রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর যেভাবে পতন ঘটে ‘বিদ্রোহী’ মঞ্জুরের

আরটিভি নিউজ 

বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ , ০৩:১৩ পিএম


রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর যেভাবে পতন ঘটে ‘বিদ্রোহী’ মঞ্জুরের
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফাইল ছবি

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে ভয়ংকর এক সামরিক অভ্যুত্থানে নৃশংসভাবে খুন হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখল করে নেন তারই এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর জেনারেল মঞ্জুর। 

বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোচিত এই ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করেছিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার গঠিত এক কমিশন। কখনও প্রকাশ না পাওয়া সেই কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পেয়েছে ডেইলি স্টার। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং এর আগে-পরের বিভিন্ন বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।  

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন মঞ্জুর। তখন দুজনই মেজর ছিলেন। সহকর্মী হওয়ার পাশাপাশি তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন।

১৯৮১ সালের ২ জুন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড তদন্তের দায়িত্ব এই কমিশনকে দেওয়া হয়নি। আত্মসমর্পণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল তাকে।

তবে, সামরিক বাহিনীর ১৯ জনসহ মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং প্রতিবেদনের কয়েকটি অধ্যায়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ভূমিকা ও তার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উঠে এসেছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে তিক্ত হয়ে ওঠে এবং দুজনের মধ্যে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ পেতে থাকে। মেজর জেনারেল মঞ্জুর রাষ্ট্রপতির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করেন এবং এমনকি অন্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে তার প্রতি অসম্মানও দেখান।

জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কমিশন বলে, রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম সফরের কথা জানার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুর ক্ষমতা দখলের উচ্চাভিলাষ পূরণে চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।

আরও পড়ুন

কমিশন আরও বলেছে, ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এবং চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে জেনারেল মঞ্জুর সমমনা কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে সেখানে পদায়নের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করছিলেন।

কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মঞ্জুর মনে করতেন, ‘সব অন্যায় দূর করার একমাত্র উপায় ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করা, সেটার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে হলেও।’

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ২৫ মে মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশ দিয়েছিলেন। 

কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ওপর যার কমান্ড ছিল এবং যিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন, এমন একজন জেনারেল শিক্ষকতার এ ধরনের দায়িত্ব পেয়ে কেমন অনুভব করতে পারেন, তা বোঝা কঠিন নয়। আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে উদ্ধত ওই জেনারেলের মনে হয়েছিল, প্রতিপক্ষ প্রথম আঘাত হেনেছে এবং এবার তার সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত করার সময় এসেছে।

ডিরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের চট্টগ্রাম ডিটাচমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু লাইস চৌধুরী কমিশনকে জানান, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে হতাশার মনোভাব তিনি লক্ষ্য করেছিলেন।

তিনি বলেন, মেজর জেনারেল মঞ্জুর একে একে সমমনা কর্মকর্তাদের বদলি করে চট্টগ্রাম গ্যারিসনে নিয়ে আসেন। নিজের প্রতিবেদনগুলোতে তিনি চট্টগ্রাম থেকে এসব সমমনা কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।

ওই কর্মকর্তা কমিশনকে জানান, ১৯৮০ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে একটি বৈঠক হয়েছিল, যেখানে জওয়ানরা তাদের ক্ষোভ ও অভিযোগ তুলে ধরেন। তখন জেনারেল মঞ্জুর উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, বর্তমান অবস্থানে থেকে তাদের দাবি পূরণ করা তার ক্ষমতার মধ্যে নেই—যার মধ্য দিয়ে তার নিজের মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জেনারেল মঞ্জুর ওই ডিজিএফআই কর্মকর্তার সেনানিবাসে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করতেন। তাকে এমপি চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে হতো এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে অনুসরণ করতেন। যার ফলে তিনি আসলে অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর হত্যাকারীরা সার্কিট হাউস ছেড়ে গেলে তৎপরতার কেন্দ্র সরে যায় সেনানিবাসের ডিভিশন সদরদপ্তরে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর থেকেই মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে তার কার্যালয়ে বসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, দীর্ঘ নোট লিখতে এবং মাঝেমধ্যে নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। তিনিই যে সবকিছুর মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কারো মনে কোনো সন্দেহ রাখেননি।

রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে সদ্য ফিরে আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে দৃশ্যমান উচ্ছ্বাস ছিল। তবে অন্য যারা ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না, তারা ক্রমেই কৌতূহলী হয়ে উঠছিলেন।

হত্যাকারীরা নিজেদের মধ্যে দামি বিদেশি সিগারেট বিলি করছিলেন এবং তাদের কেউ একজন নিজেদের “গৌরবময় বিপ্লবের” খবর শোনার জন্য একটি বড় রেডিও সেট নিয়ে আসতে বলছিলেন।

