
পেশিবহুল ও শক্তিশালী শরীর দেখলে অনেকেরই মনে হয়, মানুষটি নিশ্চয়ই ভেতর থেকেও পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এমন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে অল্প বয়সে কয়েকজন বডি বিল্ডারের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিযোগিতামূলক বডি বিল্ডিংয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাইরে থেকে অত্যন্ত ফিট দেখালেও অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও কিছু ওষুধের ব্যবহারে শরীরের ভেতরে, বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের ওপর তৈরি হতে পারে বাড়তি চাপ।
অল্প বয়সেই একের পর এক মৃত্যু
চলতি মাসের শুরুতে ব্রাজিলের বাহিয়া অঙ্গরাজ্যের পেশাদার বডি বিল্ডার ও শরীরচর্চাবিষয়ক প্রভাবশালী ব্যক্তি মেইলসন আরাউজো মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এর আগে গত মে মাসে ব্রাজিলের ২২ বছর বয়সী বডিবিল্ডার গ্যাব্রিয়েল গানলি হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় মারা যান। এর আগের বছরও দেশটির ৩০ ও ৪০ বছর বয়সী আরও দুই বডি বিল্ডার হৃদ্যন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যায় মারা যান।
শুধু ব্রাজিল নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অল্প বয়সে বডি বিল্ডারদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বডি বিল্ডার ডালাস ম্যাককারভার ২৬ বছর বয়সে এবং জার্মানির শরীরচর্চাবিষয়ক প্রভাবশালী ব্যক্তি জো লিন্ডনার ৩০ বছর বয়সে মারা যান।
প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিংয়ে হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি কেন?
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রতিযোগিতামূলক বডি বিল্ডিংয়ের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। গবেষকেরা ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রায় ২০ হাজার অপেশাদার ও পেশাদার বডিবিল্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
তাতে মোট ১২১টি মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৬টি আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিশেষ করে পেশাদার বডি বিল্ডারদের মধ্যে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি অপেশাদারদের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি পাওয়া যায়। প্রতিযোগিতায় সক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৪ দশমিক ৭ বছর।
গবেষকদের মতে, এই ঝুঁকির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধের ব্যবহার, প্রতিযোগিতার আগে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা এবং অত্যন্ত কঠোর ও শক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ।
পেশি বাড়াতে ব্যবহৃত ওষুধ কতটা বিপজ্জনক?
দ্রুত পেশি বাড়ানোর জন্য কিছু বডি বিল্ডার অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ডেনমার্কের একটি গবেষণায় ১ হাজার ১৮৯ জন অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারকারী পুরুষকে প্রায় ১১ বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের সঙ্গে প্রায় ৬০ হাজার সাধারণ পুরুষের তথ্য তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের হৃদ্পেশির গুরুতর রোগ হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নয় গুণ বেশি। তাদের হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল প্রায় তিন গুণ এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের প্রভাব শুধু হৃদ্যন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি রক্তচাপ বাড়াতে পারে, রক্তনালিতে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া ও যৌনস্বাস্থ্যের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বড় হৃদ্যন্ত্র মানেই কি বেশি শক্তিশালী?
শরীরের পেশি বড় করার পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও কিছু পদার্থের ব্যবহারে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
অল্প বয়সে মারা যাওয়া কিছু বডি বিল্ডারের ময়নাতদন্তে হৃদ্যন্ত্র অস্বাভাবিকভাবে বড় এবং হৃৎপিণ্ডের বাম পাশের দেয়াল পুরু হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
হৃদ্যন্ত্রের এমন পরিবর্তন সব সময় ভালো শারীরিক সক্ষমতার লক্ষণ নয়। বরং অতিরিক্ত পুরু হৃদ্পেশি হৃদ্স্পন্দনের ছন্দে সমস্যা এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ, পেশিবহুল শরীর দেখেই কাউকে পুরোপুরি সুস্থ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক বডি বিল্ডিংয়ে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, দ্রুত ওজন কমানো, কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধের অপব্যবহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানোর মতো বিষয়গুলো হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শরীরচর্চা অবশ্যই সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে শরীরকে আরও পেশিবহুল করার প্রতিযোগিতায় গিয়ে নিজের হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/জেএমএ


