আজ থেকে ৪৫ বছর আগে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে নৃশংস এক সামরিক অভ্যুত্থানে খুন হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের পর তার ক্ষত-বিক্ষত মরদেহটি গুম করেন বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারা।
৪৫ বছর আগের সেই দিনটিতে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করেছিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার গঠিত এক কমিশন। সেই কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পেয়েছে ডেইলি স্টার।
সেই প্রতিবেদন অনুসারে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গুলিবিদ্ধ মরদেহের ময়নাতদন্তে শরীরে পৃথক ২০টি গুলির ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি সংযুক্ত রয়েছে, যেখানে ক্ষতগুলোর ধরন ও ব্যাপ্তি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির মুখে বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। তার নিচের চোয়ালের হাড় টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল এবং ঘাড়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির কারণে এমনটি হয়েছিল। তার বুক ও পেটে প্রায় ১০টি গুলির ক্ষত, ডান হাতে দুটি, নাভির নিচে একটি এবং দুই পায়ের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ছোট ক্ষত ছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সকালে এমন ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় রাষ্ট্রপতির মরদেহ সার্কিট হাউসের ৪ নম্বর কক্ষের সামনে পড়ে ছিল। বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনারসহ সেখানে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সবাই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। মরদেহ পাহারায় রেখে যাওয়া হয় এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এটা স্পষ্ট যে তারা উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত ছিলেন। ঘটনাটি স্থানীয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ ঘটিয়েছে এবং সেনাসদস্যরা টহলে রয়েছেন—এমন আশঙ্কায় তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি এবং নিজেদের ক্ষমতা ও বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতির মরদেহের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও ব্যর্থ হন। ওইদিন কমিশনারকে ডিভিশন সদর দপ্তরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর।
সকাল সাড়ে ৮টায় দুটি সামরিক জিপ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসজ্জিত একটি সেনা ভ্যান সার্কিট হাউসে পৌঁছায়। সেখান থেকে তিনজন মেজর ও ১০-১৫ জন সিপাহী নেমে এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তার মুখোমুখি হন। তারা আব্দুস সাত্তার ও আবুল কালাম নামে ওই দুই কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে দোতলায় নিয়ে যান। এরপর তারা রাষ্ট্রপতির কক্ষে ঢুকে তাদের কাছে ‘গোপন নথিপত্রের’ বিষয়ে জানতে চান এবং নিজেরাই কক্ষটিতে তল্লাশি শুরু করেন।
এনএসআইয়ের ওই দুই কর্মকর্তার একজন উপসহকারী পরিচালক আব্দুস সাত্তারের সাক্ষ্য নিয়েছিল তদন্ত কমিশন।
তার বক্তব্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এভাবে, ‘তারা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে একটি স্যুটকেসে রাখেন। স্যুটকেস ও আরও কিছু জিনিস নিচতলায় নামিয়ে আনা হয়। মেজররা আবুল কালামকে সেগুলো পাহারা দিতে বলেন এবং আব্দুস সাত্তারকে তাদের সঙ্গে দোতলায় যেতে বলেন। মেজররা অন্য কক্ষগুলোতে তল্লাশি চালান এবং সেই সময় আব্দুস সাত্তার একজন মেজরের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মরদেহ পাহারা দিচ্ছিলেন।’
প্রতিবেদনের এই অংশেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, তাদের একজন আরেকজনকে ‘মেজর মোজাফফর’ বলে সম্বোধন করে রাষ্ট্রপতির বিছানার চাদর নিয়ে আসতে বলেন। একটি সাদা চাদর দিয়ে মরদেহটি ঢেকে দেওয়া হয় এবং আরেকটি চাদর দিয়ে মরদেহটি মুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এরপর কয়েকজন সিপাহীর সহায়তায় তারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিচে নামিয়ে আনেন। একইসঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মরদেহও নিচে নামিয়ে তিনটি মরদেহই ভ্যানে তোলা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একজন জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) ও কয়েকজন সিপাহী একটি সামরিক জিপে সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেন এবং জিয়াউর রহমানের স্যুটকেসটি নিয়ে যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের মরদেহটি নিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্যই ছিল না যে সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে বা কোথায় সমাহিত করা হয়েছে।
১৯৮১ সালের ১ জুন বিদ্রোহী সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির মরদেহের সন্ধান শুরু করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি জানতে পারেন কাপ্তাই সড়কের কোথাও মরদেহটি দাফন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক ও ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান, ২৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খালেক, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ, পুলিশ ও এনএসআই সদস্যরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উদ্দেশে রওনা হন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কাপ্তাই সড়কের পাশে পাথরঘাটা গ্রামের একটি পাহাড়ের ঢালে কবরটির সন্ধান পান।
জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান ও ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ একটি গণকবরে দাফন করা হয়েছিল। মরদেহগুলো কবর থেকে তুলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখা এবং বিদ্রোহীরা যাতে সেটি নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্রোহীরা প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরিয়ে নেয়ার আগে সেটি সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে ঢাকা থেকে কোনো নির্দেশ বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউই রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবেননি।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান ও দুই প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাপ্রধান জানান, সকালে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম গ্যারিসন বিদ্রোহ করেছে—এ বিষয়ে তার কাছে নিশ্চিত তথ্য থাকায় এবং বিদ্রোহ দমন না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ সুরক্ষিত করার বিষয়টি বিবেচনার বাইরে ছিল।
ভোরে সার্কিট হাউসে যাওয়া নৌবাহিনী প্রধান জানান, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তার কাছে কোনো সহায়তা চাননি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি শুধু সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না বলে তার মরদেহের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও জানান, ওই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে জরুরি কাজ মনে হয়েছিল জাহাজগুলোকে সতর্ক করা এবং বন্দর ছাড়ার জন্য প্রস্তুত রাখা। কারণ, নদীতে নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ছিল।
