
সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসবের আমেজে বছর শুরু হয়েছিলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। তবে মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাসের কারণে ছুটিতে সে আমেজ আর অক্ষুণ্ণ থাকেনি। বছরের বেশিরভাগ সময় সুনসান নীরবতাকে সঙ্গী করেই কেটেছে কুবির। অপরদিকে করোনার দীর্ঘ ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সার্বিকভাবে ঝিমিয়ে পড়লেও বছরের শেষপ্রান্তে শীত আসতেই যেন শুরু হয়েছিলো আড়মোড়া ভাঙার পর্ব। চূড়ান্ত পরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষক সমিতির নির্বাচন ঘিরে নাটকীয়তা, শাখা ছাত্রলীগের আসন্ন কমিটির পদপ্রত্যাশীদের দৌঁড়ঝাপ, কর্মচারী সমিতির আট দফা দাবিসহ নানামুখী ঘটনা ও কার্যক্রম বন্ধ ক্যাম্পাসের শীতল পরিবেশে উষ্ণতা ছড়াতে দেখা গিয়েছে।
অভিষেক সমাবর্তন
জানুয়ারির ২৮ তারিখে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসের প্রথম সমাবর্তনকে ঘিরে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিলো ক্যাম্পাস। সমাবর্তন, রাষ্ট্রপতির আগমনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের জাঁকজমকপূর্ণ তৎপরতাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। সমাবর্তনে এবার পাঁচটি অনুষদ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মিলিয়ে মোট ২৮৮৭ জন অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্বের স্বীকৃতস্বরূপ চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক প্রদান করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সমাবর্তন বক্তা হিসাবে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষার বাইরেও বৈচিত্রময় কার্যক্রমে হাজারো মানুষের পদচারণায় দীর্ঘদিন ছিলো উৎসবের আমেজ।
মানবিকতার আহ্বান
এদিকে দেশে করোনা আগমনের শুরুতেই হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সংকট দেখা দেয়। তখন কুবির ফার্মেসি বিভাগ নিজেদের তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিনামূল্যে ক্যাম্পাসে বিতরণের উদ্যোগ নিয়ে সারাদেশে প্রশংসা অর্জন করে। অপরদিকে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে একদিনের সমপরিমাণ বেতন প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এছাড়াও থিয়েটার-অনুপ্রাসসহ কুবির বিভিন্ন সংগঠন বা বিভাগের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে এ সময়টায় মানবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজ করতে দেখা গিয়েছে।
কোভিড-১৯
করোনায় কুবির বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হলেও এ পর্যন্ত সেরে উঠেছেন সবাই। জানুয়ারিতে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবাকে বাঁচাতে নিজের লিভারের অংশ দিয়ে (লিভার ট্রান্সপ্লান্ট) অনন্য নজীর সৃষ্টি করেছেন কুবি শিক্ষার্থী উর্মি আচার্য। অপরদিকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তানিন মেহেদী ক্যান্সারের সফল অপারেশন শেষে ফিরে এসেছে সকলের মাঝে। তবে জুন মাসে নিজ বাড়িতে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী ভূঁইয়া ও এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন স্টাডিজ বিভাগের সুজন আহাম্মেদের প্রয়াণে সম্ভাবনাময় দুই নক্ষত্র হারায় কুবি পরিবার। এদিকে অচল দু'টি কিডনি নিয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার আশায় বুক বেঁধে আছে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তর সাহা।
নতুন ট্রেজারার
বন্ধের মধ্যেই চলতি বছরের জুলাই মাসের চার তারিখ চার বছরের জন্য ট্রেজারার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান। এর আগে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রেজারের শূণ্য ছিলো কুবি।
এডুমেইল প্রতীক্ষার অবসান ও অনলাইন ক্লাস
জুন মাসে এক ভার্চ্যুয়াল সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ জুলাই থেকে কুবির পরিচয় ঘটে অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের বহু-প্রতীক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল বা এডুমেইল সেবা চালু হয়েছে ২৫ নভেম্বর।
শিক্ষক সমিতির নির্বাচন ঘিরে নাটকীয়তা
সারাবছরের মধ্যে ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতি নির্বাচন-২০২১ কে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি নাটকীয়তা সৃষ্টি হতে দেখা গিয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদে ভাঙন ও উভয়পক্ষ থেকে নিজেদের নীল দল দাবি, শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তির জেরে নতুন নতুন প্যানেল ঘোষণা এবং পাল্টাপাল্টি নির্বাচন কমিশন গঠনের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠে পরিবেশ। ফলে ১০ ডিসেম্বর রাতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে বাধ্য হয় কুবি প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয়ী হয় নীল দল (ড. শামীম-ড. কামাল প্যানেল)।
পরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
গত মার্চ থেকে করোনার ছুটিতে থাকায় শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সেশন জটে পড়েছে। একই সময়ে বিসিএসের ডাবল সার্কুলারসহ বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চলমান থাকায় সুযোগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। আটকে থাকা চূড়ান্ত পরীক্ষা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দ্রুত নেয়ার দাবিতে নভেম্বরের শেষদিক থেকে মানবন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। এমনকি ডিসেম্বরের ২ তারিখ প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়ে অবস্থান নেয় তারা। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্যাম্পাসে ডিসেম্বরের ২০ তারিখ থেকে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করে কুবি প্রশাসন।
ছাত্রলীগের আসন্ন কমিটিতে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ১৬১ সদস্যবিশিষ্ট বর্তমান কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে অনেকদিন আগেই। তাই নতুন কমিটি কবে আসছে, নেতৃত্বে কারা আসবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে পদ প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। কেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন তারা। এছাড়া বন্ধ ক্যাম্পাসেও সর্বশেষ ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ গণতন্ত্রের বিজয় উদযাপনে আনন্দ শোভাযাত্রা ও এর আগে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাংচুরের প্রতিবাদ কর্মসূচিসহ নানা ধরনের কার্যক্রমে নিয়মিত সক্রিয় থাকতে দেখা গিয়েছে নেতাকর্মীদের।
ক্যাম্পাসে হঠাৎ ছাত্রদলের কার্যক্রম
বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম কুবিতে ক্যাম্পাসে জোরেশোরে চললেও গেলো কয়েক বছরে ছাত্রদলের তেমন কোনও উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তবে ছাত্রদলের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হঠাৎ করেই ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ পোস্টারিং করে কুবি শাখা ছাত্রদল। তবে এর ঘণ্টাখানেক পরই উধাও হয়ে যায় সেসব পোস্টার। ছাত্রদলের অভিযোগ এসব পোস্টার ছিড়ে ফেলেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ।
নিয়োগ বিতর্ক
অফিস সহায়ক পদে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো বিতর্ক। মার্চে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট পদে ৫ নম্বর রোলধারী প্রার্থী ফেল করলেও প্রকাশিত ফলাফলে তাকে পাস দেখিয়ে অফিস সহায়ক (একই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অপর একটি পদ) পদে ১৮ অক্টোবর চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।
কর্মচারীদের আন্দোলন-নির্বাচন
ডিসেম্বরে আট দফা দাবিতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সমিতি। প্রশাসন দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়ায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করে তারা। এছাড়াও বছরের শেষদিকে কর্মচারী সমিতি এবং কর্মচারী পরিষদের দুটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
২০২০ সালের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই বছর সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান করেছি, আর সেটা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন। বিগত ১৫ বছরে কোনও উপাচার্য এটা পারেননি। আর এ বছরে আমি ক্যাম্পাসের চেহারাই পরিবর্তন করে দিয়েছি। আগে হাঁটতে গেলে পায়ে ধুলা লাগতো, আর এখন সব পাকা রাস্তা। ক্যাম্পাসকে আলোকিত করেছি, বাস বৃদ্ধি করেছি, কেন্দ্রীয় মাঠ অনেক বড় করাসহ অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে এই ২০২০ সালে। এছাড়াও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মেগা প্রজেক্ট এনেছি সেটার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী বছরের শুরুর দিকে বিভিন্ন কাজ হবে। আর সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করাচ্ছি যাতে কোনও ধরনের দুর্নীতি না হয়। সামনের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় হবে দেশ সেরা এক আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়।
জেবি




