দেশের আর্থিক খাতে অনিশ্চয়তা, বিপর্যয়, সংগ্রাম এবং ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার বছর ২০২২। করোনার ছোবল থেকে অর্থনীতি উত্তরণের বার্তা নিয়ে যার শুরু, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে তা অনিশ্চয়তার বছরে পরিণত হয়। ২০২২ এ নজিরবিহীন ডলার ও রিজার্ভ সংকটে পড়ে দেশ। বেড়েছে অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ ও গুজব। ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা ও অনিয়মের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে।
টানা দুই বছর করোনার নেতিবাচক অভিঘাত কাটিয়ে ২০২২ সালের শুরুতে আর্থিক খাতের অবস্থান ছিল বেশ দৃঢ়। তবে, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারাবিশ্বের মতো টালমাটাল করে তুলে দেশের অর্থনীতিকে।
বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়। ভয়াবহ চাপ পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বছরের মাঝমাঝি হু হু করে কমতে থাকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন থেকে নেমে বছর শেষে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
রিজার্ভে টান পড়ায় সৃষ্টি হয় চরম ডলার সংকট। ৮৫ টাকার ডলার ওঠে ১২০ টাকায়। আমদানির ওপর কড়াকড়ি আরোপে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে লাগামহীনভাবে। ৬ শতাংশ থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে। তবে, বছর শেষে তা হয় ৯ শতাংশ।
পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, একদিক হলো বহির্বিশ্ব থেকে যে অভিঘাত এসেছে, সেটার কারণে। আরেকটা দিক হলো আমাদের নিজেদের নীতিগত দুর্বলতার কারণে। এ কারণে অভিঘাতটা আরও বড় আকার ধারণ করেছে।
চলতি বছর ফাঁস হয় ব্যাংক খাতের একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা। ব্যাংকের ওপর আস্থা কমতে থাকে গ্রাহকদের। গুজবে কান দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন অনেক গ্রাহক। যা নতুন সংকটের জন্ম দেয়। তবে বছর শেষে এই প্রবণতা কমে।
ইতোমধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। হুন্ডি বন্ধ না হওয়ায় বাড়ে অর্থ পাচারও। যদিও বাজেটে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। তবে তাতে কান দেননি কোনো পাচারকারী।
বিআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, ব্যাংক খাত যেন অদক্ষ হয়ে না পড়ে। পরবর্তী সময়ে যেন আরও কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সেজন্য যদি কমিশন তৈরি করা হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তারা পুরো একটি ডায়াগনোসিস করবেন খুব নিরপেক্ষ প্রেক্ষাপট থেকে। আসলে ব্যাংকগুলোর কী সমস্যা রয়েছে? সেগুলো বিশ্লেষণ করে তারা সুপারিশগুলো দেবেন। এটা করা গেলে ভালো হবে।
বছরের প্রথম মাসে পুঁজিবাজারে উত্থানের হাওয়া থাকলেও এরপর থেকে কেবল দরপতন। পুঁজি হারানোর ভয় ও উৎকণ্ঠায় শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়েন দুই লাখ বিনিয়োগকারী।