ওই রাতে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সার্কিট হাউসে থাকা জনশক্তি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসান জানান, তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে অবিলম্বে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। উত্তরে তাকে বলা হয়েছিল, মাহফুজ ওয়্যারলেসে সামরিক সচিবকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং তারা হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাদের আশঙ্কা হয়, সেনাবাহিনী নিজেই হয়তো এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাই তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যান। কারণ, তাদের মনে হয়েছিল সেখানে আর অবস্থান করা সমীচীন হবে না।
ঘটনার দিন সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সার্কিট হাউসে ঢোকেন তৎকালীন বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এল কে সিদ্দিকী। তিনি কমিশনকে জানান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তাকে বলেছিলেন, ঢাকায় বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাকে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়েছিল।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী কমিশনকে জানান, ঢাকায় মন্ত্রিসভায় রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতির মরদেহ উদ্ধার করার বিষয়ে ঢাকায় মন্ত্রিসভা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে তার মনে পড়ে না।
তিনি বলেন, এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে (চট্টগ্রামে) স্থানীয় কর্মকর্তারা নিজেদের উদ্যোগে কাজ করবেন, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তারা ব্যবস্থা নিতে পারতেন এবং পরে আলোচনা করে সেটার অনুমোদন দেয়া যেত।
স্থানীয় কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে কী করতে পারতেন— কমিশন এমন প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেন, তারা মরদেহটি কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারতেন। তার মতে, চট্টগ্রামের বাইরে মরদেহটি নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতো।
কমিশনের কাছে এই কথাটি হাস্যকর মনে হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী, স্থানীয় কর্মকর্তারা কীভাবে মরদেহটি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে লুকিয়ে রাখতে পারতেন, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। তারা সেটি কোথায় লুকিয়ে রাখতেন? এমন পরিস্থিতিতে ওই সকালে তাদের কাছ থেকে এমন একটি পদক্ষেপের কথা ভাবা আদৌ কি স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায়?
কমিশন আরও বলেছে, ওই সময় সার্কিট হাউসে উপস্থিত একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের—অর্থাৎ দুই প্রতিমন্ত্রী ও নৌবাহিনী প্রধানের—কেউই প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কোনো পরামর্শ বা নির্দেশ দেয়ার কথাও ভাবেননি।
কমিশনের মন্তব্য, আমরা দেখেছি, জাতীয় সংকটের সেই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা মন্ত্রিসভার মাথায়ও আসেনি। মন্ত্রীরা স্থানীয় কর্মকর্তাদের নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেয়ার প্রত্যাশা করলেও কমিশন তাদের বিষয়টি তুলনামূলক সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সকালে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে বৈঠকের সময় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি তুলেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। তবে তাকে বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনী মরদেহটির দেখভাল করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে সকাল থেকে ১ জুন ভোররাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল।
কমিশনের ভাষ্য, ৩০ মে সকালে বিরাজমান অস্বাভাবিক ও গুরুতর পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কারও পক্ষেই সার্কিট হাউস থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরিয়ে নেয়া বাস্তবসম্মত ছিল না। বিশেষ করে ৩০ মে সকাল থেকেই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে সেনাবাহিনীর একটি অভ্যুত্থান ঘটেছে, স্থানীয় সেনাবাহিনী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং বেতার কেন্দ্র, টিঅ্যান্ডটি (টেলিফোন লাইন) ও বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা ইউনিটগুলো অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকা থেকে কোনো নির্দেশনা বা সাড়া না পাওয়ায় তাদের (স্থানীয় কর্মকর্তাদের) অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে তারা ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার নীতি’ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ জন্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না।
প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করে, সার্কিট হাউসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখতে না পারার জন্য পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সদস্যেরই আমরা কোনো দোষ খুঁজে পাইনি।
ময়নাতদন্তের পর জিয়াউর রহমানের মরদেহ বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে ঢাকায় আনা হয় এবং প্রথমে ‘রাষ্ট্রপতি ভবন’ ও পরে জাতীয় সংসদে নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের ২ জুন তার জানাজার জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল জনসমাগম হয়। এরপর মরদেহটি ক্রিসেন্ট লেকের পাশে দাফন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুর ১টার দিকে মরদেহটি কবরে নামানোর সময় তিন বাহিনীর তিনটি কন্টিনজেন্ট সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেনাবাহিনীর বিউগলবাদকেরা ‘লাস্ট পোস্ট’ বাজান, তিন বাহিনীর প্রধানরা নেতাকে স্যালুট জানান এবং সেখানে সমবেত বিপুল সংখ্যক জনতা আবেগ ও অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে হত্যার এক সপ্তাহের মাথায়; অর্থাৎ ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এ হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল (যিনি পরে প্রধান বিচারপতি হন) এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয় সেই তদন্ত কমিশন।
কমিশনের তদন্তে যা উঠে এসেছে তার মূল কথা হলো, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই শিথিল ছিল যে সার্কিট হাউসে ব্যাপক অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও হত্যাকারীরা প্রায় বিনা বাধায় তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা হয়নি; তাদের জন্য যেন পুরো ঘটনাটি ছিল ‘ভিনি, ভিডি, ভিচি’।
কথাটি জুলিয়াস সিজারের বিখ্যাত উক্তি। যার অর্থ, ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।’
আরটিভি/এসএইচএম



