
প্রিয়জন হারানোর কষ্টের কোনো সহজ সমাধান নেই। শোকাহত বন্ধু বা স্বজনকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবেন, অনেক সময় সেটিও বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তার কষ্ট দূর করে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে পাশে থাকা, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় ছোট ছোট কাজে সহযোগিতা শোকের সময়টিকে কিছুটা সহজ করে তুলতে পারে।
একটি চিঠি পাঠানো, রান্না করা খাবার নিয়ে যাওয়া কিংবা নিয়মিত ফোন করে খোঁজ নেওয়ার মতো ছোট উদ্যোগও শোকাহত মানুষের কাছে অনেক অর্থবহ হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যেক মানুষের শোকের ধরন আলাদা। তাই তাকে নিজের মতো করে শোক কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে।
মৃত ব্যক্তির কথা বলতে ভয় পাবেন না
প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তার নাম বা স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে অনেকে দ্বিধায় থাকেন। কিন্তু মৃত ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করলে শোকাহত মানুষ আরও কষ্ট পাবেন—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বরং প্রিয় মানুষটির কথা বলা, তার সঙ্গে কাটানো স্মৃতি মনে করা কিংবা তাকে কতটা মনে পড়ছে তা বলা শোকাহত ব্যক্তির জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
শুধু প্রচলিতভাবে আপনার ক্ষতির জন্য দুঃখিত বলার চেয়ে, তাকে আমিও খুব মনে করব—এ ধরনের আন্তরিক কথা অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।
‘কেমন আছেন?’ না বলে জিজ্ঞেস করুন অনুভূতির কথা
শোকের মধ্যে থাকা কাউকে স্বাভাবিকভাবে ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করলে প্রশ্নটির উত্তর অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে যায়। কারণ প্রিয়জন হারানোর পর যে তিনি ভালো নেই, সেটি অনেকটাই স্পষ্ট।
এর পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আজ কেমন অনুভব করছেন?’
এতে তার বর্তমান অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয় এবং তিনি চাইলে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন।
মিথ্যা আশ্বাস নয়, দিন ভরসা
শোক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে। তাই ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ ধরনের দ্রুত আশ্বাস না দিয়ে তাকে বোঝানো ভালো যে প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নিয়ে শোক করার অধিকার তার আছে।
যেমন বলা যেতে পারে, ‘তোমার যতদিন সময় লাগে, ততদিন শোক করো। তুমি শক্ত মানুষ, ধীরে ধীরে এই সময়টা পার হয়ে উঠতে পারবে।’
এতে একদিকে তার কষ্টকে স্বীকার করা হয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভালো হওয়ার ব্যাপারে আশ্বাসও দেওয়া হয়।
তবে খুব হালকাভাবে বা তাড়াহুড়ো করে আশ্বস্ত করা উচিত নয়। এতে শোকাহত মানুষ নিজেকে আরও একা মনে করতে পারেন।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ পরও খোঁজ নিন
প্রিয়জনের মৃত্যুর পর প্রথম দিকে অনেকেই পাশে থাকেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর অনেকের যোগাযোগ কমে যায়।
এই সময়টিই শোকাহত ব্যক্তির জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রথম কয়েক সপ্তাহের পরও নিয়মিত ফোন করা, দেখা করা কিংবা শুধু খোঁজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক শোকাহত মানুষের পক্ষে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া কঠিন হয়। তাই তাদের কাছ থেকেই যোগাযোগের অপেক্ষায় না থেকে আপনিই উদ্যোগ নিতে পারেন।
‘কিছু লাগলে বলবেন’ না বলে নির্দিষ্ট সাহায্য করুন
শোকাহত কাউকে শুধু ‘কিছু দরকার হলে বলবেন’ বললে অনেক সময় সাহায্যের দায়িত্ব তার ওপরই চলে যায়। তিনি হয়তো সংকোচে কিছু চাইবেন না।
এর পরিবর্তে নির্দিষ্টভাবে সাহায্যের কথা বলা ভালো।
যেমন—রান্না করে খাবার নিয়ে যাওয়া, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো, ফোন ধরা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে সঙ্গে থাকা।
পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সময়েও সহযোগিতা করা যেতে পারে। যেমন সম্পত্তি বা আইনি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ কেউ সাহায্য করতে পারেন। বাড়িঘরের প্রয়োজনীয় কাজেও সহযোগিতা করা যেতে পারে।
খাবারের বিষয়েও পাশে থাকুন
প্রিয়জন হারানোর পর অনেকেরই নিয়মিত খাবার তৈরি, বাজার করা কিংবা একা খাওয়ার নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়।
বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীকে হারানো মানুষের জন্য একা একজনের খাবারের পরিকল্পনা করা, বাজার করা ও রান্না করা বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে।
তাই রান্না করে খাবার পৌঁছে দেওয়া, বাজার করে দেওয়া কিংবা রান্নার কাজে সহযোগিতা করা কার্যকর সাহায্য হতে পারে।
পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে মন দিয়ে শুনুন
শোকাহত মানুষের পাশে থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি হলো তার কথা মন দিয়ে শোনা।
অনেক সময় মানুষ একই ঘটনা বা একই স্মৃতি বারবার বলতে পারেন। কিন্তু বারবার একই কথা বলা শোক ও মানসিক আঘাত সামলে ওঠার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
তাই একই গল্প বারবার শুনতে হলেও বিরক্ত না হয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি না চাইতেই দ্রুত কোনো পরামর্শ দিতে যাবেন না। অনেক সময় শোকাহত মানুষের প্রয়োজন সমাধান বা পরামর্শ নয়, বরং এমন একজন মানুষ, যিনি তার কথা বুঝতে চেষ্টা করবেন এবং নীরবে শুনবেন।
শোকের সময় বিচার করবেন না
প্রিয়জন হারানোর পর একজন মানুষের জীবন ও অনুভূতির জগৎ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। কেউ দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারেন, আবার কারও অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
তাই ‘এখন তো স্বাভাবিক হওয়া উচিত’ কিংবা ‘এবার এগিয়ে যেতে হবে’—এ ধরনের কথা বলা ঠিক নয়।
‘কাঁদো’ বা ‘এবার এগিয়ে যাও’—এ ধরনের নির্দেশনাও শোক কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক নয়।
প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী শোক কাটিয়ে ওঠেন। তাই তাকে নিজের গতিতে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা
শোকের কষ্ট অন্য কেউ দূর করে দিতে পারেন না। তবে একজন মানুষকে একা সেই কষ্ট বহন করতে না দেওয়ার চেষ্টা করা যায়।
মৃত ব্যক্তির কথা বলা, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় কাজে সাহায্য করা, খাবারের ব্যবস্থা করা কিংবা শুধু নীরবে পাশে বসে শোনা—এসব ছোট উদ্যোগই শোকাহত মানুষের কাছে বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, তার শোককে সম্মান করা এবং তাকে নিজের মতো করে সময় নিয়ে এই কঠিন সময় পার করার সুযোগ দেওয়া।
সূত্র: হার্ভার্ড
আরটিভি/জেএমএ


