
একসময় বাংলাদেশের গ্রাম মানেই ছিল কাঁচা রাস্তা, যোগাযোগের দুর্ভোগ আর নদী-খালে বিচ্ছিন্ন জনপদ। উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে দূরে থাকা সেই গ্রামগুলোকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এক প্রকৌশলী। তার কাছে রাস্তা ছিল শুধু পথ নয়, ছিল সম্ভাবনার দুয়ার; সেতু ছিল শুধু দুই প্রান্তের সংযোগ নয়, ছিল মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে গতিশীল করার মাধ্যম। সেই দূরদর্শী মানুষটি ছিলেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এই রূপকার ১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন কৃষিচিন্তক প্রয়াত নূরুল ইসলাম সিদ্দিক এবং মা রত্নগর্ভা বেগম হামিদা সিদ্দিক। লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ এবং মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিধন্য কুষ্টিয়াতেই তার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের প্রথম অধ্যায় কাটে।
মেধাবী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর, ১৯৬৭ সালে, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছিলেন অবদান
১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনিও যুক্ত হন। ৩০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ভারতের ‘বেতাই’ ইয়ুথ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত জোনাল কাউন্সিলের অন্যতম সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে বিজয় ছিনিয়ে আনার পর নতুন উদ্যোমে শুরু করেন দেশ গড়ার সংগ্রাম
উন্নয়ন পরিকল্পনায় দক্ষতা বাড়াতে ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড রিজিওন্যাল প্ল্যানিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ওয়ার্কস প্রোগ্রামের উপ-প্রধান প্রকৌশলী, এলজিইবির প্রকৌশল উপদেষ্টা এবং পরে এলজিইডির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বেই ছোট পরিসরের একটি প্রকৌশল কাঠামো বিস্তৃত হয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
গ্রামের উন্নয়ন ভাবনায় ছিল নতুনত্ব
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের বিশেষত্ব ছিল উন্নয়নকে সামগ্রিকভাবে দেখা। তার কাছে গ্রামীণ রাস্তা বা সেতু ছিল শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃষি, ব্যবসা ও মানুষের জীবনযাত্রা।
এই ভাবনা থেকেই গ্রামীণ হাট-বাজারকে ‘গ্রোথ সেন্টার’ বা প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারণা বাস্তবায়ন করেন তিনি। এতে স্থানীয় বাজারগুলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়।
শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ সচল রাখতে পানি সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশে রাবার ড্যাম প্রযুক্তি স্থাপন ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রযুক্তির ব্যবহার
তথ্যনির্ভর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের বেসম্যাপ তৈরিতে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) চালুর উদ্যোগ নেন। সে সময় দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় এটি ছিল উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ।
বদলে যায় গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তার নেতৃত্বে দেশজুড়ে নির্মিত হয় অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। পাশাপাশি গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়, বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো।
এসব উদ্যোগ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও স্থানীয় অর্থনীতির গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
দেশের উন্নয়ন মডেল পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
কর্মদক্ষতা ও সততার কারণে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি দায়িত্ব পান কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
তার তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, কেএফডব্লিউ, ইউএসএআইডি ও ওপেক ফান্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে শতাধিক আন্তর্জাতিক সভা, সেমিনার ও সম্মেলনে অংশ নেন তিনি।

কাজের স্বীকৃতিতে অসংখ্য পুরস্কার
কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ভাসানী স্বর্ণপদক, কবি জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক, আইইবি স্বর্ণপদক, শেরেবাংলা স্বর্ণপদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী স্বর্ণপদক ও জাইকা মেরিট অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার পান তিনি।
১৯৯৭ সালে বিশ্বব্যাংক তাকে ইন্টারন্যাশনাল রোড ফেডারেশন কর্তৃক ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করে।
পেশার বাইরেও ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা
পেশাগত কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এ ছাড়া আহ্ছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ কমিটির সভাপতি এবং ঢাকাস্থ কুষ্টিয়া জেলা সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
চলে গেছেন তিনি, রয়ে গেছে তার কাজ
২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
জীবনের শেষ সময়েও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলজিইডির উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল উন্নয়নকে শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছে দেওয়া। সড়ক, সেতু, বাজার, পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনার সমন্বয়ে তিনি গ্রামীণ উন্নয়নের যে ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘মানুষ নির্মাণ করে প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আনন্দে... নিজের পরিচয় দেয় সৃষ্টিতে।’ কামরুল ইসলাম সিদ্দিকও নিজের পরিচয় রেখে গেছেন তার সৃষ্টিতে। মানুষটি নেই, কিন্তু তার কাজ ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে।
আরটিভি/এমএইচজে

