
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় হাম (মিজলস) পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজ্যটিতে হাম আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ২০০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গত তিন দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব এখন পেনসিলভানিয়ায়।
সোমবার (৫ অক্টোবর) পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রাজ্যটিতে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় হাম আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯৯৭ জনে পৌঁছেছিল। ছয় মাসের মধ্যে সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিকে শুরু হওয়া পেনসিলভানিয়ার প্রাদুর্ভাব এখনো কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
পিটসবার্গ মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জন গোল্ডম্যান মনে করেন, পরিস্থিতি আরও তিন থেকে ছয় মাস চলতে পারে। তিনি বলেন, টিকা নেওয়ার সংখ্যা বাড়লেও মহামারি থামানোর মতো পর্যাপ্ত মানুষ এখনো টিকা নিচ্ছেন না।
পেনসিলভানিয়ায় হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ১৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। শিশুদের মধ্যে পানিশূন্যতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে।
হার্শির পেন স্টেট হেলথ গলিসানো শিশু হাসপাতালের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ইভান শিরেই জানান, হাম আক্রান্ত কিছু শিশুর যকৃতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের প্রচণ্ড অসুস্থতা, বমি বমি ভাব, পেটব্যথা ও বমি হচ্ছে। অনেকেই দুধ বা খাবার খেয়ে তা ধরে রাখতে পারছে না।
কিছু শিশু মস্তিষ্কে প্রদাহের কারণে গুরুতর ও স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কোনো কোনো শিশু নিজের মাকেও চিনতে পারছে না, বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছে। আবার কয়েকজনের শরীরে পরবর্তী সময়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণও দেখা দিয়েছে।
পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত হয়ে রাজ্যটিতে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে মস্তিষ্কে গুরুতর প্রদাহে আক্রান্ত এক কিশোর, হাঁপানির ইতিহাস থাকা ৪০ বছর বয়সী এক নারী এবং দুই শিশু রয়েছে।
মৃত শিশুদের একজনের মা নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস আগে প্রসববেদনায় আক্রান্ত হন। পরে নবজাতক শিশুটির মৃত্যু হয়।
পঞ্চম মৃত ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। তবে ওই ব্যক্তি হাম প্রতিরোধের টিকা নেননি এবং সবচেয়ে বেশি হাম আক্রান্ত এলাকা ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে বসবাস করতেন।
ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আমিশ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ২০২৫ সালের হিসাবে সেখানে প্রায় ৪৪ হাজার আমিশ বাসিন্দা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের ধর্মে টিকার বিরোধিতা করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই জনগোষ্ঠীর টিকা নেওয়ার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় কম।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে কিন্ডারগার্টেনে পড়া শিশুদের মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকা নেওয়ার হার ছিল ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে কোনো জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন।
জন গোল্ডম্যান বলেন, ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টি বিশেষ কোনো এলাকা নয়। যেকোনো কাউন্টিতে যদি টিকা না নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে, সেখানে একই ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো এলাকায় এখনো হাম ছড়ায়নি, তার অর্থ শুধু সেখানে এখনো হাম ভাইরাস পৌঁছায়নি।
এর আগে দক্ষিণ ক্যারোলিনার হাম প্রাদুর্ভাবকে প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হিসেবে ধরা হয়েছিল। সেখানে ইউক্রেন থেকে কয়েক দশক ধরে আসা অভিবাসীদের একটি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংক্রমণের যোগসূত্র পাওয়া যায়।
সেখানে ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। হাম চলাকালে দক্ষিণ ক্যারোলিনার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, পেনসিলভানিয়ায় হাম প্রাদুর্ভাবের জবাবে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার ৮৪৩টি টিকা দেওয়া হয়েছে।
পেনসিলভানিয়ার সীমান্তবর্তী ওহাইও অঙ্গরাজ্যেও হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ২১০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
ওহাইওর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গিয়গা, অ্যাশটাবুলা ও ওয়েন কাউন্টিতে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত মানুষ টিকা না নিলে পেনসিলভানিয়ার এই প্রাদুর্ভাব আরও কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


