
সংসার সামলানো মানেই শুধু রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা ঘর পরিষ্কার করা নয়। পরিবারের কে কখন কোথায় যাবে, কী বাজার করতে হবে, ফ্রিজে কী আছে, সন্তানের স্কুলের কাজ কখন—এমন অসংখ্য বিষয় মনে রাখা, পরিকল্পনা করা এবং আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্বও থাকে। এই অদৃশ্য দায়িত্বকেই বলা হয় ‘মানসিক বোঝা’।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরাই সংসারের এই অদৃশ্য মানসিক চাপ বেশি বহন করছেন।
ঘুমের সময়ও মাথায় ঘোরে কাজের তালিকা
তিন সন্তানের মা ৩৭ বছর বয়সী স্টেসি ম্যাথিউস নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তার মাথা সব সময় নানা চিন্তায় ভরা থাকে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও মনে মনে পরের দিনের কাজের তালিকা তৈরি করতে থাকেন তিনি।
এমন অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয়। সংসারের নানা ছোট-বড় বিষয় মনে রাখা ও সেগুলো ঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব অনেক পরিবারের নারীর ওপরই বেশি থাকে।
৭১ শতাংশ মানসিক শ্রম মায়েদের
বাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সমীক্ষায় ৩ হাজার অভিভাবকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিছানার চাদর ধোয়া থেকে শুরু করে ফ্রিজে কী খাবার আছে, তা খেয়াল রাখা—এ ধরনের প্রায় ৭১ শতাংশ মানসিক শ্রমের কাজ মায়েরাই একাই সামলান।
অন্যদিকে বাবাদের অনেক সময় গাড়ির দেখভালের মতো নির্দিষ্ট বা অনিয়মিত কিছু কাজের দায়িত্ব নিতে দেখা যায়।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিয়া রুপানা এই মানসিক বোঝাকে অদৃশ্য, স্থায়ী এবং সীমানাহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, থালাবাসন বা অন্য কোনো শারীরিক কাজ অফিসে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয় না। কিন্তু সংসারের এই মানসিক চাপ কর্মস্থলসহ সব জায়গাতেই সঙ্গে থাকে।
সন্তান জন্মের পর বাড়ে দায়িত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান জন্মের পর মায়েরা তুলনামূলক বেশি সময় ছুটিতে থাকায় শুরু থেকেই পরিবারের প্রধান অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে ফেলেন। পরে কাজে ফিরে গেলেও পরিবারের নানা তথ্য ও কাজের জন্য সবাই তার ওপর নির্ভর করতে থাকে।
লন্ডনের উপ-প্রধান শিক্ষক ও দুই সন্তানের বাবা স্যাম বেরি বলেন, শুরুতে তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। পরে তিনি বুঝতে পারেন, শুধু রাতের খাবার রান্না করাই দায়িত্ব নয়। ফ্রিজে কী আছে, কী বাজার করতে হবে এবং পরবর্তী খাবারের পরিকল্পনা করাও বড় ধরনের মানসিক কাজ।
ক্যারিয়ারেও পড়ছে প্রভাব
প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞ অনিতা ক্লিয়ারের মতে, সংসারের এই অদৃশ্য মানসিক চাপ নারীদের কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক নারী ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়ছেন, এমনকি চাকরি ছেড়ে দিতেও বাধ্য হচ্ছেন।
তার মতে, এই মানসিক চাপ কমানো সম্ভব হলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা ও কাজ করার শক্তি অনেকটাই বাড়বে।
কীভাবে কমবে এই অদৃশ্য চাপ?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংসারের মানসিক বোঝা কমাতে প্রথমেই সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। রাগ বা ক্ষোভের সময় কথা না বলে শান্ত পরিবেশে নিজের চাপ ও দায়িত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।
একই সঙ্গে কোনো একটি বিভাগের সব দায়িত্ব একজনের ওপর না দিয়ে ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা দরকার। যেমন—সন্তানের বিদ্যালয়সংক্রান্ত সব কাজ কিংবা পুরো বাজারের দায়িত্ব একজনের ওপর না রেখে দুজনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
পরিবারের সবার সুবিধার জন্য একটি যৌথ পঞ্জিকাও রাখা যেতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ, সন্তানের কাজ কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সবাই দেখতে পারবেন।
এছাড়া প্রতিদিন বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় সঙ্গীর সঙ্গে বসে কাজের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কোন কাজগুলো সত্যিই প্রয়োজনীয় আর কোনগুলো অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি করছে, সেটিও খতিয়ে দেখে কিছু কাজ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংসার দুজনের, চাপও ভাগ হওয়া দরকার
সংসারের দায়িত্ব শুধু দৃশ্যমান কাজ ভাগ করে নিলেই শেষ হয় না। কে কাজটির কথা মনে রাখবে, পরিকল্পনা করবে এবং সময়মতো তা করাবে—এই মানসিক দায়িত্বও সমানভাবে ভাগ করা জরুরি।
কারণ, ঘরের কাজ চোখে দেখা গেলেও তার পেছনে থাকা চিন্তা, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির চাপ অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়। সেই অদৃশ্য চাপ কমাতে দায়িত্ব ভাগাভাগির পাশাপাশি একে অপরের কাজ ও মানসিক অবস্থার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আরটিভি/জেএমএ


