
রাতে বিছানায় শুয়ে আছেন, কিন্তু পায়ে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। কখনো জ্বালাপোড়া, কখনো চুলকানি, আবার কখনো মনে হচ্ছে পায়ের ভেতর দিয়ে কিছু একটা হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই স্থির থাকতে পারছেন না। বারবার পা নাড়াতে হচ্ছে। পা নড়াচড়া করলেই আবার কিছুটা স্বস্তি মিলছে।
এমনটা নিয়মিত হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এর পেছনে থাকতে পারে অস্থির পা সিনড্রোম।
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর, অস্থির পা সচেতনতা দিবস। এই সমস্যাটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রতিবছর দিনটি পালন করা হয়। রাতে বিশ্রামে থাকার সময় পায়ে অস্বস্তি এবং পা নাড়ানোর তীব্র ইচ্ছা এই সমস্যার অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অনেকের ক্ষেত্রে এর কারণে ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটে।
অস্থির পা সিনড্রোম কী
এটি স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নড়াচড়াজনিত সমস্যা। সাধারণত বিশ্রামে থাকা অবস্থায় পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি হয়। সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য পা নাড়ানোর প্রবল ইচ্ছা হয়।
সন্ধ্যা ও রাতে উপসর্গ বেশি দেখা দেওয়ায় অনেকের ঘুমের সমস্যা হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৭ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়।
তাই এই রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই অস্থির পা সচেতনতা দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২৩ সেপ্টেম্বর কেন সচেতনতা দিবস
অস্থির পা সচেতনতা দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১২ সালে। দিনটি সুইডেনের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কার্ল-অ্যাক্সেল একবর্নের জন্মদিনের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৯০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই চিকিৎসক ১৯৪৫ সালে প্রথম অস্থির পা সিনড্রোমের বৈশিষ্ট্য ও উপসর্গ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে দিনটি পালনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। এরপর থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
কেন হয় এই সমস্যা
অস্থির পা সিনড্রোমের মূল কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যক্রম, শরীরে আয়রনের মাত্রা এবং শিরাসংক্রান্ত কিছু সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে।
কিছু ওষুধ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও এই রোগের সম্পর্ক থাকতে পারে।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না
অস্থির পা সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পায়ে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, ঝিমঝিম করা কিংবা পোকা হাঁটার মতো অনুভূতির কথা বলতে পারেন।
কারও ক্ষেত্রে পায়ে বারবার ঝাঁকুনি বা অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়াও দেখা দিতে পারে। সাধারণত দীর্ঘ সময় বসে থাকা কিংবা শুয়ে থাকার সময় অস্বস্তি বাড়ে। পা নড়াচড়া করলে কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি পাওয়া যায়।
খুব কম ক্ষেত্রে পায়ের পাশাপাশি হাতেও একই ধরনের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় অস্থির পা সিনড্রোমের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করান এমন ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যেতে পারে।
বংশগতিরও ভূমিকা থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও একই ধরনের সমস্যার ইতিহাস রয়েছে। তবে পরিবারের কারও এই রোগ থাকলেই অন্য সদস্যেরও রোগটি হবে, এমনটা নিশ্চিত নয়।
হালকা শরীরচর্চায় মিলতে পারে স্বস্তি
অস্থির পা সিনড্রোমের কিছু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে হালকা শরীরচর্চা সহায়ক হতে পারে। চিকিৎসক বা শারীরিক পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা টান দেওয়ার ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, সাঁতার কিংবা সাইকেল চালানোর মতো পরিমিত শরীরচর্চা করা যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
রাতে নিয়মিত পা নাড়ানোর তীব্র ইচ্ছা, পায়ে অস্বস্তি, জ্বালাপোড়া বা ঝিমঝিম ভাবের কারণে ঘুমের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে চিকিৎসক উপসর্গের কারণ খুঁজে দেখবেন এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। এই রোগের স্থায়ী নিরাময়ের উপায় নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে উপসর্গ কমানোর বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে।
তাই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সমস্যাটি নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি
অস্থির পা সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় নিজের সমস্যাটি ঠিকভাবে বোঝাতে পারেন না। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে যেতে সহায়তা করা উচিত।
সচেতনতা বাড়লে এই অস্বস্তিকর সমস্যাটি দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরটিভি/জেএমএ


