
ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আর আনন্দের সময় কাটানো। তবে আনন্দের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। অপরিচিত জায়গায় অসতর্কতার কারণে চুরি, প্রতারণা, টাকা-পয়সা হারানো কিংবা আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে পারেন যে কেউ।
ভ্রমণের আগে গন্তব্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখা এবং পথে কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চললেই অনেক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। ভ্রমণের সময় নিরাপদ থাকতে যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি—
১. স্থানীয় ভাষা শেখার চেষ্টা করুন
কোনো দেশে বা এলাকায় দীর্ঘদিন থাকার পরিকল্পনা থাকলে সেখানকার কিছু সাধারণ ভাষা শিখে নিন। বিপদে পড়লে স্থানীয় মানুষ, চিকিৎসক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে তা কাজে লাগবে।
২. গন্তব্য সম্পর্কে আগে জানুন
কোথায় পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, কোথায় অপরাধের ঝুঁকি বেশি—ভ্রমণের আগে এসব তথ্য জেনে নিন। থাকার জায়গায় পৌঁছে সেখানকার কর্মীদের কাছ থেকেও নিরাপদ এলাকা সম্পর্কে পরামর্শ নিতে পারেন।
৩. ভ্রমণ বিমা রাখুন
বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি কিংবা প্রয়োজনে দ্রুত অন্যত্র নেওয়ার মতো পরিস্থিতির জন্য ভ্রমণ বিমা সহায়ক হতে পারে।
৪. নিজের জিনিসপত্র চোখের সামনে রাখুন
বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর বা ভিড়ের জায়গায় ব্যাগ কখনো একা রেখে যাবেন না। চলার সময় নিজের মালপত্রের দিকে সবসময় নজর রাখুন।
৫. ব্যাংকের ভেতরের যন্ত্র থেকে টাকা তুলুন
অপরিচিত বা জনসমাগমপূর্ণ জায়গার টাকা তোলার যন্ত্রে কার্ডের তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকতে পারে। সম্ভব হলে ব্যাংকের ভেতরে থাকা যন্ত্র থেকে টাকা তুলুন।
৬. নিরাপদ ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করুন
ভ্রমণের সময় এমন ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করা ভালো, যেটিতে সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত কার্ড বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকে এবং জরুরি সময়ে সহায়তা পাওয়া যায়।
৭. দামি জিনিস প্রকাশ্যে দেখাবেন না
দামি ক্যামেরা, মুঠোফোন বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি অকারণে প্রকাশ্যে বের করে রাখবেন না। প্রয়োজন হলে ব্যবহার করুন, তারপর নিরাপদ ব্যাগে রেখে দিন।
৮. কার্ড বন্ধ করার নম্বর লিখে রাখুন
কার্ড হারিয়ে গেলে বা সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত সেটি বন্ধ করা জরুরি। তাই ব্যাংকের জরুরি যোগাযোগের নম্বর আলাদা করে লিখে রাখুন।
৯. পাসপোর্ট ও টাকা শরীরের কাছাকাছি রাখুন
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, টাকা ও কার্ড এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে অন্যের পক্ষে সহজে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শরীরের সঙ্গে নিরাপদভাবে রাখা যায় এমন থলি ব্যবহার করা যেতে পারে।
১০. প্রতিদিনের প্রয়োজনের টাকা আলাদা রাখুন
সব টাকা এক জায়গায় না রেখে দিনের প্রয়োজনীয় টাকা আলাদা মানিব্যাগে রাখুন। ছিনতাইয়ের মতো পরিস্থিতিতে এতে বড় ক্ষতি কিছুটা এড়ানো সম্ভব।
১১. প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে জানুন
ভ্রমণের আগে সেই এলাকার প্রচলিত প্রতারণার ধরন সম্পর্কে জেনে নিন। অপরিচিত কেউ হঠাৎ সাহায্য করার নামে কাছে এলে সতর্ক থাকুন।
১২. প্রয়োজনের বেশি মূল্যবান জিনিস সঙ্গে রাখবেন না
থাকার জায়গায় নিরাপদ আলমারি বা নিরাপত্তাবাক্স থাকলে অতিরিক্ত টাকা, কার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সেখানে রেখে দিন। বাইরে বের হওয়ার সময় শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখুন।
১৩. পাসপোর্টের অনুলিপি রাখুন
সব সময় মূল পাসপোর্ট সঙ্গে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী তার অনুলিপি সঙ্গে রাখা যেতে পারে। পাসপোর্ট হারালে অনুলিপি পরবর্তী প্রক্রিয়ায় কাজে লাগতে পারে।
১৪. কম মালপত্র নিয়ে ভ্রমণ করুন
যত কম জিনিস সঙ্গে থাকবে, তত সহজে সেগুলোর দিকে নজর রাখা যাবে। বিশেষ করে বাস, ট্রেন কিংবা ভিড়ের জায়গায় হালকা ব্যাগ বহন করা সুবিধাজনক।
