
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীকে ঘিরে যৌন নিপীড়নের (গণধর্ষণ) অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হলো—অভিযোগের সময় সেখানে থাকা অন্যরা কেন বাধা দিলেন না?
২০২৪ সালের অক্টোবরে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চি ফাই ভ্রাতৃসংঘের ভবনে সাবেক ওই শিক্ষার্থীকে কয়েকজন সদস্য যৌন নিপীড়ন (গণধর্ষণ) করেছেন বলে অভিযোগ। মামলায় জেন ডো নামে পরিচয় দেওয়া ওই নারী দাবি করেছেন, বিভিন্ন মাদকের প্রভাবে থাকা অবস্থায় তাকে যৌন নিপীড়ন (গণধর্ষণ) করা হয়।
মামলায় যুক্ত একটি দলীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথনের ছবিতে দেখা যায়, ভ্রাতৃসংঘের এক সদস্য লিখেছিলেন, ওপরের তলায় ‘বিনামূল্যে যৌনতা’ পাওয়া যাচ্ছে। পরে ওই ভ্রাতৃসংঘের শাখাটিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এখনো কাউকে এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে প্রসিকিউটররা।
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হওয়ার পর অনেক অভিভাবক সন্তানদের সঙ্গে যৌন সহিংসতা, বন্ধুদের চাপ এবং অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করার বিষয়ে কথা বলছেন। বিশেষ করে ছেলেদের শেখানো হচ্ছে—কেবল নিজে অপরাধ না করাই যথেষ্ট নয়, কোনো বন্ধু অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অভিভাবক অন্যদেরও সন্তানদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা সন্তানকে প্রশ্ন করতে বলছেন, এই ঘটনা সম্পর্কে তুমি কী শুনেছ? এবং এ নিয়ে তোমার কী প্রশ্ন আছে?
সন্তানদের সঙ্গে এমন কথোপকথনের অভিজ্ঞতাও অনেকে প্রকাশ করছেন, যাতে অন্য অভিভাবকেরাও কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ পান।
যুক্তরাষ্ট্রের এক সাবেক ধর্মযাজক ব্রায়ান রেকারও তার সন্তানদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি এমনভাবে সন্তানদের বড় করতে চান, যাতে তারা এমন পুরুষ হয়ে ওঠে যারা অন্যায় ঘটতে বাধা দেয়।
রেকারের ভাষায়, ‘কাউকে ধর্ষণ না করাই যথেষ্ট নয়।’ তার মতে, ওই রাতে মেয়েটির একজন ভালো মানুষের প্রয়োজন ছিল—যে বন্ধুদের সামাজিক চাপ বা তাদের অনুমোদনের চেয়ে তার নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিত।
রেকার জানান, তার ৯ বছর বয়সী যমজ সন্তানদের সঙ্গে তিনি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বেশি কথা বলেন। আর ১১ বছর বয়সী বড় ছেলের সঙ্গে তিনি এমন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন, যেখানে তার বন্ধুদের দলীয় কথোপকথনে কর্নেলের ঘটনার মতো কোনো বার্তা দেখা গেলে সে কী করবে।
তার মতে, ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের কথোপকথন শিশুদের চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যতের আচরণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন্ধুদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলার প্রবণতা খুব সহজেই তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
মনোবিজ্ঞানী সুমি রাঘাভানও সন্তানদের সঙ্গে কঠিন বিষয় নিয়ে কথা বলার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তবে নিজের অতীতের মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা থাকা অভিভাবকদের জন্য যৌন নিপীড়নের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলা আরও কঠিন হতে পারে বলে তিনি জানান।
রাঘাভানের মতে, এ ধরনের বিষয়ে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতে অভিভাবকদের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কথোপকথনের সময় কিছুটা অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ শিশুদের সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, সন্তান বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলেও বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাবা-মাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখতে পারে। তাই কঠিন বিষয় নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে অভিভাবক সন্তানকে বোঝাতে পারেন যে, প্রয়োজন হলে সে তাদের সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে পারবে।
অভিভাবকত্ববিষয়ক পরামর্শদাতা ও মনোবিজ্ঞানী বেকি কেনেডিও একই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সন্তানদের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলাকে যেন শুধু একটি দায়িত্ব পালন হিসেবে দেখা না হয়।
তার মতে, শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও নিজের ইচ্ছা প্রকাশের দক্ষতা প্রতিদিনের পারিবারিক আচরণের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়। কোনো শিশু কোনো বিষয়ে ‘না’ বলতে চাইলে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, অনেক সময় বাবা-মা সন্তানের প্রতিক্রিয়ার ভয় থেকে এমন কোনো বিষয়ে ‘না’ বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ বলে দেন। এ ধরনের ছোট ছোট ঘটনা ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কেনেডির মতে, সন্তানকে নিজের ইচ্ছা ও অস্বস্তি প্রকাশের সুযোগ না দিলে অজান্তেই এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে পরবর্তী সময়ে দলীয় চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে সন্তান পালনের ক্ষেত্রে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কোনো আচরণ পরিবর্তন করা প্রয়োজন বুঝতে পারলে তখন থেকেই নতুনভাবে শুরু করা যায়।
কেনেডি বলেন, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে’—এই ধারণাই অনেক সময় মানুষকে আচরণ পরিবর্তন থেকে বিরত রাখে। বরং বাবা-মা নিজেদের ভুল স্বীকার করে সন্তানকে জানাতে পারেন যে তারা নতুন কিছু শিখেছেন এবং পরবর্তী সময়ে ভিন্নভাবে আচরণ করতে চান।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


