
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র নিউইয়র্ক। তবে নিউইয়র্কের বাইরেও দেশটির বিভিন্ন শহর ও মেট্রোপলিটন এলাকায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বাংলাদেশি কমিউনিটি। কোথাও দেশি খাবারের রেস্তোরাঁ ও বাজার, কোথাও মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষা, আবার কোথাও ব্যবসা ও পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ককে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের নিজস্ব পরিবেশ।
এসব এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ছোট বাংলাদেশ’ বলা হয় না। তবে বাংলাদেশি পরিবার, ব্যবসা, খাবার, বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের উপস্থিতির কারণে অনেকেই এমন এলাকাকে কথ্যভাবে ‘ছোট বাংলাদেশ’ হিসেবে দেখেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের আমেরিকান কমিউনিটি জরিপের হিসাবে নিউইয়র্কের পর বাংলাদেশি জনসংখ্যার বড় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ছিল ডেট্রয়েট, ওয়াশিংটন, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিলাডেলফিয়া, আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন, মিয়ামি ও বোস্টন।
ডেট্রয়েট ও হ্যামট্রাম্যাক, মিশিগান
নিউইয়র্কের বাইরে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মিশিগানের ডেট্রয়েট ও হ্যামট্রাম্যাক। বিশেষ করে কন্যান্ট অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
এখানে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান, হালাল খাবারের দোকান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কন্যান্ট স্ট্রিটের বিভিন্ন দোকানে দেশি মসলা, সবজি, মাছ, মাংসসহ নানা পণ্য পাওয়া যায়।
হ্যামট্রাম্যাকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। আল-ইসলাহ ইসলামিক সেন্টারের পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।
পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক ২০২১–২৩ সালের হিসাবেও ডেট্রয়েট মেট্রো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাংলাদেশি জনসংখ্যার কেন্দ্রগুলোর একটি। ওই সময়ে সেখানে বাংলাদেশি-একা জনসংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার ছিল।
লস অ্যাঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া
লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘লিটল বাংলাদেশ’ নিউইয়র্কের বাইরে বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে পরিচিত এলাকাগুলোর একটি। থার্ড স্ট্রিট ও আলেকজান্দ্রিয়া অ্যাভিনিউ ঘিরে গড়ে ওঠা এই এলাকা ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।
এখানে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান, সৌন্দর্যসেবা প্রতিষ্ঠান, মুঠোফোনের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। দেশি মাছ, মসলা, চাল, ডাল ও হালাল পণ্যও পাওয়া যায়।
পিউ রিসার্চের ২০১৭–১৯ সালের হিসাবে লস অ্যাঞ্জেলেস মেট্রোতে প্রায় ৯ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন।
ওয়াশিংটন ও আশপাশের এলাকা
ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রোপলিটন এলাকাও বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় কেন্দ্র। শুধু ওয়াশিংটন শহর নয়, ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকাতেও বাংলাদেশি পরিবার ও ব্যবসা ছড়িয়ে আছে।
এখানে সরকারি চাকরি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় বাংলাদেশি-আমেরিকানদের উপস্থিতি রয়েছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনও গড়ে উঠেছে।
২০২১–২৩ সালের পিউ রিসার্চের হিসাবে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বাংলাদেশি-একা জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার।
ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
ফিলাডেলফিয়া মেট্রো এলাকাতেও দীর্ঘদিনের বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। ২০১৭–১৯ সালের হিসাবে এখানে প্রায় ৭ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করতেন।
শহর ও আশপাশে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান, হালাল খাবারের ব্যবসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও এখানকার কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আটলান্টা, জর্জিয়া
দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র আটলান্টা। বিশেষ করে ডোরাভিল, চ্যাম্বলি, নরক্রস ও বাফোর্ড হাইওয়ের আশপাশে বাংলাদেশি ব্যবসার উপস্থিতি চোখে পড়ে।
এখানে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান ও হালাল মাংসের দোকান রয়েছে। ব্যবসা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশিদের সংখ্যাও বাড়ছে।
২০১৭–১৯ সালের হিসাবে আটলান্টা মেট্রোতে প্রায় ৬ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন।
ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ, টেক্সাস
টেক্সাসের ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকাতেও গত কয়েক দশকে বাংলাদেশি কমিউনিটি বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৭–১৯ সালের পিউ রিসার্চের হিসাবে এই মেট্রো এলাকায় প্রায় ৬ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করতেন।
ব্যবসা, পেশাজীবী নেটওয়ার্ক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এখানে বাংলাদেশি খাবার ও দেশি পণ্যের ব্যবসাও গড়ে উঠেছে।
হিউস্টন, টেক্সাস
হিউস্টনে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দেশি খাবার ও বাজারের সমন্বয়। বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ও মুদিদোকানে মাছ, সবজি, চাল, মসলা ও হালাল মাংসসহ নানা পণ্য পাওয়া যায়।
২০১৭–১৯ সালের হিসাবে হিউস্টন মেট্রো এলাকায় প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন।
মিয়ামি, ফ্লোরিডা
দক্ষিণ ফ্লোরিডার মিয়ামি মেট্রোতেও বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি রয়েছে। ২০১৭–১৯ সালের পিউ রিসার্চের হিসাবে এখানে প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন।
বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পেশা ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, হালাল খাবারের দোকান, মুদিদোকান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের কমিউনিটি ধরে রেখেছেন।
বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস
নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম পুরোনো কেন্দ্র বোস্টন। ২০১৭–১৯ সালের হিসাবে বোস্টন মেট্রো এলাকায় প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন।
জনসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও এখানে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশি পরিবার ও সংগঠনগুলো বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ধরে রেখেছে।
আটলান্টিক সিটি, নিউ জার্সি
নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিও বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত একটি কেন্দ্র। ২০১৭–১৯ সালের পিউ রিসার্চের শীর্ষ ১০ মেট্রো তালিকায় এখানে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশির হিসাব ছিল।
এখানে বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির জন্য মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশি পরিবারগুলোর সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে ঘিরে কমিউনিটি গড়ে উঠেছে।
শুধু জনসংখ্যা নয়, কমিউনিটির শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যার হিসাবই সবকিছু নয়। কোথায় বাংলাদেশি ব্যবসা, মুদিদোকান, রেস্তোরাঁ, মসজিদ, ইসলামি শিক্ষা, সামাজিক সংগঠন ও পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ক কতটা গড়ে উঠেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পিউ রিসার্চের ২০২১–২৩ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি-একা জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। এর ৪৪ শতাংশ নিউইয়র্কে বসবাস করে। মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও নিউ জার্সিও বাংলাদেশি জনসংখ্যার বড় কেন্দ্র।
অর্থাৎ নিউইয়র্ক সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশিরা নিজেদের খাবার, ভাষা, ধর্ম, ব্যবসা ও সামাজিক জীবনকে ঘিরে আলাদা আলাদা কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এসব এলাকাতেই অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি খুঁজে পান পরিচিত খাবার, দেশি বাজার আর বাংলায় আড্ডার পরিবেশ।
আরটিভি/জেএমএ


