
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি বিনোদন পার্কে রোলার কোস্টার থেকে পড়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর নিরাপত্তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিনোদন পার্কে একই ধরনের ১১টি রোলার কোস্টার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, যাত্রীদের আটকে রাখার নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না।
সোমবার (১২ অক্টোবর) জর্জিয়ার সিক্স ফ্ল্যাগস ওভার জর্জিয়া পার্কে গোলিয়াথ নামের রোলার কোস্টার থেকে পড়ে ৪২ বছর বয়সী হাসান জিহাদ ইবনে কারিমের মৃত্যু হয়। তিনি আটলান্টার একটি বিদ্যালয়ের কর্মী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলন্ত রোলার কোস্টার থেকে তাকে ছিটকে পড়তে দেখা যায়।
এ ঘটনার পর পুলিশ ও অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদন্ত শুরু করে। দুর্ঘটনার আগে ওই রোলার কোস্টারে চড়া কয়েকজন যাত্রীও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ফ্লোরিডার সি ওয়ার্ল্ড অরল্যান্ডো এবং কানাডার মন্ট্রিয়লের লা রঁদ বিনোদন পার্ক তাদের দুটি রোলার কোস্টার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর ফলে বন্ধ থাকা রোলার কোস্টারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
কারিমের মৃত্যুর প্রায় এক ঘণ্টা আগে নিজের ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে গোলিয়াথ রোলার কোস্টারে চড়েছিলেন এরিকা বিলাপস। তার দাবি, একটি আসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বারবার খুলে যাচ্ছিল। প্রথমে তার ছেলে ওই আসনে বসে নিরাপত্তাব্যবস্থা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটি বারবার খুলে যাওয়ায় সে অন্য আসনে চলে যায়।
বিলাপসের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ওই আসনটি খালি রেখেই রোলার কোস্টার চলতে শুরু করে এবং আসনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা খোলা ছিল। বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এপিকে পাঠানো খুদে বার্তায় তিনি নিজের আগের বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তার অভিযোগ, আসনটিতে সমস্যা থাকার বিষয়ে পার্কের কর্মীরা তার সন্তানদের কিছু জানাননি।
জর্জিয়ার ওই পার্কে স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন সামার বেটস। কারিমকে পড়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। এর আগে এপিকে বেটস জানান, রাইডে থাকা অবস্থায় তার বড় দুই সন্তান বারবার নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্ত করে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। পরে নিজে ওই রোলার কোস্টারে চড়ার সময় তারও মনে হয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তভাবে আটকে নেই।
এ বিষয়ে সিক্স ফ্ল্যাগস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
বন্ধ থাকা ১১টি রোলার কোস্টারের মধ্যে নয়টির নির্মাতা একই প্রতিষ্ঠান। এগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থাও জর্জিয়ার গোলিয়াথের মতো। সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান বোলিগার অ্যান্ড মাবিলার্ড জর্জিয়ার রোলার কোস্টারটি তৈরি করেছে। সি ওয়ার্ল্ড অরল্যান্ডোর মাকো এবং কানাডার লা রঁদের গোলিয়াথও একই প্রতিষ্ঠানের তৈরি।
লা রঁদ জানিয়েছে, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বিস্তারিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা চালানোর জন্য তাদের গোলিয়াথ বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, সি ওয়ার্ল্ড অরল্যান্ডো জানিয়েছে, তাদের মাকো রোলার কোস্টার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে পার্ক দুটি নির্দিষ্ট করে জানায়নি, ঠিক কী কারণে এসব রাইড বন্ধ করা হয়েছে।
বোলিগার অ্যান্ড মাবিলার্ড জানিয়েছে, সোমবারের ঘটনায় কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত তারা অতিরিক্ত মন্তব্য করবে না।
বন্ধ থাকা রোলার কোস্টারগুলোর ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, অধিকাংশের আসনে যাত্রীদের সামনে বাঁকানো দণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। এটি যাত্রীর কোমর ও ঊরুর ওপর আটকে থাকে। তবে এসব রোলার কোস্টারে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে আসনবন্ধনী বা অন্য কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা ছবিগুলো থেকে স্পষ্ট নয়। জর্জিয়ার গোলিয়াথে এ ধরনের অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই।
বিনোদন পার্কবিষয়ক পরামর্শক ও আন্তর্জাতিক বিনোদন পার্ক ও আকর্ষণ সমিতির সাবেক সভাপতি ডেনিস স্পিগেলের মতে, অধিকাংশ রোলার কোস্টার বন্ধ রাখার প্রধান কারণ সম্ভবত একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা। তদন্তে ত্রুটির কারণ শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো বন্ধ থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিনোদনযাত্রার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ডি অ্যাভেরি জানান, রোলার কোস্টারের গতি, যাত্রীর ওপর সৃষ্ট বল এবং রেলপথের বাঁক ও ওঠানামার ধরন বিবেচনা করে নির্মাতারা নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণ করেন। যাত্রীদের সুরক্ষায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন। তবে এতে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়বে কি না, তা নিয়ে এ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
সিক্স ফ্ল্যাগসের বিরুদ্ধে আগেও নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে বিনিয়োগকারীদের করা একটি যৌথ মামলায় অভিযোগ করা হয়, সিডার ফেয়ারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি তাদের পার্কগুলোর অবহেলিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামোগত মেরামত ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের দুরবস্থা গোপন করেছিল। খরচ কমাতে কর্মীর সংখ্যাও কমানো হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সিক্স ফ্ল্যাগস ম্যাজিক মাউন্টেনে ‘এক্স-টু’ রোলার কোস্টারে চড়ার পর ২২ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার হাওলির মৃত্যু হয়। তার পরিবারের পক্ষে মামলা করেছিলেন আইনজীবী টিমোথি লোরাঞ্জার। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অন্য পার্কের রোলার কোস্টার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।
লোরাঞ্জারের অভিযোগ, আগের দুর্ঘটনার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি কখনো কখনো নিরাপত্তাব্যবস্থার গভীর তদন্ত না করে যাত্রীদের বসার ভঙ্গি বা আগে থেকে থাকা শারীরিক সমস্যাকে দায়ী করেছিল। গত মাসে সিক্স ফ্ল্যাগস ম্যাজিক মাউন্টেনের ‘এক্স-টু’ রাইডটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জর্জিয়ার সিক্স ফ্ল্যাগস ওভার জর্জিয়া পার্কটি শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আবার খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে দুর্ঘটনাস্থল গোলিয়াথ রোলার কোস্টারটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আটলান্টা শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মেবলটনে অবস্থিত পার্কটিতে প্রায় ১২টি রোলার কোস্টার রয়েছে। দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রাইডটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: এপি
আরটিভি/জেএমএ