আরও পড়ুন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে রেডিও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়, আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন। কাউন্সিলের সদস্য কারা ছিলেন, তা মঞ্জুর প্রকাশ করেননি। সকাল ১০টার দিকে মেজর জেনারেল মঞ্জুর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন আহমেদকে সেনানিবাসে ডেকে পাঠান। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমান সেনানিবাসে নিয়ে যান। সেখানে মঞ্জুর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের জানান, আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেজর জেনারেল মঞ্জুর তাদের কিছু নির্দেশনা দেন এবং বলেন, তারা শুধু তার কাছ থেকেই নির্দেশ নেবেন এবং সেসব নির্দেশ অবশ্যই পালন করতে হবে। জিওসির কার্যালয়ে সমবেত প্রত্যেক কর্মকর্তাকে পবিত্র কোরআন স্পর্শ করিয়ে বিপ্লবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করানো হয়।

তাদের জানানো হয়, পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় আদালত ভবনে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান, ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং রেলওয়ে ও বন্দরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হবে। পরদিন ৩১ মে সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে মেজর জেনারেল মঞ্জুর আদালত ভবনে পৌঁছান এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বক্তব্য দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বক্তব্যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর বৈঠকে উপস্থিত সবাইকে ঢাকা বেতারের সম্প্রচার না শুনতে বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তার হাতে এবং ঢাকাকে তার দাবির কাছে নতি স্বীকার করতেই হবে।

অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি না দিতে এবং ঢাকায় কোনো পেট্রোল না পাঠাতে বলেন। রেডিও বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালককে দেওয়া নির্দেশনা মেনে ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার চালু রাখতে বলেন। স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। দুপুর প্রায় ১টায় তিনি আদালত ভবন ত্যাগ করেন।

যদিও তার এই সরকার বেশিক্ষণ টেকেনি। সেই রাতেই পতন ঘটে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সেনাসদর দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা ৩১ মে রাতের প্রথম ভাগে শুরু হয় এবং ১ জুন রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে।

মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নির্দেশে তিনিই বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রধান আলোচক ছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো শর্ত মেনে নিতে সেনাসদর দপ্তর প্রস্তুত ছিল না। মনে হচ্ছিল বিদ্রোহী নেতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন এবং মধ্যরাতের পর তিনি নিজেই চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফের সঙ্গে কথা বলেন।

কমিশন দেখতে পায়, বিদ্রোহী সরকারের পরিকল্পনা ছিল দুর্বল। ঘটনার পর থেকে উদ্ভূত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে সার্কিট হাউসে অভিযানটির প্রকৃত পরিকল্পনা তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছিল না। রাষ্ট্রপতিকে হত্যা থেকে শুরু করে সপরিবারে মেজর জেনারেল মঞ্জুর ধরা পড়া পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত অপেশাদার এবং অনেকটা শিক্ষানবিশদের মহড়ার মতো।

১৯৮১ সালের ১ জুন রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তার পরিবার, তার অন্য সহযোগীরা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ার হোসেনের পরিবার দুটি জিপ ও একটি পিকআপ ট্রাকে করে সেনানিবাস ত্যাগ করে হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি হয়ে এগিয়ে যান। মেজর এস এম খালেদ ও মেজর রওশন ইয়াজদানি ভূঁইয়া সার্কিট হাউস অভিযানে আহত ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাদের দুই সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি মেজর এ কে এম রেজাউল ইসলাম ও মেজর এ জেড গিয়াসউদ্দিন গাড়ি ফেলে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার আরও গভীরে রওনা দেন। ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম এনএসআইয়ের উপসহকারী পরিচালক আব্দুস সাত্তারকে জানান, বিদ্রোহীরা পালিয়ে গেছে।

বিদ্রোহী নেতাকে খুঁজে বের করতে তিনি দুই ফিল্ড অফিসার ও একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে সকাল সাড়ে ৭টায় গাড়িতে রওনা হন এবং এক ঘণ্টা পর ফটিকছড়ি থানায় পৌঁছান। সেখানে তিনি আহত দুই বিদ্রোহী লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজলে হুসেইন ও ক্যাপ্টেন জামিল হককে দেখতে পান। পালানোর সময় তাদের সঙ্গে নেওয়া হলেও পরে দলটি গাড়ি ফেলে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করায় আহত দুজনকে ফেলে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আহত বিদ্রোহীরা আব্দুস সাত্তারকে জানান, মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যরা মানিকছড়ির দিকে যাচ্ছেন। সেই তথ্য অনুযায়ী সাত্তারের দলও সেদিকে রওনা হয়। পথে তারা ফেলে যাওয়া সামরিক যানবাহনগুলো দেখতে পান। দলটি স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে আরও জানতে পারে, সামরিক পোশাক পরা দুই কর্মকর্তা কয়েকজন নারী ও শিশুকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে এশিয়া টি গার্ডেনের দিকে গেছেন।

অতিরিক্ত সহায়তা নিতে সাত্তার ফটিকছড়ি থানায় ফিরে যান এবং পুলিশ সঙ্গে নিয়ে এশিয়া টি গার্ডেনের উদ্দেশে রওনা হন। দলটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে এশিয়া টি গার্ডেন ও এর আশপাশে তল্লাশি শুরু করে। দুপুর প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে তারা খবর পান, কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে নারী ও শিশুদের সঙ্গে এশিয়া টি গার্ডেনের ২ নম্বর গেটের কাছে চা-বাগানের শ্রমিক মনু মিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে দেখা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা সেখানে গিয়ে জায়গাটি ঘিরে ফেলেন। পুলিশের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে মেজর জেনারেল মঞ্জুর হাতে একটি চীনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তল্লাশি দল তাকে আত্মসমর্পণ না করলে হত্যার হুমকি দেয় এবং আত্মসমর্পণ করতে বলে। মঞ্জুর অস্ত্র নামিয়ে নেন এবং কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন।

মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও চার সন্তান, মেজর রেজা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তার তিন মেয়েকে আটক করে দুটি জিপে তোলে পুলিশ। তাদের প্রধান সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও সবচেয়ে ছোট সন্তানকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তোলা হয়। বাকিরা জিপেই থাকেন। এনএসআই কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার ওঠেন মঞ্জুরের সঙ্গে ওই গাড়িতে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হাটহাজারী থানায় পৌঁছান। তবে চট্টগ্রাম শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে করেননি। বিদ্রোহী নেতা ধরা পড়ার খবরে সেখানে বিপুল জনসমাগম হয় এবং পুলিশ চট্টগ্রাম রেঞ্জ থেকে অতিরিক্ত জনবল চায়। এক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার ও রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক সেখানে পৌঁছান। একই সময় ক্যাপ্টেন এমদাদুল হকও সেখানে উপস্থিত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক ডিআইজিকে অনুরোধ করেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যদের যেন তাদের হেফাজতে তুলে দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মঞ্জুরকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে কি না, সে বিষয়ে ঢাকা থেকে অনুমোদন নেওয়ার অনুরোধ জানান। পুলিশকে হস্তান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তারা মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও সন্তানদের, মেজর রেজা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তার তিন মেয়েকে ক্যাপ্টেনের কাছে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের প্রমাণ হিসেবে তার কাছ থেকে লিখিতও নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে সেনা কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের সময় তিনি আপত্তি জানিয়ে বলেন, যেহেতু তিনি আর সেনা কর্মকর্তা নন, তাই তাকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা উচিত এবং তারাই তাকে হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করবে। তবে সেনাসদর দপ্তরের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আটক বিদ্রোহী নেতা মেজর জেনারেল মঞ্জুর, মেজর রেজা এবং তার দলের অন্য সদস্যদের ক্যাপ্টেন এমদাদুল হকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে কার্যত টেনে-হিঁচড়ে পুলিশের ট্রাক থেকে সেনাবাহিনীর গাড়িতে তোলা হয়। ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক বিদ্রোহী নেতার হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে দেন এবং এক টুকরো কাপড় দিয়ে তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।

এরপর বিদ্রোহী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়া হয় সেনানিবাসের দিকে।

কমিশন যাদের সাক্ষ্য নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন কাজী এমদাদুল হকও। তিনি কমিশনকে জানান, তারা ভিআইপি হাউসের দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে সেনাসদস্যদের রাস্তার দিকে ছুটে আসতে দেখে তারা বিকল্প পথে যান। সিএসডি ক্যান্টিনের কাছে সশস্ত্র সেনাসদস্যরা গাড়িটি থামিয়ে ঘিরে ফেলেন। তারা গাড়ির পেছনের দরজা খুলে মঞ্জুরকে নিজেদের হেফাজতে নেন।

ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক জানান, তিনি মঞ্জুরকে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমান্ডিং অফিসারের কাছে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাসদস্যরা তার কথা উপেক্ষা করেন এবং ক্যাপ্টেন হক সেখান থেকে চলে না গেলে তাকে হত্যার হুমকি দেন।

ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক ঘটনাটি ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলামকে জানাতে সেখান থেকে চলে যান। কার্যালয়ে গিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার লতিফকে অপেক্ষা করতে দেখেন। তার কথা শোনার পর তারা সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় নেন। পরে ক্যাপ্টেন হককে আবার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলামের কার্যালয়ে ডাকা হয়। সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমান ও মেজর কামালও উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমানের সাক্ষ্যও নেয় কমিশন।

এতে বলা হয়, মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে বহনকারী জিপটি যেখানে থামানো হয়েছিল, তাদের সেখানে পাঠানো হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর ও তার দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন রাস্তার মোড়ের পশ্চিম পাশে কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, যেখানে ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক জিপ থেকে নেমেছিলেন। তাদের দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন ধীরে ধীরে সরে যায়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমান ও তার দল মাটিতে কিছু পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে দেখতে পান, সেটি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের মরদেহ।

কমিশন চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসারের সাক্ষ্য নেয়। তিনি জানান, মঞ্জুরের মাথার পেছনের দিকে ডান পাশে একটি বড় ক্ষত ছিল। ক্ষতটির আকার ছিল ৪ ইঞ্চি বাই ২ ইঞ্চি। সুরতহাল প্রতিবেদন ও বাহ্যিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এটিকে গুলির ক্ষত বলা হয়েছে।

মঞ্জুরকে চট্টগ্রামের সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। অতঃপর, এভাবেই বিদ্রোহের অবসান ঘটে।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission