
চলতি বছর রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত ছিল। এ সময় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বছরের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় ছিল বিএনপি। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নির্বাচন সামনে রেখে প্রথমেই দলের কর্মীদের চাঙা করতে সারাদেশেই বিক্ষোভ, সমাবেশ-মহাসমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। বিএনপি ও তার সহযোগীদের আন্দোলন সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক চেয়ে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের অধীনেই নির্বাচন করতে অনড়। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থেকে হঠাৎ করেই মুখোমুখি অবস্থান নেয় দু’দল। ক্রমে বাদলাতে থাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এরপর তা সংঘাতে রূপ নেয়।
বিএনপি এবং সমমনা দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এ বছর এসব সংঘাত বেড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পেছনে দুটি দল অবশ্য পরস্পরকে অভিযুক্ত করেছে।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, সংঘর্ষ
নির্বাচনের আগে বছরের শুরুতে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে নানান কমসূচির ঘোষণা দেয় দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল। ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ করে৷ আর বিএনপি পালন করে পদযাত্রা। সেদিন আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ এবং বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে৷ দেশের ভোলা, জামালপুর, গাজীপুর, নাটোরসহ বেশ কয়েক জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জামালপুরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২৮ জন আহত হয়েছেন। একইদিন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারে বিএনপির পদযাত্রায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা এবং আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়৷ হামলায় গাজীপুর জেলা বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ সরকার, শ্রীপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মশিউর রহমানসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
ওই সময় সিরাজগঞ্জ সদরে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ এবং বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির নির্ধারিত পদযাত্রায় ভোলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে। এই হামলার ঘটনায় বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে৷
পদযাত্রা বনাম শোভাযাত্রা, উত্তপ্ত দেশ
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে জুলাইয়ের ১৯ তারিখ রাজধানীসহ সারাদেশে বিএনপি পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে এ কর্মসূচির বিপরীতে আওয়ামী লীগ রাজধানীসহ সারাদেশে ‘শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা’ কর্মসূচি দেয়। দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, খাগড়াছড়ি, কিশোরগঞ্জ ও জয়পুরহাটে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বিএনপির অন্তত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে পুলিশের অনেক সদস্য ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে বিএনপি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে সজীব নামে এক যুবদল নেতা নিহত হয়েছেন।
বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে সংঘাত
চলতি বছরের ২৮ জুলাই নয়াপল্টনের মহাসমাবেশ থেকে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরপর শান্তি সমাবেশের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগও। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কর্মসূচি পালনে অনুমতি দেয়নি ডিএমপি। এরপর আওয়ামী লীগ কর্মসূচি থেকে সরে এসে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সতর্ক অবস্থানের ঘোষণা দেয়। কিন্তু অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণার পরদিন শনিবার সকাল থেকেই সড়কে অবস্থানের চেষ্টা করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। লাঠিসোঁটা হাতে ঢাকার চার প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন, প্রাইভেট কার ভাঙচুর করছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে জড়িছেন সংঘর্ষে। সংঘর্ষের মাঝেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্ট করে পুলিশ। তবে এর মধ্যেই এক ফাঁকে দুপুর ১২টার দিকে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেন বিএনপিকর্মীরা। এরপর দুপুর দেড়টার দিকে আরও একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেন তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে পুলিশের জলকামানের ওপর হামলা করেন বিএনপিকর্মীরা।
ওই দিন রাজধানীর ধোলাইখাল এলাকায় বিএনপি ও পুলিশের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বিএনপি নেতা গয়েশ্বরসহ অন্তত পাঁচ নেতাকর্মী আহত হন। একই দিন ঢাকার প্রবেশমুখ গাবতলীর অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানকে ভ্যানে করে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। পুলিশের উপকমিশনার (মিরপুর বিভাগ) জসিম উদ্দীন মোল্লা সাংবাদিকদের জানান, আমানকে গ্রেপ্তার নয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির পদযাত্রায় ব্যাপক সংঘর্ষ, আহত ২০০
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে ১৯ আগস্ট পদযাত্রা কর্মসূচি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধসহ দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত ও কমপক্ষে ২১ জন আটক হয়েছেন। হবিগঞ্জে সহস্রাধিক টিয়ার গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের মাধ্যমে দুই ঘণ্টা পরে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। এ সময় সদর থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপির নেতাকর্মীর তোপের মুখে কয়েক দফা পিছু হটে পুলিশ। পরে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে ১৭ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৫০ নেতাকর্মী আহত হন বলে দাবি বিএনপির। এ ছাড়া বরগুনায় পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ৪৫ জন ও নেত্রকোণায় পদযাত্রায় হাতবোমা বিস্ফোরণে অন্তত পাঁচজন আহত হন।
আলোচিত ‘২৮ অক্টোবর’
সরকার পতনের আন্দোলনে বছরের শুরু থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। ওই সব আন্দোলনে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু গত ‘২৮ অক্টোবর’ তা বড় সহিংসতায় রূপ নেয়। যদিও দিনটিকে ঘিরে আগে থেকেই সংঘাতের আশঙ্কা করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, ওই সমাবেশ ঘিরে উদ্বেগের কারণ ছিল ১৭ বছর আগের স্মৃতি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘিরে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশ ছিল পাশাপাশি এলাকায়। কিন্তু হঠাৎ দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। দিনভর সংঘাত, সহিংসতায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। একপর্যায়ে জারি হয় জরুরি অবস্থা। সেই একই ইস্যু নিয়ে চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর এই তিন দলের সমাবেশ ঘিরে সংঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা জাগে আগে থেকেই, ঘটলও তাই।
বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে এক পুলিশ সদস্য নিহতের পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক কর্মীরও মারা যায়। এ ছাড়া ৪১ জন পুলিশ সদস্য ও ২৮ জন সাংবাদিকসহ আরও অনেকে আহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাবে, ৫৫টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি পুলিশ বক্স-পোড়ানোর পাশাপাশি প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনায় কঠোর হয়ে ওঠে সরকার।
এসব ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা করে পুলিশ। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে র্যাব-পুলিশ। শুরুতেই দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একে একে মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জহির উদ্দিন স্বপন, মজিবুর রহমান সারোয়ারসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার এড়াতে বিএনপি ও তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয়, মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়নসহ সব স্তরের নেতাই আত্মগোপনে চলে যায়। দল থেকেও তাদের গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়।