১৫. ছিনতাই হলে ঝুঁকি নেবেন না
ছিনতাইয়ের শিকার হলে নিজের জীবন ও শরীরের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। মূল্যবান জিনিস বাঁচাতে গিয়ে প্রতিরোধ করলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
১৬. রাতে দলবদ্ধভাবে চলুন
রাতে বাইরে ঘোরার ক্ষেত্রে একা না গিয়ে পরিচিতদের সঙ্গে থাকুন। বের হওয়ার সময় যেমন একসঙ্গে থাকবেন, ফেরার সময়ও একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করুন।
১৭. অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
অপরিচিত জায়গায় অতিরিক্ত মদ্যপান করলে নিজের চারপাশ সম্পর্কে সচেতনতা কমে যায়। এতে অপরাধীদের সহজ লক্ষ্য হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
১৮. নিজের পানীয়ের দিকে নজর রাখুন
আড্ডা বা অনুষ্ঠানে নিজের পানীয় অন্যের হাতে ছেড়ে রাখবেন না। অপরিচিত কেউ পানীয়তে ক্ষতিকর কিছু মিশিয়ে দিতে পারে।
১৯. রাতে নিরাপদ যানবাহন ব্যবহার করুন
রাতে অনুষ্ঠান বা আড্ডা শেষে একা ফেরার প্রয়োজন হলে পরিচিত ও নিরাপদ যানবাহন ব্যবহার করুন।
২০. নিবন্ধিত ট্যাক্সি ব্যবহার করুন
অপরিচিত এলাকায় যাতায়াতের সময় অনুমোদিত ও পরিচিত ট্যাক্সি ব্যবহার করা নিরাপদ। প্রয়োজনে হোটেল, রেস্তোরাঁ বা থাকার জায়গার কর্মীদের দিয়ে যানবাহন ডেকে নিতে পারেন।
২১. নিরাপদ যাতায়াতকে অগ্রাধিকার দিন
কিছু ক্ষেত্রে সস্তা যানবাহনের চেয়ে একটু বেশি খরচ করে নিরাপদ ও ভালো ব্যবস্থার যানবাহন বেছে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে দীর্ঘপথে যাতায়াতের সময় চালক ও যানবাহনের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
২২. ভ্রমণসঙ্গীকেও বুঝে নিন
আপনার ভ্রমণসঙ্গীর অসতর্ক আচরণ থেকেও বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপত্তার বিষয়ে যার সঙ্গে আপনার মতের মিল নেই, তার সঙ্গে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনা করুন।
২৩. নিজের মনের সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব দিন
কোনো জায়গা, ব্যক্তি, যানবাহন বা পরিস্থিতি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করলে বিষয়টি উপেক্ষা করবেন না। কিছু ভুল মনে হলে সরে আসাই নিরাপদ।
২৪. রাস্তায় টাকা বদলাবেন না
অপরিচিত মানুষের প্রস্তাবে রাস্তায় টাকা বদলানো ঝুঁকিপূর্ণ। কোথায় বৈধভাবে টাকা বদলানো যায়, তা আগে জেনে নিন।
২৫. ছোট নোট ব্যবহার করুন
লেনদেনের সময় বড় অঙ্কের টাকা দেখানো এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে ছোট নোট ব্যবহার করুন এবং টাকা পাওয়ার পর তা ঠিক আছে কি না দেখে নিন।
২৬. জরুরি নম্বর সঙ্গে রাখুন
পরিবার, ব্যাংক, চিকিৎসক, বিমা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জরুরি সেবার যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখুন। বিপদের সময় এতে দ্রুত সাহায্য চাওয়া সহজ হবে।
২৭. স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
স্থানীয় মানুষ কোনো এলাকার ভালো-মন্দ সম্পর্কে বেশি জানেন। থাকার জায়গার কর্মী বা বিশ্বস্ত স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে নিরাপদ স্থান ও যাতায়াত সম্পর্কে পরামর্শ নিতে পারেন।
২৮. থাকার জায়গাতেও সতর্ক থাকুন
চুরি শুধু রাস্তায় হয় না, হোটেল বা থাকার জায়গাতেও ঘটতে পারে। তাই মূল্যবান জিনিস নিরাপদ আলমারি বা নিরাপত্তাবাক্সে রাখুন।
২৯. দীর্ঘদিন থাকলেও অসতর্ক হবেন না
কোনো জায়গায় দীর্ঘদিন নিরাপদে থাকার পর অনেকেরই সতর্কতা কমে যায়। কিন্তু পরিচিত হয়ে গেলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয় না। তাই ভ্রমণের শেষ দিন পর্যন্ত সচেতন থাকুন।
৩০. ভয় নয়, সচেতনতা
ভ্রমণের উদ্দেশ্য ভয় পাওয়া নয়। বরং আগে থেকে কিছু বিষয় জানা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্ক থাকাই নিরাপদ ভ্রমণের মূল চাবিকাঠি। অপরিচিত মানুষ ও জায়গাকে সম্মান করুন, তবে নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে কখনো অসতর্ক হবেন না।
ভ্রমণে আনন্দের পাশাপাশি সামান্য সতর্কতাও অনেক বড় বিপদ এড়াতে পারে। তাই ব্যাগ গোছানোর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার প্রস্তুতিটাও সেরে নিন।
সূত্র: ব্যাক প্যাকার অর্গানাইজেশন
আরটিভি/জেএমএ


