
যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গানের প্রতিযোগিতা ‘আমেরিকান আইডল’-এর সাবেক প্রতিযোগী ক্যালেব ফ্লিন তার স্ত্রী অ্যাশলি ফ্লিনকে হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ওহাইওর মিয়ামি কাউন্টির আদালতে জুরি বোর্ড তাকে হত্যা, হামলা ও প্রমাণ নষ্টের অভিযোগসহ মোট নয়টি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে।
৩৭ বছর বয়সী অ্যাশলি ফ্লিনকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওহাইওর টিপ সিটির নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। ক্যালেব শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, একজন ডাকাত বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আদালতে রায় ঘোষণার পর ক্যালেবকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। তিনি বারবার চোখ ও নাক মুছছিলেন। পরে হাতকড়া পরিয়ে তাকে আদালত থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত দিতে দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লাগে। আগামী ৫ অক্টোবর তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে। হত্যার মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এবং প্যারোলে মুক্তির সুযোগ নাও থাকতে পারে।
তবে ক্যালেবের আইনজীবী প্যাট্রিক মুলিগান জানিয়েছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। তিনি বলেন, আপিল আদালতে রায়টি বিস্তারিতভাবে চ্যালেঞ্জ করা হবে।
ঘটনার দিন ক্যালেব জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে জানান, তার স্ত্রীকে এক অনুপ্রবেশকারী মাথায় একাধিকবার গুলি করেছে। ওই ব্যক্তি তখনও বাড়ির ভেতরে আছে কি না, তিনি জানেন না বলেও জানান।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ক্যালেব দাবি করেন, তিনি বসার ঘরের সোফায় ঘুমাচ্ছিলেন। গুলির শব্দে তার ঘুম ভাঙে। তিনি আরও জানান, হত্যার এক দিন আগে এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে এসে অ্যাশলির হাতে একটি মার্কিন পতাকা দিয়েছিল এবং আমেরিকা নিয়ে অদ্ভুত ধরনের পণ্য বিক্রির কথা বলেছিল।
তবে পুলিশ বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায়, গ্যারেজের দরজা, পাশের দরজা এবং ক্যালেবের গাড়ির মাঝের বাক্স খোলা ছিল। ক্যালেব জানান, ওই বাক্সে তিনি একটি আগ্নেয়াস্ত্র রাখতেন। কিন্তু সেখানে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, ক্যালেবই হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর জন্য বাড়িতে সাজানো পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।
সহকারী কৌঁসুলি ম্যাথিউ সি. জোসেফ আদালতে বলেন, ক্যালেব পুলিশের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, প্রমাণের সঙ্গে তার মিল নেই। তার ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির তথ্যও হত্যার আগের কয়েক ঘণ্টায় তাঁর চলাফেরা ও সক্রিয় থাকার প্রমাণ দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার শুনানিতে ক্যালেবের সঙ্গে তার তৎকালীন প্রেমিকা অ্যালেইঘা বটনারের আদান-প্রদান করা খুদে বার্তাও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
বটনার জানান, তিনি ২০ বছর বয়সে ক্যালেবের সঙ্গে পরিচিত হন। তখন তিনি ক্যালেবের গির্জায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতেন। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।
আদালতে বটনার দাবি করেন, ক্যালেব তার স্ত্রীকে ঘৃণা করার কথা বলতেন এবং তাকে হত্যার চিন্তাও করতেন। একটি বার্তায় বটনার লিখেছিলেন, ‘আমি তাকে হত্যা করতে চাই।’ জবাবে ক্যালেব লিখেছিলেন, ‘আমরাও দুজন একই কথা ভাবছি।’
আরেকটি বার্তায় ক্যালেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি লিখেছিলেন যে, আগের রাতে ভোর ৪টা পর্যন্ত জেগে স্ত্রীকে কীভাবে হত্যা করা যায় এবং কারাগারে না যেতে কী করা যায়, তা ভাবছিলেন।
তবে বটনার পরে আদালতে জানান, তিনি ওই সময়ের সম্পর্ক ও নিজের অনুভূতি নিয়ে এখন ভিন্ন অবস্থানে আছেন। ক্যালেবকে তিনি ঘৃণা করেন বলেও জানান। কেন ঘৃণা করেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার বিশ্বাস ক্যালেবই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।
মামলার শুনানিতে ক্যালেবের আইনজীবী তার বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার প্রমাণ নেই বলে দাবি করেন। আইনজীবী মুলিগান বলেন, কারও সঙ্গে অবিশ্বস্ত আচরণ করা আর হত্যা করা এক বিষয় নয়।
তিনি দাবি করেন, মামলাটিতে হত্যার সঙ্গে ক্যালেবকে সরাসরি যুক্ত করার মতো যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তবে জুরি বোর্ড শেষ পর্যন্ত তাকে সব নয়টি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করে।
২০১৩ সালে ‘আমেরিকান আইডল’-এর দ্বাদশ মৌসুমে শিকাগোতে টেলিভিশন অডিশনে গান করেছিলেন ক্যালেব। তবে তিনি মূল প্রতিযোগিতার পরবর্তী ধাপে যেতে পারেননি। পরে তিনি গির্জায় সংগীতের দায়িত্বেও কাজ করেন।
অ্যাশলি ফ্লিন ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক ও ভলিবল প্রশিক্ষক। হত্যাকাণ্ডের পর তার পরিবার জানিয়েছে, তিনি মা হিসেবে সন্তানদের নিয়ে খুবই যত্নশীল ছিলেন।
মিয়ামি কাউন্টির কৌঁসুলি পল ওয়াটকিনস পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতি পড়ে শোনান। সেখানে বলা হয়, রায়টি অ্যাশলির জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। তবে কোনো রায়ই অ্যাশলিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না বা তার সন্তানদের কাছ থেকে মাকে কেড়ে নেওয়ার কষ্ট মুছে দিতে পারবে না।
পরিবার অ্যাশলির জীবন, বিশ্বাস, দয়া ও সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার কথা তুলে ধরে জানায়, তার জীবন কেড়ে নেওয়া ঘটনার মধ্যেই অ্যাশলির গল্পের শেষ হতে দেওয়া হবে না।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


