
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে বয়সের তুলনায় দ্রুত দেখা দিতে পারে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, ত্বকে বলিরেখা কিংবা ঘুমের সমস্যা। এসব লক্ষণ কখনো কখনো শরীরের জৈবিক বয়স বা ‘বায়োলজিক্যাল এজ’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
জন্মতারিখ অনুযায়ী বয়সকে বলা হয় কালানুক্রমিক বয়স। অন্যদিকে, শরীরের কোষ, টিস্যু ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা বিবেচনায় যে বয়সের ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো জৈবিক বয়স। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও পরিবেশের প্রভাব এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু শারীরিক পরিবর্তন খেয়াল করলে বয়সজনিত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া সম্ভব। বয়সের তুলনায় শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে এমন আটটি লক্ষণ জেনে নেওয়া যাক।
১. বোতল বা বয়ামের ঢাকনা খুলতে কষ্ট হওয়া
আগের মতো সহজে শক্ত ঢাকনা খুলতে পারছেন না কিংবা ভারী ব্যাগ বহন করতে কষ্ট হচ্ছে? হাতের মুঠোর শক্তি বা ‘হ্যান্ড গ্রিপ স্ট্রেন্থ’ কমে যাওয়ার কারণে এমন হতে পারে। হাতের মুঠোর শক্তি শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থভাবে বয়স বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নিয়মিত ব্যায়াম এবং পেশির শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
২. সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হওয়া
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় আগের চেয়ে বেশি হাঁপিয়ে যাওয়া বা পায়ে শক্তি না পাওয়া শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। সিঁড়ি ভাঙতে পেশির শক্তি, ভারসাম্য ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়সের সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি কমে যাওয়ার সমস্যাকে বলা হয় ‘সারকোপেনিয়া’।
৩. হাঁটার গতি কমে যাওয়া
আগের তুলনায় হাঁটার গতি কমে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। হাঁটার গতি পায়ের পেশি, স্নায়ু এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বয়স বাড়ার সঙ্গে হাঁটার গতি কমতে পারে। তবে হঠাৎ বা অস্বাভাবিকভাবে গতি কমে গেলে এর পেছনে অন্য শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।
৪. ভারসাম্য রাখতে হাতল ধরতে হওয়া
হাঁটার সময় কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় ভারসাম্য ধরে রাখতে রেলিং বা অন্য কিছুর ওপর বেশি নির্ভর করতে হলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। পেশির দুর্বলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা কিংবা স্নায়ু ও পেশির সমন্বয়ে ঘাটতির কারণে এমন হতে পারে। ভারসাম্য কমে গেলে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
৫. রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া
বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় জেগে থাকা ঘুমের মান খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রায় ১২ হাজার মানুষের ঘুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘুমের ধরন ও জৈবিক বয়সের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তবে ঘুমের সমস্যা মানেই দ্রুত বার্ধক্য নয়; মানসিক চাপ, ওষুধ কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
ঘুমের মান উন্নত করতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগা এবং ঘুমের আগে ক্যাফেইন ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।
৬. প্রিয় পোশাকের ফিট বদলে যাওয়া
ওজন খুব বেশি না বাড়লেও কোমরের কাছে পোশাক আঁটসাঁট হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরের অন্য অংশে ঢিলেঢালা মনে হওয়া শরীরের গঠনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির ভর কমে এবং পেটের আশপাশে চর্বি জমতে পারে। পেটের অতিরিক্ত চর্বি হৃদ্রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
৭. শরীরে অকারণে কালশিটে পড়া
সামান্য আঘাতেই কালশিটে পড়লে ত্বকের অবস্থা ও অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খেয়াল করা জরুরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বক পাতলা হতে পারে এবং রক্তনালি সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শেও ত্বকের ক্ষতি হয়। তবে অকারণে ঘন ঘন কালশিটে পড়া, বড় কালশিটে তৈরি হওয়া কিংবা রক্তপাতের মতো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৮. ত্বকে দ্রুত বয়সের ছাপ পড়া
ত্বকে বলিরেখা, কুঁচকে যাওয়া ও কালচে দাগ বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশ। তবে এসব পরিবর্তন প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত দেখা দিলে জীবনযাপন ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ, ধূমপান, বায়ুদূষণ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ত্বকের বয়সজনিত পরিবর্তন ত্বরান্বিত করতে পারে।
ত্বক সুরক্ষায় নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা সহায়ক।
বয়সের ছাপ কমাতে কী করবেন?
সুস্থভাবে বয়স বাড়ার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা, পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ওজন, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, এই আটটি লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলেই যে শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। এগুলো জৈবিক বয়স নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা নয়; বরং শারীরিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য সংকেত। কোনো লক্ষণ হঠাৎ দেখা দিলে, ক্রমাগত বাড়তে থাকলে বা দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: দ্য হেলদি
আরটিভি/এসকে


