ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

দুশ্চিন্তায় অস্থির? মস্তিষ্ক শান্ত রাখতে প্রতিদিন করুন এই অভ্যাস 

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
নিয়মিত ধ্যান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন মানসিক চাপ ও উদ্বেগ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

ব্যস্ততা, কাজের চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা নানা দুশ্চিন্তায় অনেক সময় মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় নিজেকে কিছুটা শান্ত রাখতে ধ্যান হতে পারে কার্যকর একটি উপায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধ্যান শুধু সাময়িকভাবে মন শান্ত করে না, বরং ভয় ও উদ্বেগ সামলানোর সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের কিছু অংশের গঠন ও সংযোগেও পরিবর্তন আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী গবেষক এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সারা লাজার দীর্ঘদিন ধরে ধ্যান ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন।

লাজারের নিজের নিয়মিত ধ্যানের একটি ধরন হলো ‘সচেতন উপস্থিতি’। এতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা চিন্তার ওপর মন আটকে না রেখে নিজের সচেতনতা ও ভেতরের অনুভূতিগুলো লক্ষ্য করা হয়।

তিনি বলেন, এই ধরনের অনুশীলনের মাধ্যমে এমন সূক্ষ্ম চিন্তা ও আবেগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায়, যেগুলো সাধারণত আমরা খেয়াল করি না। অথচ এগুলো নিজের মানসিক অবস্থাকে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ধ্যান আসলে কী?

অনেকে ধ্যান বলতে শুধু চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকাকে বোঝেন। তবে ধ্যানের ধরন আরও অনেক বেশি।

কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া, ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, নির্দেশনা অনুসরণ করে ধ্যান করা, মন্ত্র জপ করা কিংবা নিজের শরীরের বিভিন্ন অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়াও ধ্যানের অংশ হতে পারে।

এসব অনুশীলনের মূল বিষয় হলো বর্তমান মুহূর্ত সম্পর্কে সচেতন থাকা। নিজের অনুভূতি ও চিন্তাগুলোকে লক্ষ্য করা এবং অপ্রয়োজনীয় বা বিরক্তিকর চিন্তা এলে সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনা।

নিয়মিত ধ্যানে সাধারণত কিছু সময় ধীর হওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল রাখা এবং নিজের ভেতরের অভিজ্ঞতাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।

লাজারের মতে, ধ্যানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা।

মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন আনে?

মস্তিষ্কের ভেতরে বাদামের মতো দেখতে একটি অংশ রয়েছে, যার নাম অ্যামিগডালা। ভয়, উদ্বেগসহ বিভিন্ন আবেগ তৈরির ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে এই অংশটি জড়িত।

লাজার ও তার সহকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে দেখেছেন, ধ্যানের একটি বিশেষ পদ্ধতি—সচেতনতা-ভিত্তিক মানসিক চাপ কমানোর অনুশীলন—প্রায় দুই মাস চর্চার পর অ্যামিগডালায় পরিবর্তন আনতে পারে।

এই অনুশীলনের মধ্যে ছিল প্রতি সপ্তাহে দলগত বৈঠক এবং প্রতিদিন বাড়িতে ধ্যান ও যোগব্যায়াম করা।

গবেষণায় মিলেছে কী তথ্য?

একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করেন এমন ২৬ জনকে আট সপ্তাহের এই অনুশীলনে রাখা হয়।

আট সপ্তাহ পর তাদের মস্তিষ্কের ছবি পরীক্ষা করে দেখা যায়, অ্যামিগডালার ঘনত্ব কমেছে। মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের নিজের বলা মানসিক চাপ কমে যাওয়ার তথ্যেরও সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এরপর গবেষকেরা আরও একটি গবেষণা করেন। এতে অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগে ভোগা ২৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের একদলকে সচেতনতা-ভিত্তিক মানসিক চাপ কমানোর অনুশীলন করানো হয়, আর অন্যদলকে মানসিক চাপ সামলানোর বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে ২৬ জন সুস্থ ব্যক্তির তুলনাও করা হয়।

গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের রাগী ও স্বাভাবিক মুখের ছবি দেখানো হয় এবং বিশেষ মস্তিষ্ক-পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম দেখা হয়।

দেখা যায়, উদ্বেগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা স্বাভাবিক মুখের ছবিতেও সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি সক্রিয় হচ্ছিল। অর্থাৎ, হুমকি না থাকা অবস্থাতেও তাঁদের মস্তিষ্কে ভয় বা সতর্কতার প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক বেশি ছিল।

কিন্তু আট সপ্তাহের অনুশীলনের পর তাঁদের মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা ও সামনের মস্তিষ্কের অংশের মধ্যে সংযোগ বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের এই সামনের অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একই সঙ্গে দেখা যায়, স্বাভাবিক মুখের ছবির ক্ষেত্রে তাঁদের অ্যামিগডালা আগের মতো ভয়ভিত্তিক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। অংশগ্রহণকারীরাও উদ্বেগের উপসর্গ কমার কথা জানান।

গবেষক লাজারের মতে, ধ্যান হয়তো মস্তিষ্কের এমন প্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে, যেখানে কোনো বিষয়কে হুমকি মনে হলে অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে।

দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে কাজে আসে?

