলে মূল বিতর্ক হলো—অভিবাসন ধরপাকড় মার্কিন নাগরিকদের জন্য চাকরি ও মজুরি বাড়াবে, নাকি শ্রমিক সংকট ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমিয়ে শ্রমবাজারে উল্টো চাপ তৈরি করবে।
নতুন প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরি ও মজুরি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রয়েছে। তবে ৬০ লাখ চাকরি হারানোর হিসাবটি একটি প্রক্ষেপণ। এর বাস্তব ফল অর্থনীতির অন্যান্য পরিবর্তনশীল বিষয়, শ্রমবাজার ও অভিবাসন নীতির বাস্তব প্রয়োগের ওপরও নির্ভর করবে।
আরটিভি/জেএমএ