ধ্যানের উপকার শুধু ধ্যান করার সময়েই সীমাবদ্ধ নয়। কাজের চাপ, পরিবারের সঙ্গে ঝামেলা কিংবা মন খারাপ করা কোনো খবর—এসব পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব কাজে লাগতে পারে।

লাজারের মতে, নিজের চিন্তা ও আবেগকে কিছুটা দূর থেকে লক্ষ্য করার অভ্যাস তৈরি হলে চাপের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পরিস্থিতিকে সচেতনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি বা পরিস্থিতি আপনাকে চাপ দিচ্ছে, সেটি হয়তো বদলাবে না। তবে সেই পরিস্থিতির প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া বদলাতে পারে।

এটি উদাসীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের মনের ভেতর একই চিন্তা বারবার ঘুরতে থাকলে সেটি বুঝতে পারা এবং সেই চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করা।

ধ্যান শুরু করবেন যেভাবে

যারা আগে কখনো ধ্যান করেননি, তাদের জন্য লাজার তিন মিনিটের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দেন। এতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ধ্যানের মৌলিক কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা যায়।

এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যেতে পারে। চাইলে বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশেও ধ্যান করা যায়। ধ্যান শেষে নিজের অনুভূতি কেমন ছিল, সেটিও খেয়াল করা যেতে পারে।

একটানা দীর্ঘ সময় ধ্যান করার পাশাপাশি দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প সময়ের জন্যও এটি করা যায়। যেমন, দিনে চার-পাঁচবার মাত্র তিন মিনিট করে শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

এমনকি প্রতিদিনের সাধারণ কাজকেও সচেতনতার অনুশীলন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যেমন দরজার হাতল ধরার সময় কয়েক সেকেন্ড থেমে হাতে তার অনুভূতি কেমন লাগছে, তা খেয়াল করা।

অফিস থেকে গাড়ির দিকে হাঁটার সময় ভবিষ্যতে কী কাজ করতে হবে তা নিয়ে ভাবার পরিবর্তে পায়ের নিচের মাটি, চারপাশের আলো-বাতাস বা শরীরের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

ছোট অনুশীলন, বড় পরিবর্তন

গবেষণাগুলো বলছে, ধ্যান শুধু মনকে সাময়িকভাবে শান্ত করার একটি উপায় নয়; নিয়মিত অনুশীলনের সঙ্গে ভয়, উদ্বেগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

তাই ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন কয়েক মিনিট থেমে নিজের শ্বাস, চিন্তা ও অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস মানসিক চাপ সামলানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।

সূত্র: হার্ভার্ড

আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ব্যায়ামেই বাড়ে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি
শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়ামের গুরুত্ব অনেক। নিয়মিত ব্যায়াম পেশির শক্তি ধরে রাখে, হৃদ্‌যন্ত্র ভালো রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ব্যায়ামেই বাড়ে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি
মাটিতে খেললেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে? জানুন গবেষণা
শহরের ব্যস্ত জীবনে শিশুদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ দিন দিন কমছে। কংক্রিটের ভবন, ব্যস্ত রাস্তা আর চার দেয়ালের মধ্যেই বড় হচ্ছে অনেক শিশু।
মাটিতে খেললেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে? জানুন গবেষণা
ছুটিতে গিয়েও কেন মনে পড়ে অফিসের কথা
ছুটি মানেই অফিসের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে ছুটিতেও অফিস যেন পিছু ছাড়ে না।
ছুটিতে গিয়েও কেন মনে পড়ে অফিসের কথা
জেনে নিন পুরুষের ৩ গোপন রোগ ও চিকিৎসা
পুরুষদের কিছু শারীরিক ও যৌন স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, যা নিয়ে অনেকেই লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে চান না।
জেনে নিন পুরুষের ৩ গোপন রোগ ও চিকিৎসা
টানা ৯-১০ ঘণ্টা ডেস্ক জব, শরীরের জন্য জরুরি এই ৩ রক্তপরীক্ষা
সকাল থেকে অফিস, টানা ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা বসে কাজ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটছে চেয়ারে। বাড়ি ফেরার পরও বিশ্রাম ছাড়া তেমন নড়াচড়া নেই।
টানা ৯-১০ ঘণ্টা ডেস্ক জব, শরীরের জন্য জরুরি এই ৩ রক্তপরীক্ষা